Wednesday, 7 October 2026

খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের সময় সর্বক্ষেত্রে বাম হাত ব্যবহার নিষিদ্ধ :



প্রশ্ন : আমরা জানি হাদিসে বাম হাত দিয়ে পানি পান করা নিষিদ্ধ। কিন্তু ভাত খেতে খেতে যদি পানি পান করতে হয় তখন তো ডান হাত দিয়ে পান করা যায় না। এক্ষেত্রে করণীয় কি?

উত্তর : হাদিসে বাম হাতে পানাহার করাকে নিষেধ করার পাশাপাশি এটিকে শয়তানের কর্ম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং একাধিক হাদিসে পানাহারের ক্ষেত্রে ডান হাত ব্যবহারের নির্দেশ এসেছে।

তাই খাদ্য-পানীয় গ্রহণের ক্ষেত্রে কোন অবস্থাতেই বাম হাত ব্যবহার করা জায়েজ নেই। 

আমাদের সমাজে অনেক মানুষ ডান হাতে খাদ্য গ্রহণের সময় বাম হতে পানি পান করে। কেউ কেউ তো সরাসরি বাম হাতেই খাদ্য বা পানীয় গ্রহণ করে। এগুলো সবই হারাম কাজ।

আবার অনেকেই খাদ্য গ্রহণের সময় বাম হাতে গ্লাস ধরে ডান হাতটা সামান্য একটু গ্লাসের সাথে লাগায়। এটাও জায়েজ নেই। কেননা তা মূলত বাম হাতে পান করারই অন্তর্ভুক্ত। কারণ গ্লাসটা তার বাম হাতেই রয়েছে।

তবে প্রয়োজন বোধে এর বিপরীতটা জায়েজ। অর্থাৎ ডান হাতে গ্লাস ধরে বাম হাতের সাহায্য নেওয়া। এতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ।

সুতরাং ওয়ান টাইম গ্লাস বা ব্যক্তিগত গ্লাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে সরাসরি ডান হাত ব্যবহার করা কর্তব্য। 

কিন্তু যদি একাধিক ব্যক্তি একটি মাত্র গ্লাস ব্যবহার করে এবং ডান হাতে খাবার লেগে থাকার কারণে গ্লাস নোংরা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে (যা অন্যের অরুচির কারণ হতে পারে) তাহলে গ্লাসটা হাতের তালু বা তালুর উপরিভাগে রেখে কিংবা আঙ্গুল ভালোভাবে চেটে পরিষ্কার করে ডান হাত দ্বারা গ্লাস ধরবে।

মোটকথা, সর্বক্ষেত্রে খাদ্য ও পানীয় গ্রহণের সময় ডান হাত ব্যবহার করবে। প্রয়োজন বোধে বাম হাতের সাহায্য নেওয়া যাবে। কিন্তু বাম হাতে গ্লাস ধরে ডান হাতের একটু সাহায্য নিয়ে পান করা মূলত বাম হাতে পান করারই নামান্তর। সুতরাং তা করা যাবে না।

আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।

আরো পড়ুন :

পানাহার ও খাদ্যদ্রব্য সংক্রান্ত সকল লিংক এক সাথে

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1338532856566256&id=235040300248856&mibextid=Nif5oz

উত্তর প্রদানে :

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব। 

বারবার বেড়াতে আসা বন্ধু-আত্মীয়দের মেহমানদারির শরয়ি বিধান

 


প্রশ্ন: হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনে বিশ্বাস রাখে, সে যেন মেহমানের সম্মান করে।” তাহলে যেসব বন্ধু বা আত্মীয় প্রতি সপ্তাহে বা ঘন ঘন একাধিকবার বেড়াতে আসেন তাঁদের মেহমানদারির ব্যাপারে শরিয়তের হুকুম কী?

উত্তর:

 মেহমানের সম্মান ও আপ্যায়ন কেবল সামাজিক সৌজন্য বা ভদ্রতার বিষয় নয়; ইসলামি জীবনবিধানে এটি চমৎকার চরিত্র গঠন ও সুদৃঢ় সামাজিক বন্ধনের এক অনুপম ভিত্তি। শরিয়তের দৃষ্টিতে মেহমানদারি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, একে সরাসরি ইমানের পরিপূর্ণতার সাথে যুক্ত করা হয়েছে।  প্রখ্যাত সাহাবি আবু শুরাইহ আল-খুজায়ি (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:

> "مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيُكْرِمْ ضَيْفَهُ، جَائِزَتُهُ يَوْمٌ وَلَيْلَةٌ، وَالضِّيَافَةُ ثَلَاثَةُ أَيَّامٍ، فَمَا كَانَ وَرَاءَ ذَلِكَ فَهُوَ صَدَقَةٌ"

 "যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন তার মেহমানকে সম্মান করে। মেহমানের বিশেষ যত্ন ও আপ্যায়ন একদিন ও একরাত, আর সাধারণ মেহমানদারি তিন দিন পর্যন্ত। এরপরও যা করা হবে, তা সদকা হিসেবে গণ্য হবে।" [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬০১৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮]

অধিকাংশ ফকিহ ও আলেমগণের মতে, মেহমানদারি করা সুন্নত ও একটি অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে দূর থেকে আসা কোনো মুসাফির বা বিপদে পড়া পথিকের জন্য আশ্রয় ও খাবারের সংস্থান করার গুরুত্ব শরিয়তে আরও অনেক বেশি।

হাদিসে একদিন বা তিন দিন আপ্যায়নের যে কথা এসেছে, তা মূলত দূর থেকে আসা মেহমানদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য যারা মেজবানের বাড়িতে রাত্রিযাপন বা অবস্থান করেন। অন্যদিকে যেসব বন্ধু-বান্ধব বা আত্মীয়-স্বজন কাছাকাছি থাকেন এবং কিছুক্ষণের জন্য সাক্ষাৎ করতে এসে চলে যান তাঁদের জন্য প্রতিবারই বিশেষ আপ্যায়ন করা জরুরি নয়। এমন মেহমানদের ক্ষেত্রে হাসিমুখে অভ্যর্থনা জানানো, সুন্দর আচরণ করা এবং ঘরে যা সাধারণ খাবার রয়েছে তা দিয়েই সাধ্যমতো সামান্য আপ্যায়ন করাই মেহমানদারির হক আদায়ের জন্য যথেষ্ট। তবে তারা আত্মীয়-স্বজন হলে মেহমানদারির পাশাপাশি 'সিলাতুর রাহিম' বা রক্ত সম্পর্ক রক্ষার ব্যাপারে বিশেষ যত্নশীল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে তাদের হক দ্বগুণ। মেহমাদারি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক।

মেজবানের জন্য কৃত্রিম লৌকিকতা বা নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে বাড়াবাড়ি করা উচিত নয়; বরং ঘরে যা সহজলভ্য আছে তা-ই বিনয়ের সাথে সামনে উপস্থাপন করা সুন্নাত। বারবার আসা-যাওয়ার কারণে মেজবানের যদি সত্যিই কোনো পারিবারিক, ব্যক্তিগত বা আর্থিক অসুবিধা হয় তবে অসন্তুষ্ট বা বিরক্ত না হয়ে ভদ্র ও মার্জিত ভাষায় তাঁদের সময় ঠিক করে আসতে বলা কিংবা সাময়িক অসমর্থতার কথা জানিয়ে দেওয়া জায়েজ। এতে কোনো গুনাহ হবে না।

পাশাপাশি ইসলামি নীতিমালায় মেহমানের ওপরেও কিছু শিষ্টাচার ও দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। মেহমানের উচিত মেজবানের সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখা, না জানিয়ে হঠাৎ উপস্থিত না হওয়া, অসময়ে বা অতি ঘন ঘন যাতায়াত করে মেজবানকে বিব্রত না করা এবং দীর্ঘ সময় অবস্থান করে কাউকে কষ্ট না দেওয়া। হাদিসের অন্য বর্ণনায় মেজবানকে কোনো কষ্টে ফেলা থেকে মেহমানকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

আবু শুরাইহ আল-খুজায়ি (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন:

"وَلاَ يَحِلُّ لَهُ أَنْ يَقِيمَ عِنْدَهُ حَتَّى يُحْرِجَهُ"

"আর কোনো মেহমানের জন্য তার মেজবানের কাছে এত দীর্ঘ সময় অবস্থান করা বৈধ নয় যাতে সে মেজবানকে সংকটে বা কষ্টে ফেলে দেয়।" [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১৩৫; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮]

ইমাম মুসলিম-এর বর্ণনায় হাদিসের শেষ অংশটি আরেকটু স্পষ্টভাবে এভাবে এসেছে:

"وَلاَ يَحِلُّ لِلْمُسْلِمِ أَنْ يُقِيمَ عِنْدَ أَخِيهِ حَتَّى يُؤْثِمَهُ. قَالُوا: يَا رَسُولَ اللَّهِ، وَكَيْفَ يُؤْثِمُهُ؟ قَالَ: يُقِيمُ عِنْدَهُ وَلاَ شَيْءَ لَهُ يُقْرِيهِ بِهِ"

"কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের কাছে এত দিন থাকা বৈধ নয়, যাতে সে তাকে গুনাহগার করে ফেলে। সাহাবিগণ আরজ করলেন: হে আল্লাহর রাসুল! সে তাকে কীভাবে গুনাহগার করবে? তিনি বললেন: সে তার কাছে অবস্থান করতেই থাকে অথচ মেজবানের কাছে এমন কিছু থাকে না যা দিয়ে সে তার আপ্যায়ন করবে।" [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৪৮]

সারকথা হলো, ঘন ঘন আসা বন্ধু-আত্মীয়দের সম্মান ও আপ্যায়ন করা প্রশংসনীয় উত্তম কাজ হলেও প্রতিবার বিশেষ ও আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজন শরিয়তে বাধ্যতামূলক নয়। মেজবান কৃত্রিমতা বর্জন করে আন্তরিক থাকবেন এবং মেহমানও মেজবানের স্বাচ্ছন্দ্যের বিবেচনা রাখবেন—তাহলেই পারস্পরিক সম্পর্ক সৌহার্দ্যপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ থাকে।

আল্লাহ তাআলাই সবচেয়ে ভালো জানেন। 

-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

দাঈ,জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব। 

Tuesday, 6 October 2026

বিতর সালাতের পর দুই রাকাত নফল আদায় করার বিধান




প্রশ্ন: অনেকে বলে যে, বিতর সালাতের পর দুই রাকাত নফল সালাত পড়তে হয়, যাকে 'হালকি নফল' বলা হয়। তারা বলে, রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নাকি বিতর সালাতের পর বসে বসে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করতেন। আমি জানতে চাচ্ছি, এই হাদিসটি কি সহিহ? আমরা কি এর ওপর আমল করতে পারি?

উত্তর:

রাতের সালাতের সাধারণ নিয়ম হলো, বিতরই হবে রাতের সর্বশেষ সালাত। সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে আল্লাহর রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেছেন:

اجْعَلُوا آخِرَ صَلاَتِكُمْ بِاللَّيْلِ وِتْرًا

"তোমরা বিতরকে রাতের শেষ সালাত বানাও।" [সহিহ বুখারি, হাদিস: ৯৯০; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৫১]

তবে রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনো কখনো বিতরের পরেও বসে বসে দুই রাকাত নফল সালাত আদায় করেছেন। তবে এটি তাঁর নিয়মিত অভ্যাস ছিল না।


এ প্রসঙ্গে ইমাম নওয়াবি (রাহ.) বলেন,“বিতর পড়ার পরও যে কেউ চাইলে কিছু নফল সালাত আদায় করতে পারে। এর বৈধতা দেখানোর জন্যই রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এমনটি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সাধারণ ও নিয়মিত নিয়ম ছিল বিতর পড়ার পর আর কোনো সালাত না পড়া।


একই সঙ্গে, বসে নফল সালাত আদায় করা যে জায়েজ, এই আমলের মাধ্যমে তাও প্রমাণিত হয়। বিতরের পর বসে দুই রাকাত নফল পড়ার এই হাদিসটি সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে।” [সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৭৩৮]

মাইকের মাধ্যমে উচ্চ আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত বাজানো কতটুকু শরিয়ত সম্মত?

 


▬▬▬▬◆◈◆ ▬▬▬▬

প্রশ্ন: বর্তমানে লকডাউন অবস্থায় দেখা যাচ্ছে, প্রায় সব জায়গায় মাইকের মাধ্যমে সারাদিন কুরআন তিলাওয়াত বাজানোা হচ্ছে বা  কুরআন খতম দেয়া হচ্ছে। এটা কতটুকু শরিয়ত সম্মত বা যৌক্তিক?

উত্তর:

◯ ১) করোনাভাইরাস থেকে মুক্তির উদ্দেশ্যে যদি কোরআন খতম করা হয় বা কুরআন তিলাওয়াত চালু রাখা হয় তাহলে তা বিদআত হিসেবে পরিগণিত হবে। কেননা বিপদ, বিপর্যয়, রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচার উদ্দেশ্যে কুরআন খতম করা বা উচ্চ আওয়াজে কুরআন তিলাওয়াত করার নির্দেশনা ইসলামে নেই।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:

مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ فِيهِ فَهُوَ رَدٌّ

“যে ব্যক্তি দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয় এমন নতুন জিনিষ চালু করল তা পরিত্যাজ্য। (বুখারী, অধ্যায়: সন্ধি-চুক্তি।)

আর সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় রয়েছে:

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

“যে ব্যক্তি এমন আমল করল যার ব্যাপারে আমার নির্দেশ নাই তা প্রত্যাখ্যাত।" (সহীহ মুসলিম, অধ্যায়: বিচার-ফয়সালা)

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...