Sunday, 30 August 2026

ইসলামের দৃষ্টিতে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতি:📱📞

 


একথায় কোন সন্দেহ নাই যে, বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম। এটি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এ ছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের জীবন যাপন কষ্টসাধ্য বা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে ইসলামিক দৃষ্টি থেকে এই মোবাইল ফোন ব্যবহারের মূলনীতি এবং শর্তাবলী জানা অপরিহার্য।


📱নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতিগুলো তুলে ধরা হলো:


▪️১. বৈধ এবং কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা:

মোবাইল ফোন আল্লাহর দেওয়া এক বড় নেয়ামত। কিন্তু এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের গন্তব্য—জান্নাত নাকি জাহান্নাম। এর সঠিক ব্যবহারে আমরা যেভাবে দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশাল কল্যাণ অর্জন করতে পারি তেমনি এর অপব্যবহারে জীবনে নেমে আসতে পারি চরম বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা এবং অন্ধকার।


যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত, ইলম অর্জন, ইসলামের প্রচার-প্রসার, আত্মীয়তার হক আদায় কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি সেই প্রযুক্তিই যদি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে তবে তা ইহকাল ও পরকাল—উভয়কেই ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।


আমাদের সমাজের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেকেই এই মোবাইলকে গিবত, চোগলখুরি, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।

অনেকেই এর মাধ্যমে অবৈধ সম্পর্ক ও পরকীয়ায় লিপ্ত হচ্ছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য পারিবারিক বন্ধন এবং সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে রক্তপাত, হত্যাকাণ্ড সহ নানা বিশৃঙ্খলা।


এছাড়াও মোবাইল ফোনকে অশ্লীলতার প্রসার, গুজব এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, নিরপরাধ ব্যক্তিকে হুমকি-ধমকি দেওয়া এবং অবৈধ চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিতেই হারাম নয় বরং সামাজিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ।

অনেক যুবক অনলাইন ভিত্তিক জুয়া বা বেটিংয়ের মতো মরণফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে। অথচ এগুলো সুস্পষ্ট হারাম এবং কবিরা গুনাহ।

আজকের দিনে অনলাইন গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস কিংবা অন্তহীন নাটক-সিনেমা মানুষকে এমন এক কৃত্রিম নেশায় ডুবিয়ে রেখেছে, যা তার জীবনের মূল্যবান সময়কে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। বাস্তবতার চেয়ে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে পড়ে থাকাটা এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর পরিণাম মারাত্মক ভয়াবহ। যেমন:

সদকা নাকি উমরা: কোনটা বেশি উত্তম?

 


প্রশ্ন: যদি একই সাথে দুটি কাজ করা সম্ভব না হয় তবে উমরা করা উত্তম নাকি গরিব-অসহায়দের মাঝে দান-সদকা করা বেশি ভালো?

উত্তর:

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আল্লাহর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর পরিবারবর্গ ও সহচরদের ওপর। অতঃপর-

▪️ সদকা যদি ফরজ হয় (যেমন: জাকাত, মানত, মানত ভঙ্গের কাফফারা, কসম ভঙ্গের কাফফারা ইত্যাদি) তবে তা আদায় করা নফল উমরার চেয়ে নিঃসন্দেহে অনেক বেশি উত্তম।

তবে সাধারণ নিয়মে নফল সদকার চেয়ে নফল হজ ও উমরা করা উত্তম। কারণ উমরার মাধ্যমে অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি শারীরিক ইবাদত—যেমন: তাওয়াফ, সাঈ, জিকির, সালাত ও তালবিয়ার মতো একাধিক ইবাদত একসাথে পালনের সুযোগ হয়।

▪️তবে যদি আপনার আশেপাশে এমন সমস্যাগ্রস্থ মানুষ থাকে যাদের‌ নিকট বেঁচে থাকার ন্যূনতম রসদ বা অবলম্বন নেই কিংবা আপনার নিজের নিকটাত্মীয়রা অভাব-অনটনে ভুগছে অথচ তাদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা করার পাশাপাশি উমরা আদায় করবেন -এমন সমন্বয় করাও আপনার দ্বারা সম্ভব না হয়—তবে এই অবস্থায় অভাবগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোই বেশি উত্তম।


- হানাফি মাজহাবের বিখ্যাত গ্রন্থ 'কানজুদ দাকায়িক'-এ রয়েছে:

«حَجُّ النَّفْلِ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ»

"সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজ করা বেশি উত্তম।"

[কানযুদ দাকায়িক]

- ইমাম মালেক (রহ.)-কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, নফল হজ নাকি সদকা—কোনটি আপনার কাছে বেশি প্রিয়? তিনি জবাবে বলেন:

«الْحَجُّ، إِلَّا أَنْ تَكُونَ سَنَةُ مَجَاعَةٍ»

"হজ করাই উত্তম। তবে দেশ যদি দুর্ভিক্ষের মধ্য দিয়ে যায় তবে দান করা উত্তম।"

[মওয়াহিবুল জলীল]

- শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) তার 'আল ইখতিয়ারাত' গ্রন্থে বলেছেন:

«وَأَمَّا إِذَا كَانَ لَهُ أَقَارِبُ مَحَاوِيجُ، فَالصَّدَقَةُ عَلَيْهِمْ أَفْضَلُ، وَكَذَا إِذَا كَانَ هُنَاكَ قَوْمٌ مُضْطَرُّونَ إِلَى نَفَقَتِهِ، فَأَمَّا إِذَا كَانَ كِلَاهُمَا تَطَوُّعًا، فَالْحَجُّ أَفْضَلُ، لِأَنَّهُ عِبَادَةٌ بَدَنِيَّةٌ مَالِيَّةٌ، وَكَذَا الْأُضْحِيَةُ وَالْعَقِيقَةُ أَفْضَلُ مِنَ الصَّدَقَةِ بِقِيمَةِ ذَلِكَ»

"কিন্তু কারও যদি অভাবগ্রস্ত আত্মীয়স্বজন থাকে তবে তাদের সাহায্য করাই বেশি উত্তম। একইভাবে যদি এমন লোকজন থাকে যে তারা তার আর্থিক সাহায্যের ওপর চরমভাবে নির্ভরশীল তাহলেও তাদের দান করা উত্তম। আর যদি দুটিই সাধারণ নফল কাজ হয় (অর্থাৎ কেউ চরম বিপদে নেই) তবে হজ করাই উত্তম। কারণ এটি একই সাথে শারীরিক ও আর্থিক ইবাদত। ঠিক যেমন কুরবানি ও আকিকা করা অধিক উত্তম সেগুলোর মূল্য দান করে দেওয়ার চেয়ে।"

[আল ইখতিয়ারাত]


- ইমাম শাওকানি (রহ.) 'নাইলুল আওতার' গ্রন্থে

«أَيُّ الأَعْمَالِ أَفْضَلُ؟ فَذَكَرَ الإِيمَانَ، ثُمَّ الْجِهَادَ، ثُمَّ الْحَجَّ»

"কোন আমলটি সবচেয়ে উত্তম? উত্তরে তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইমানের কথা উল্লেখ করলেন, তারপর জিহাদ, এরপর হজের কথা।" [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম] এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন:

«هُوَ حُجَّةٌ لِمَنْ فَضَّلَ حَجَّ النَّفْلِ عَلَى الصَّدَقَةِ»

"এটি সেই আলেমদের পক্ষে দলিল, যারা সাধারণ দানের চেয়ে নফল হজকে অগ্রাধিকার দেন।" [নাইলুল আওতার]

মেহেদি ও কলপের ব্যবহার: নারী-পুরুষের জন্য শরিয়তের জরুরি বিধিবিধান:

 



নারীরা স্বাভাবিকভাবেই সাজসজ্জার অংশ হিসেবে হাতে-পায়ে মেহেদি বা বিভিন্ন রং ব্যবহার করে থাকেন। এতে কোনো সমস্যা নেই আলহামদুলিল্লাহ। তবে বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যায়, অনেক যুবক গায়ে হলুদ, বিয়ে, ঈদ কিংবা নানা আনন্দ-উৎসবে সাজসজ্জা করতে গিয়ে হাতে বা শরীরের বিভিন্ন স্থানে মেহেদি ব্যবহার করে থাকে। অনেকে আবার আকিকা, সুন্নতে খতনা কিংবা নিছক শখের বশে ছোট ছেলেদের হাতও মেহেদির রঙে রাঙিয়ে দেন। এছাড়া কখনো কখনো বিভিন্ন শারীরিক ব্যাধির কারণে মেহেদি ব্যবহারের প্রয়োজন হয়। আবার বয়োবৃদ্ধ নারী-পুরুষ চুলে এবং পুরুষরা দাড়িতে কলপ করে থাকেন।

এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক শরয়ি বিধান জানা আমাদের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাই বিজ্ঞ আলেমদের দলিলভিত্তিক ফতোয়ার আলোকে বিষয়গুলো সংক্ষেপে ও সহজভাবে তুলে ধরা হলো।

وبالله التوفيق

▪️ নারীদের জন্য মেহেদি ব্যবহার:

সাজসজ্জার উদ্দেশ্যে মেহেদি বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক রং ব্যবহার করা নারীদের জন্য সম্পূর্ণরূপে বৈধ। রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

طِيبُ الرِّجَالِ مَا ظَهَرَ رِيحُهُ وَخَفِيَ لَوْنُهُ، وَطِيبُ النِّسَاءِ مَا ظَهَرَ لَوْنُهُ وَخَفِيَ رِيحُهُ

"পুরুষের সুগন্ধি হলো তা, যার ঘ্রাণ প্রকাশ পায় কিন্তু রং গোপন থাকে। আর নারীর সুগন্ধি হলো তা, যার রং প্রকাশ পায় কিন্তু ঘ্রাণ গোপন থাকে।"

[সুনানে তিরমিজি, হাদিস নম্বর ২৭৮৮ — হাসান সহিহ]


এই হাদিস থেকেই স্পষ্ট বোঝা যায়, সৌন্দর্যবর্ধন ও রঙের মাধ্যমে নিজেকে সাজানো নারীদের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। আর সুগন্ধি ছড়িয়ে দেওয়া পুরুষদের বৈশিষ্ট্য।

এটি কতই না উত্তম বিদআত! -এর অর্থ

 


উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর উক্তি:

«نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ»

"এটি কতই না উত্তম বিদআত!"-এর অর্থ এবং বিদআতের প্রকারভেদ


প্রশ্ন: কেউ কেউ বলেন, বিদআতের মধ্যে বিদআতে হাসানাহ বা ভালো বিদআত ও বিদআতে সাইয়েয়াহ বা মন্দ বিদআত রয়েছে। এর দলিল হিসেবে তারা তারাবিহ সম্পর্কে উমর (রা.)-এর সেই উক্তি পেশ করেন:

«نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ»

"এটি কতই না উত্তম বিদআত!"

এই প্রকারভেদ সম্পর্কে আপনার অভিমত কী?

উত্তর:

কিছু আলেম মনে করেন, বিদআতকে পাঁচ ভাগে ভাগ করা যায় এবং তাতে শরিয়তের পাঁচটি হুকুম প্রযোজ্য হয়— হারাম, ওয়াজিব, মাকরুহ, মুস্তাহাব ও মুবাহ। একদল আলেম এ মত পোষণ করেছেন। আবার অন্য আলেমগণ এ প্রকারভেদ অস্বীকার করে বলেছেন, বিদআতের মধ্যে কোনো ভাগ নেই। বরং প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি (ভ্রষ্টতা)। মুসলিমদের নেতা ও ইমাম রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এমনটা বলেছেন,

كل بدعة ضلالة.

—"প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি।"


কারো জন্য এর বিপরীত বলার সুযোগ নেই যে, না, সব বিদআত গোমরাহি নয়। এমনটা বলা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওপর একধরনের ধৃষ্টতা, যা জায়েজ নয়। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

كُلُّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ، وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ

"প্রতিটি নবউদ্ভাবিত বিষয়ই বিদআত। আর প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি।"

[সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৬৭, বর্ণনাকারী: জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.)]


তিনি স্পষ্টভাবেই এ কথা বলেছেন এবং ব্যাখ্যা করেছেন। কাজেই আমাদের বা অন্য কারও জন্য এ কথা বলার সুযোগ নেই যে, বিদআতের কিছু অংশ গোমরাহি আর কিছু অংশ গোমরাহি নয়। বরং প্রতিটি বিদআতই গোমরাহি।


- বিদআত কাকে বলে?


বিদআত হলো, মানুষ দ্বীনের মধ্যে যা নতুন সৃষ্টি করে, তার সবটাই গোমরাহি। যারা বিদআতকে ভাগ করার পক্ষে দলিল পেশ করেন তাদের সে দলিলে আসলে কোনো প্রমাণ নেই।


তারা 'ওয়াজিব বিদআত'-এর দলিল হিসেবে যেসব বিষয় উপস্থাপন করেন—যেমন: মুসহাফে (কুরআনে) নুকতা ও হরকত বসানো, মসজিদ নির্মাণ—এসবের কোনোটিই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়। বরং এসব হলো আল্লাহ ও তাঁর রসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর আদেশকৃত বিষয়। আল্লাহ মসজিদ নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন, কুরআনের হেফাজত, মুখস্থকরণ ও তিলাওয়াতের প্রতি যত্নবান হতে নির্দেশ দিয়েছেন। যা কিছু এসব কাজে সহায়ক হয় তা এই হেফাজত ও যত্নের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।


মূল কথা হলো, তারা যা উল্লেখ করেছেন তা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়, বরং তা দ্বীনের অংশ, দ্বীন হেফাজত করার অংশ এবং নেকি ও তাকওয়ার কাজে পরস্পরকে সাহায্য করার অংশ।


এবার আসা যাক উমর (রা.)-এর সেই উক্তির ব্যাখ্যায়, যা তিনি বলেছিলেন যখন তিনি দেখলেন, মানুষ তাঁর নির্দেশে তারাবিহর নামাজে একত্রিত হয়েছে। নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর যুগে মানুষ একা একা এবং ছোট ছোট দলে নামাজ পড়ত। এরপর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) কয়েক রাত তাদের নিয়ে জামাতে নামাজ পড়ান, তিন রাত টানা কিয়াম করান, তারপর তা বন্ধ করে দেন এবং বলেন, "আমি আশঙ্কা করছি, তোমাদের ওপর রাতের এই নামাজ ফরজ করে দেওয়া হতে পারে।" তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) তাঁর উম্মতের প্রতি অত্যন্ত স্নেহশীল ছিলেন।


নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)-এর ওফাতের পর সিদ্দিক (রা.) মুরতাদদের বিষয় নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন, আর সাহাবিগণও তাতে ব্যস্ত ছিলেন। এরপর উমর (রা.)-এর খিলাফতের সময় এলে তিনি এসব বিষয় থেকে অপেক্ষাকৃত অবসর পান। আর তাঁর শাসনকালও দীর্ঘ ছিল। তখন তিনি লক্ষ করলেন, মানুষ মসজিদে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আলাদা আলাদাভাবে নামাজ পড়ছে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, সবাইকে এক ইমামের পেছনে একত্র করবেন। তিনি সাহাবি উবাই (রা.)-কে তাদের ইমামতি করার নির্দেশ দেন। এরপর একরাতে যখন তিনি বের হয়ে তাদের একত্রে নামাজরত অবস্থায় দেখলেন তখন বললেন,

نِعْمَتِ الْبِدْعَةُ هَذِهِ

"এটি কতই না উত্তম বিদআত!"

[সহিহ বুখারি, হাদিস: ২০১০]


এখানে তিনি একে ভাষাগত অর্থে 'বিদআত' বলেছেন, দ্বীনি অর্থে নয়। কেননা ভাষায় 'বিদআত' বলা হয় এমন কিছুকে যার পূর্বে কোনো নজির ছিল না। অর্থাৎ এর আগে মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে নামাজ পড়ত, এক ইমামের পেছনে একত্র হতো না। যখন তিনি তাদের একত্র করলেন, তখন বললেন, "এটি কতই না উত্তম বিদআত"—যা তিনি নিজে তাদের জন্য করেছিলেন, যাতে তারা একত্রিত হয় এবং নেকি ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহায়তা করে। আর যেহেতু রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এটি ধারাবাহিকভাবে করেননি—মাত্র তিন রাত করে তারপর বন্ধ করে দিয়েছিলেন—তাই উমর (রা.) এ কথা বলেছিলেন। এটি তাঁর ভাষাগত ব্যবহার, শরয়ি অর্থে নয়। কাজেই শরয়ি দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিদআত নয় বরং তা সুন্নত ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের একটি আমল, যা রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজে করেছেন, খুলাফায়ে রাশিদিন—উমর ও তাঁর পরবর্তীগণ—করেছেন, সাহাবায়ে কেরাম করেছেন এবং মুসলিমগণও করে আসছেন। আর নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই এর প্রতি উৎসাহ দিয়ে বলেছেন,


مَنْ قَامَ رَمَضَانَ إِيمَانًا وَاحْتِسَابًا؛ غُفِرَ لَهُ مَا تَقَدَّمَ مِنْ ذَنْبِهِ


"যে ব্যক্তি ইমান ও সওয়াবের আশায় রমজানে রাত জেগে নামাজ পড়বে তার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।"

[সহিহ বুখারি, হাদিস নং ৩৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ৭৫৯ — বর্ণনাকারী: আবু হুরায়রা (রা.)]


তিনি আরও বলেছেন,

مَنْ قَامَ مَعَ الْإِمَامِ حَتَّى يَنْصَرِفَ؛ كُتِبَ لَهُ قِيَامُ لَيْلَةٍ

"যে ব্যক্তি ইমামের সাথে (তারাবিহ) শেষ পর্যন্ত দাঁড়াবে তার জন্য পুরো রাত কিয়াম করার সওয়াব লেখা হবে।"


[সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ৮০৬ (হাসান সহিহ), বর্ণনাকারী: আবু যর গিফারি (রা.)]


এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, তারাবিহর নামাজ শরিয়তসম্মত। তাতে ইমাম ও জামাত থাকা বৈধ। এটি কোনোভাবেই বিদআতের অন্তর্ভুক্ত নয়।"


ফতওয়া প্রদান:

আল্লামা ইমাম আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.)

সাবেক প্রধান মুফতি, সৌদি আরব

অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

প্রশ্ন: "কোনো ইমানদার কিয়ামতের ভয়ংকর দৃশ্য দেখবে না।" এ কথা কি সঠিক?



উত্তর:

হ্যাঁ, এটি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত ও সম্পূর্ণ সঠিক কথা।

নিঃসন্দেহে কিয়ামত সৃষ্টিজগতের সবচেয়ে ভয়াবহ ও প্রলয়ংকরী ঘটনা। কুরআন ও হাদিসের বর্ণনামতে, আল্লাহর নির্দেশে সম্মানিত ফেরেশতা ইসরাফিল (আ.) যখন শিঙ্গায় ফুঁ দেবেন তখন সমগ্র পৃথিবী প্রবল কম্পনে কেঁপে উঠবে। পাহাড়গুলো তুলার মতো উড়তে থাকবে, আকাশ বিদীর্ণ হবে, গ্রহ-নক্ষত্র কক্ষপথচ্যুত হবে এবং সমুদ্রে অগ্নিকুণ্ড সৃষ্টি হবে। এছাড়াও ঘটবে মহাজাগতিক আরও নানা অঘটন।

এক কথায়, পুরো বিশ্বজাহান চরম বিভীষিকার মধ্য দিয়ে ধ্বংস হয়ে যাবে।

তবে মহান আল্লাহর বিশেষ রহমতে এই মহাপ্রলয়ের ভয়াবহতা কোনো মুমিনকে স্পর্শ করবে না। কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বেই আল্লাহ তাআলা পৃথিবী থেকে সকল ইমানদারকে সসম্মানে উঠিয়ে নেবেন। ফলে দুনিয়ায় কেবল ইমানহীন, কাফের, মুশরিক, নাস্তিক, পথভ্রষ্ট ও নিকৃষ্ট মানুষেরাই অবশিষ্ট থাকবে এবং তাদের ওপরই এই ভয়ংকর কিয়ামত নেমে আসবে।

প্রখ্যাত সাহাবি নাওয়াস ইবনে সাময়ান (রা.) থেকে বর্ণিত দীর্ঘ হাদিসে দাজ্জাল ও ইয়াজুজ-মাজুজের ফিতনা পরবর্তী সময় সম্পর্কে রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

ثُمَّ يَبْعَثُ اللَّهُ رِيحًا طَيِّبَةً فَتَأْخُذُهُمْ تَحْتَ آبَاطِهِمْ فَتَقْبِضُ رُوحَ كُلِّ مُؤْمِنٍ وَكُلِّ مُسْلِمٍ وَيَبْقَى شِرَارُ النَّاسِ يَتَهَارَجُونَ فِيهَا تَهَارُجَ الْحُمُرِ فَعَلَيْهِمْ تَقُومُ السَّاعَةُ

"অতঃপর আল্লাহ তাআলা এক সুবাসিত ও স্নিগ্ধ বাতাস প্রেরণ করবেন। তা মানুষের বগলের নিচ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে প্রতিটি মুমিন ও মুসলিমের রূহ কবজ করে নেবে। এরপর পৃথিবীতে কেবল নিকৃষ্ট মানুষগুলোই থেকে যাবে। তারা গাধার মতো প্রকাশ্যে ও নির্লজ্জভাবে যৌনকর্মে লিপ্ত হবে। আর এদের ওপরই কিয়ামত সংঘটিত হবে।" [সহিহ মুসলিম, ২৯৩৭]

অন্য হাদিসে আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেন,

لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى لَا يُقَالَ فِي الْأَرْضِ اللَّهُ اللَّهُ

"পৃথিবীতে যতক্ষণ পর্যন্ত 'আল্লাহ, আল্লাহ' বলার মতো কোনো মানুষ থাকবে ততক্ষণ কিয়ামত সংঘটিত হবে না।" [সহিহ মুসলিম, ১৪৮]

একই সূত্রে অপর বর্ণনায় এসেছে—

لَا تَقُومُ السَّاعَةُ عَلَى أَحَدٍ يَقُولُ اللَّهُ اللَّهُ

"যে ব্যক্তি 'আল্লাহ, আল্লাহ' বলে, তার ওপর কখনো কিয়ামত আসবে না।" [সহিহ মুসলিম, ১৪৮]

অন্য বর্ণনায় "আল্লাহ, আল্লাহ" শব্দের স্থলে "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" জিকিরের কথাও এসেছে। অর্থাৎ দুনিয়ায় আল্লাহর একত্ববাদের সামান্যতম জিকির বা স্মরণ অবশিষ্ট থাকা পর্যন্ত মহাপ্রলয় শুরু হবে না।

কালের পরিক্রমায় ইমানের চর্চা হ্রাস পেতে পেতে যখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে তখন আল্লাহ তাআলা তাঁর বিশেষ সুবাতাস পাঠাবেন। অন্তরে অণু পরিমাণ ইমান আছে—এমন প্রতিটি মুমিনের রূহ এই স্নিগ্ধ স্পর্শে কবজ হয়ে যাবে।

এরপর ধরণীতে আর কোনো সৎ ও ইমানদার বান্দা থাকবে না। সমগ্র পৃথিবী ছেয়ে যাবে চরম নৈতিকতাহীন ও পথভ্রষ্ট মানুষে, যাদের মুখে আল্লাহর নামও উচ্চারিত হবে না। ঠিক তখনই তাদের ওপর ঘনিয়ে আসবে কিয়ামতের সেই মহাসংকট।

কিয়ামতের ভয়াবহ দৃশ্য ও আতঙ্ক থেকে মুমিন বান্দাদের মুক্ত রাখা মহান আল্লাহর এক অপরিসীম দয়া ও অনুকম্পা।

মোটকথা হলো, আল্লাহর বিশেষ রহমতে কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে প্রেরিত পবিত্র বাতাসের মাধ্যমে সকল ইমানদার শান্তিতে দুনিয়া ত্যাগ করবেন। ফলে কোনো মুমিনকে কিয়ামতের সেই বিভীষিকা প্রত্যক্ষ করতে হবে না। কিয়ামত সংঘটিত হবে কেবল বেইমান-কাফের ও নিকৃষ্ট মানুষদের ওপর।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে পূর্ণ ঈমানের সাথে দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার তৌফিক দান করুন এবং কিয়ামতের ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

— আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...