Sunday, 11 October 2026

জয়িফ বা দুর্বল হাদিসের পরিচয়, চেনার সহজ উপায় এবং হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলেমদের মতভেদ হলে করণীয়




প্রশ্ন: দুর্বল হাদিস কাকে বলে? দুর্বল হাদিস চেনার সহজ উপায় কী?

আর কোনো হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে মুহাক্কিক আলেমদের মধ্যে মতভেদ থাকলে করণীয় কী?

উত্তর:

🔸জঈফ হাদিস কাকে বলে?

উত্তর:

কোন হাদিসে সহিহ বা হাসান হাদিসের এক বা একাধিক শর্ত না পাওয়া গেলে তাকে জঈফ বা দুর্বল হাদিস বলে।

ইবনুস সালাহ বলেন,

الحَدِيثُ الضَّعِيفُ: مَا فَقَدَ أَحَدَ شُرُوطِ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ: أَيْ: كُلُّ حَدِيثٍ لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الصَّحِيحِ، وَكَذَا لَمْ تَجْتَمِعْ فِيهِ شُرُوطُ الحَدِيثِ الحَسَنِ، فَهُوَ ضَعِيفٌ، وَهُوَ أَنْوَاعٌ تَزِيدُ عَنِ الخَمْسِينَ نَوْعًا

"যে হাদিসে সহিহ হাদিসের সব শর্ত পাওয়া যায়নি এবং হাসান হাদিসের শর্তও পূর্ণ হয়নি, সেটিই জয়িফ। জয়িফ হাদিসের প্রকার পঞ্চাশের বেশি।" [মুকাদ্দিমা ইবনিস সালাহ, পৃ. ৪১]


🔸জইফ হাদিস চেনার উপায়:


জঈফ বা দুর্বল হাদিস (اَلْحَدِيثُ الضَّعِيفُ) চেনার মূল চাবিকাঠি হলো দুটি বিষয় দেখা: সনদের ধারাবাহিকতা বিচ্ছিন্ন হওয়া অথবা বর্ণনাকারীর (রাবির) মধ্যে এমন ত্রুটি থাকা, যার কারণে হাদিসটি বিশুদ্ধতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হয় না।


কোনো হাদিস সহিহ হতে পাঁচটি শর্ত পূরণ করতে হয়:

প্রাকৃতিক দুর্যোগকে নির্দিষ্ট কোনো পাপের সাথে সম্পৃক্ত করার বিধান:

 



ভূমিকম্প, টর্নেডো, পাহাড়ধস, ভূমিধস, খরা, বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, দাবানল বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগকে কোনো জাতির নির্দিষ্ট অন্যায় বা পাপের সাথে নিশ্চিতভাবে জুড়ে দেওয়া জায়েজ নয়। অর্থাৎ নিশ্চিত করে বলা যাবে না যে, অমুক দুর্যোগ তাদের অমুক পাপাচারের কারণেই ঘটেছে।


কারণ এটি গায়েবের বিষয়, যা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না। এর পেছনে আল্লাহর এমন হিকমত রয়েছে, যা আমাদের অজানা। কেউ এমন কথা বললে তা হবে না-জানা বিষয়ে কথা বলার শামিল, যা ইসলামে নিষিদ্ধ।


আল্লাহ তাআলা বলেন,


وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ ۚ إِنَّ السَّمْعَ وَالْبَصَرَ وَالْفُؤَادَ كُلُّ أُولَٰئِكَ كَانَ عَنْهُ مَسْئُولًا


"যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার পেছনে পড়ো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তর এগুলোর প্রত্যেকটি সম্পর্কেই জিজ্ঞাসিত হতে হবে।" [সুরা ইসরা: ৩৬]


🔹কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আকিদা ও ইসলামি সংস্কৃতির অধ্যাপক ড. আব্দুল আজিম আল-সাগিরি বলেন,

القول بأن الكوارث الطبيعية دائمًا عقاب من الله يعدّ تدخلًا في قدر الله

"প্রাকৃতিক দুর্যোগকে সবসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি বলা আল্লাহর কদর (সিদ্ধান্ত)-এর ওপর এক ধরনের হস্তক্ষেপ।"


🔹ইসলাম ওয়েব-এ বিষয়ে বলা হয়েছে,

প্রশ্ন: সহিহ হাদিস কাকে বলে?



উত্তর:

🔸‘সহিহ’-এর পারিভাষিক সংজ্ঞায় ইমাম ইবনুস সালাহ (রহ.) বলেন:

«أَمَّا الْحَدِيثُ الصَّحِيحُ: فَهُوَ الْحَدِيثُ الْمُسْنَدُ الَّذِي يَتَّصِلُ إِسْنَادُهُ بِنَقْلِ الْعَدْلِ الضَّابِطِ عَنِ الْعَدْلِ الضَّابِطِ إِلَى مُنْتَهَاهُ، وَلَا يَكُونُ شَاذًّا وَلَا مُعَلَّلًا»

“সহিহ হাদিস হলো সেই মুসনাদ (রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত সনদ পৌঁছেছে এমন) হাদিস, যার সনদ (বর্ণনা পরম্পরা) আদিল (ন্যায়পরায়ণ ও সৎ) ও পূর্ণ আয়ত্তশক্তিসম্পন্ন বর্ণনাকারী কর্তৃক আদিল ও পূর্ণ আয়ত্তশক্তিসম্পন্ন বর্ণনাকারী থেকে সনদের শেষ পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে বর্ণিত এবং যা শায (অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত) বা মুআল্লাল (গোপন ত্রুটিযুক্ত) নয়।”

[মুকাদ্দিমা ইবনিস সালাহ]

শব্দগুলোর ব্যাখ্যা:

- মুসনাদ: যার সনদ বা বর্ণনা সূত্র রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পর্যন্ত অবিচ্ছিন্নভাবে পৌঁছেছে। (তবে মুসনাদের সংজ্ঞায় মুহাদ্দিসদের মধ্যে কিছু মতভেদ আছে।)

- আদিল: যে বর্ণনাকারী মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান, কবিরা গুনাহ ও প্রকাশ্য ফিসক থেকে মুক্ত এবং মুরুআত (ব্যক্তিত্ব ও শিষ্টাচার) বিরোধী কাজ থেকে বিরত।

- শায: কোনো গ্রহণযোগ্য (সিকাহ) বর্ণনাকারী যদি তাঁর চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য বা সংখ্যায় বেশি বর্ণনাকারীর বিপরীত বর্ণনা করেন তাহলে সেই বর্ণনা শায।

- মুআল্লাল: যে হাদিসের সনদ বা মতনে এমন সূক্ষ্ম ও গোপন ত্রুটি (ইল্লত) আছে, যা বাহ্যিকভাবে সহিহ মনে হলেও গভীর অনুসন্ধানে ধরা পড়ে।

🔸 হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি (রহ.) বলেন:

«وَخَبَرُ الآحَادِ بِنَقْلِ عَدْلٍ تَامِّ الضَّبْطِ، مُتَّصِلِ السَّنَدِ، غَيْرِ مُعَلَّلٍ وَلَا شَاذٍّ: هُوَ الصَّحِيحُ لِذَاتِهِ»

 “যে খবরে আহাদ ন্যায়পরায়ণ ও পূর্ণ আয়ত্তশক্তির অধিকারী বর্ণনাকারীর মাধ্যমে অবিচ্ছিন্ন সনদ পরম্পরায় বর্ণিত হয় এবং মুআল্লাল (গোপন ত্রুটিযুক্ত) ও শায (অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বিপরীত) নয়, সেটিই সহিহ লি-যাতিহি।”

[নুখবাতুল ফিকার]

উল্লেখ্য যে, হাফেজ ইবনে হাজার নুখবাতুল ফিকার-এ খবরকে প্রথমে মুতাওয়াতির ও আহাদে ভাগ করেছেন। মুতাওয়াতিরের বর্ণনাকারীর সংখ্যা এত বেশি যে তাঁদের মিথ্যার ওপর একমত হওয়া অসম্ভব। তাই এর সত্যতা প্রমাণে আদালত, জব্‌ত ইত্যাদি শর্ত আলাদাভাবে যাচাই করার প্রয়োজন পড়ে না। এসব শর্ত যাচাইয়ের প্রয়োজন পড়ে খবরে আহাদের ক্ষেত্রে। তাই তিনি আহাদের আলোচনায় এই সংজ্ঞা দিয়েছেন। 

🔹মোটকথা: হাদিস সহিহ হওয়ার জন্য ৫টি শর্ত থাকা আবশ্যক। যথা:

১. অবিচ্ছিন্ন সনদ: হাদিসটি এমন অবিচ্ছিন্ন সূত্রে বর্ণিত হওয়া, যার কোথাও একজন বর্ণনাকারীও বাদ পড়েননি।

২. আদালত: সনদের প্রত্যেক বর্ণনাকারী সততা ও ন্যায়নিষ্ঠায় প্রশ্নাতীত হওয়া।

৩. পূর্ণ আয়ত্তশক্তি (জব্‌ত): বর্ণনাকারী পূর্ণ আয়ত্তশক্তির অধিকারী হওয়া, অর্থাৎ হাদিস সংরক্ষণে কোনো ত্রুটি না থাকা, চাই তা মুখস্থ রাখার ক্ষেত্রে হোক বা লিখে রাখার ক্ষেত্রে।

৪. শায না হওয়া: বর্ণনাকারীর বর্ণনা তাঁর চেয়ে অধিক নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীর বিপরীত না হওয়া।

৫. মুআল্লাল না হওয়া: হাদিস বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে সনদ বা মতনে কোনো গোপন ত্রুটি ধরা না পড়া।

— আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আবদুল জলীল মাদানি

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...