Wednesday, 30 September 2026

কিয়ামতের দিন পৃথিবী হবে এক রুটি! জান্নাতবাসীদের প্রথম আপ্যায়ন (চমৎকার একটি হাদিস এবং আল্লামা উসাইমিন (রাহ.)-এর ব্যাখ্যা)

 


―――――――――――

প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ আল-খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:


«تَكُونُ الأَرْضُ يَوْمَ القِيَامَةِ خُبْزَةً وَاحِدَةً، يَتَكَفَّؤُهَا الجَبَّارُ بِيَدِهِ، كَمَا يَكْفَأُ أَحَدُكُمْ خُبْزَتَهُ فِي السَّفَرِ، نُزُلًا لِأَهْلِ الجَنَّةِ».

فَأَتَى رَجُلٌ مِنَ اليَهُودِ فَقَالَ: بَارَكَ الرَّحْمَنُ عَلَيْكَ يَا أَبَا القَاسِمِ، أَلَا أُخْبِرُكَ بِنُزُلِ أَهْلِ الجَنَّةِ يَوْمَ القِيَامَةِ؟ قَالَ: «بَلَى». قَالَ: تَكُونُ الأَرْضُ خُبْزَةً وَاحِدَةً، كَمَا قَالَ النَّبِيُّ ﷺ. فَنَظَرَ النَّبِيُّ ﷺ إِلَيْنَا ثُمَّ ضَحِكَ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ، ثُمَّ قَالَ: أَلَا أُخْبِرُكَ بِإِدَامِهِمْ؟ قَالَ: إِدَامُهُمْ بَالَامٌ وَنُونٌ. قَالُوا: وَمَا هَذَا؟ قَالَ: ثَوْرٌ وَنُونٌ، يَأْكُلُ مِنْ زَائِدَةِ كَبِدِهِمَا سَبْعُونَ أَلْفًا.


“কিয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী একটিমাত্র রুটি হয়ে যাবে। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে তা এমনভাবে উল্টেপাল্টে সমতল করবেন, যেমন তোমাদের কেউ সফরকালে তার খামিরের রুটিকে উল্টেপাল্টে তৈরি করে থাকে। এটি হবে জান্নাতবাসীদের প্রথম মেহমানদারির খাবার।'


এমন সময় এক ইহুদি এসে বলল, 'হে আবুল কাসিম! রাহমান (অতি দয়াময় আল্লাহ) আপনার ওপর বরকত বর্ষণ করুন। আমি কি আপনাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতবাসীদের আপ্যায়নের বিষয়ে জানাব না?'


তিনি বললেন: 'হ্যাঁ, বলো।'


সে বলল, 'কিয়ামতের দিন পুরো পৃথিবী একটিমাত্র রুটি হবে' — ঠিক যেমনটি নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটু আগেই বলেছিলেন।


তখন নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদের দিকে তাকিয়ে এমনভাবে হাসলেন যে তাঁর মাড়ির দাঁত দেখা গেল।


অতঃপর তিনি বললেন: 'আমি কি তোমাদের তাদের সালুন বা তরকারি সম্পর্কে জানাব না?'

এরপর বললেন: 'তাদের তরকারি হবে: বালাম ও নুন।'


সাহাবিগণ জিজ্ঞেস করলেন, 'এগুলো কী?'


তিনি বললেন: 'একটি ষাঁড় এবং একটি মাছ, যার কলিজার বাড়তি অংশ থেকে সত্তর হাজার লোক খেতে পারবে।'"

[সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৫২০]

―――――――――――

❑ শাইখ ইবনে উসাইমিন (রহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাখ্যা:


শাইখ এ হাদিসটির ব্যাখ্যায় বলেন:


● “আল্লাহু আকবার! এই হাদিসে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন পৃথিবী একটিমাত্র রুটিতে পরিণত হবে। দুনিয়াতে পৃথিবী গোলাকার হলেও আখিরাতে তা হবে রুটির মতো সমতল ও প্রসারিত।


إِذَا السَّمَاءُ انشَقَّتْ ۝ وَأَذِنَتْ لِرَبِّهَا وَحُقَّتْ ۝ وَإِذَا الْأَرْضُ مُدَّتْ ۝ وَأَلْقَتْ مَا فِيهَا وَتَخَلَّتْ


"যখন আকাশ বিদীর্ণ হবে এবং তার রবের আদেশ পালন করবে আর সেটাই তার জন্য অপরিহার্য; এবং যখন পৃথিবীকে টেনে প্রসারিত করা হবে আর সে তার পেটে থাকা সবকিছু বাইরে নিক্ষেপ করে সম্পূর্ণ খালি হয়ে যাবে।" [সূরা আল-ইনশিকাক: ১-৪]


● এখানে "পৃথিবীকে প্রসারিত করা হবে" বলতে বোঝায় কিয়ামতের দিন তাকে সমতল করে বিস্তৃত করা হবে। বর্তমানে পৃথিবী দৃশ্যত সমতল মনে হলেও তা প্রসারিত নয়। বিশালত্বের কারণে আমরা এর গোলাকার আকৃতি সরাসরি অনুভব করতে পারি না; আমাদের কাছে একে সাধারণ সমতল ভূমি মনে হয় যদিও বাস্তবে তা গোলাকার। কিন্তু কিয়ামতের দিন একে সত্যি সত্যি সমতল করে দেওয়া হবে এবং এটি একটি বিশাল রুটির রূপ নেবে।


● "জাব্বার" (الجَبَّارُ) অর্থাৎ মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা তা নিজ হাতে উল্টেপাল্টে গড়ে নেবেন, ঠিক যেমন সফরে মানুষ নিজের রুটিকে হাত দিয়ে উল্টেপাল্টে প্রস্তুত করে।


● "নুযুল" (نزل) শব্দের অর্থ হলো মেহমানদারি বা প্রথম আপ্যায়ন। অর্থাৎ এটি হবে জান্নাতবাসীদের প্রাথমিক মেহমানদারি।


● এটি মহান আল্লাহর অসীম কুদরতের এক দারুণ নিদর্শন। যে পৃথিবী আজ কেবলই মাটি আর বালুকা রাশি, কিয়ামতের দিন সেটিই রূপ নেবে অতীব সুস্বাদু খাদ্যে। বরং এমন এক খাবার হবে যার মতো কিছু মানুষ কোনোদিন দেখেনি। কারণ জান্নাতে এমন নেয়ামত রয়েছে যা কোনো চোখ দেখেনি, কোনো কান শোনেনি এবং কোনো মানুষের অন্তরে তার কল্পনাও আসেনি।


● ইতোমধ্যে এক ইহুদি এসে বলল, "হে আবুল কাসিম! রহমান (অতি দয়াময় আল্লাহ) আপনার ওপর বরকত বর্ষণ করুন।" সে কেন "আসসালামু আলাইকুম" বলল না তা নিশ্চিত নয়; হতে পারে সে আগে থেকেই মজলিসে উপস্থিত থেকে সবকিছু শুনছিল। আল্লাহই ভালো জানেন।


সে বলল, "আমি কি আপনাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতবাসীদের আপ্যায়নের খবর দেব?"

রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, "হ্যাঁ, বলো।"

তখন সে ঠিক সেটাই বলল যা রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের বলেছিলেন: "কিয়ামতের দিন পৃথিবী একটিমাত্র রুটি হয়ে যাবে।"


ইহুদি আলেমের এই বক্তব্যের সাথে সাথে নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সাহাবিদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন, এমনকি তাঁর মাড়ির দাঁত প্রকাশ পেল। এই হাসি ছিল সত্যের পক্ষে একজন প্রতিপক্ষের সাক্ষ্য দেওয়ার আনন্দ।


রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর নিজের জন্য অবশ্য এই ইহুদির সত্যায়নের কোনো প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু কোনো আহলে কিতাব যখন সত্যের পক্ষে সাক্ষ্য দেয় তখন সাধারণ মানুষের সামনে সেই বিষয়ের নির্ভরযোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতা আরও মজবুত হয়।


আল্লাহ তাআলা বলেন,


فَإِن كُنتَ فِي شَكٍّ مِّمَّا أَنزَلْنَا إِلَيْكَ فَاسْأَلِ الَّذِينَ يَقْرَءُونَ الْكِتَابَ مِن قَبْلِكَ


"অতএব তোমার প্রতি যা নাজিল করেছি তাতে যদি তুমি কোনো সংশয়ে থাকো তবে তোমার পূর্ববর্তী কিতাব যারা পাঠ করে তাদের জিজ্ঞেস করো।" [সূরা ইউনুস: ৯৪]


মহান আল্লাহ আরও বলেন,


قُلْ كَفَىٰ بِاللَّهِ شَهِيدًا بَيْنِي وَبَيْنَكُمْ وَمَنْ عِندَهُ عِلْمُ الْكِتَابِ


"বলো, আমার ও তোমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে আল্লাহই যথেষ্ট এবং তারা যাদের কাছে ঐশী কিতাবের জ্ঞান রয়েছে।" [সূরা রা’দ: ৪৩]


● মানুষ স্বভাবতই আনন্দিত হয় যখন তার সত্যতার পক্ষে অন্য কেউ সমর্থন দেয়, বিশেষ করে যদি সে ব্যক্তি ভিন্ন মতের বা প্রতিপক্ষের লোক হয়। প্রচলিত কথা আছে: "উৎকৃষ্ট সত্য সেটাই, যার পক্ষে শত্রুরাও সাক্ষ্য দেয়।" তাই এই ইহুদি যখন রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কথার সত্যতা নিশ্চিত করল তা তাঁর নবুয়তের সত্যতার আরেক নিদর্শন হয়ে দাঁড়াল। এটি প্রমাণ করে যে, গায়েব বা অদৃশ্য জগৎ সম্পর্কে তিনি যা কিছু জানিয়ে গেছেন তার সবই সত্য ও বাস্তব।”

[সূত্র: alathar net]

আল্লাহ তাআলা যেন, আমাদেরকে জান্নাতবাসী হিসেবে কবুল করেন। আমিন।

-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

No comments:

Post a Comment

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...