শুরু করছি মহান আল্লাহর নামে যানি পরম করুনাময়, অসীম দয়ালু।
ইয়াজুয-মা’জুযের আগমণ
ইয়াজুয-মা’জুযের আগমণ
ইয়াজুয মা’জুযের পরিচয়ঃ
ইয়াজুয-মা’জুযের দল বের হওয়া কিয়ামতের একিটি অন্যতম বড় আলামত। এরা বের হয়ে পৃথিবীতে বিপর্যয় ও মহা ফিতনার সৃষ্টি করবে। এরা বর্তমানে যুল-কারনাইন বাদশা কতৃক নির্মিত প্রাচীরের ভিতরে অবস্থান করছে। কিয়ামতের পূর্ব মুহূর্তে তারা দলে দলে মানব সমাজের ভিতরে চলে এসে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালাবে। তাদের মোকাবেলা করার মত তখন কারো শক্তি থাকবেনা।
তাদের পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন কথা বর্নিত হয়েছ। কোন কোন আলেম বলেনঃ তারা শুধু মাত্র আদমের বংশধর। আদম ও হাওয়ার বংশধর নয়। কারণ হিসেবে বলেনঃ আদম (আঃ) এর একবার স্বপ্নদোষ হয়েছিল।স্বপ্নদোষের মাধ্যমে বীর্যপাত হয়ে মাটির সাথে মিশে গেলে তা থেকে আল্লাহ তায়ালা ইয়াজুয-মা’জুয জাতি সৃষ্টি করেন। ইবনে হাজার (রঃ) বলেনঃ কথাটি পূর্ব যুগের কোন গ্রহণযোগ্য আলেম কর্তৃক বর্ণিত হয়নি। শুধুমাত্র কা’ব আল- আহবার থেকে বর্ণিত হয়েছ। কথাটি সুস্পষ্ট মারফু হাদীছের বিরোধী হওয়ায় তা গ্রহনযোগ্য নয়। মোটকথা তারা তুর্কীদের পূ্র্ব পুরুষ ইয়াফিছের বংশধর । আর ইয়াফিছ হলো নূহ (আঃ) এর সন্তান। কাজেই তারা আদম হাওয়ারই সন্তান। প্রমাণ স্বরুপ বুখারী শরীফের হাদীছটি উল্লেখযোগ্য।
নবী (ছাঃ) বলেনঃ
“ রোজ হাশরে আল্লাহ তা’আলা আদমকে বলবেনঃ হে আদম! আদম বলবেনঃ আমি আপনার দরবারে উপস্থিত আছি। সমস্ত কল্যান আপনার হাতে। আল্লাহ বলবেনঃ জাহান্নামের বাহিনীকে আলাদা করো। আদম বলবেনঃ কারা জাহান্নামের অধীবাসী। আল্লাহ বলেবেনঃ প্রতি হাজারের মধ্যে নয়শত নিরানব্বই জন। এ সময় শিশু সন্তান বৃদ্ধ হয়ে যাবে, গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভের সন্তান পড়ে যাবে এবং মানুষদেরকে আপনি মাতাল অবস্থায় দেখতে পাবেন। অথচ তারা মাতাল নয়। আল্লাহর আযাবের ভয়াবহতা অবলোকন করার কারণেই তাদেরকে মাতালের মত দেখা যাবে। সাহবীগণ বললেনঃ আমাদের কি হবে সেই বাকী একজন? উত্তরে নবী (ছাঃ) বললেনঃ তোমরা সুসংবাদ গ্রহণ করো। তোমাদের মধ্যে থেকে হবে একজন। আর ইয়াজুয-মা’জুযের মধ্য থেকে হবে নয়শত নিরানব্বই জন। আল্লাহর শপথ! আমি আশা করি তোমরা জান্নাতীদের চারভাগের একভাগ হবে। আমরা এটা শুনে তাকবীর পাঠ করলাম। তারপর নবী (ছাঃ) বললেনঃ আমি আশা করি তোমরা জান্নাতীদের তিনভাগের একভাগ হবে। আমরা এটা শুনেও তাকবীর পাঠ করলাম। তারপর নবী (ছাঃ) বললেনঃ আমি আশা করি তোমরা জান্নাতীদের দু’ভাগের একভাগ হবে। আমরা এটা শুনেও তাকবীর পাঠ করলাম। পরিশেষে নবী (ছাঃ) বললেনঃ তোমরা সমগ্র মানব জাতির মধ্যে একটি সাদা গরুর চামড়ায় একটি কালো লোমের মত।(বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবু আহাদীছুল আম্বীয়া)
কুরআন ও হাদীছ থেকে ইয়াজুয-মা’জুয সম্পর্কে যা জানা যায়ঃ
আল্লাহর দুজন সৎ বান্দা সমগ্র পৃথিবীর বাদশা হয়েছিলেন। একজন হলেন আল্লাহর নবী সুলায়মান ইবনে দাউদ (আঃ) আর অন্যজন যুল-কারনাইন বাদশা। যুলকারনাইন বাদশা পূর্ব-পশ্চিম প্রান্তসহ সমগ্র পৃথিবী পরিভ্রমন করেছিলেন। কুরআন মাজীদের সূরা কাহাফে তাঁর ভ্রমণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তাঁর ভ্রমণের কাহিনীর এক পর্যায়ে ইয়াজুয-মা’জুযের বিবরন এসেছে।
আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
ثُمَّ أَتْبَعَ سَبَبًا﴿٩٢﴾حَتَّىٰ إِذَا بَلَغَ بَيْنَ السَّدَّيْنِ وَجَدَ مِن دُونِهِمَا قَوْمًا لَّا يَكَادُونَ يَفْقَهُونَ قَوْلًا﴿٩٣﴾قَالُوا يَا ذَا الْقَرْنَيْنِ إِنَّ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ مُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ فَهَلْ نَجْعَلُ لَكَ خَرْجًا عَلَىٰ أَن تَجْعَلَ بَيْنَنَا وَبَيْنَهُمْ سَدًّا ﴿٩٤﴾قَالَ مَا مَكَّنِّي فِيهِ رَبِّي خَيْرٌ فَأَعِينُونِي بِقُوَّةٍ أَجْعَلْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ رَدْمًا﴿٩٥﴾آتُونِي زُبَرَ الْحَدِيدِ ۖ حَتَّىٰ إِذَا سَاوَىٰ بَيْنَ الصَّدَفَيْنِ قَالَ انفُخُوا ۖ حَتَّىٰ إِذَا جَعَلَهُ نَارًا قَالَ آتُونِي أُفْرِغْ عَلَيْهِ قِطْرًا﴿٩٦﴾فَمَا اسْطَاعُوا أَن يَظْهَرُوهُ وَمَا اسْتَطَاعُوا لَهُ نَقْبًا﴿٩٧﴾قَالَ هَٰذَا رَحْمَةٌ مِّن رَّبِّي ۖ فَإِذَا جَاءَ وَعْدُ رَبِّي جَعَلَهُ دَكَّاءَ ۖ وَكَانَ وَعْدُ رَبِّي حَقًّا ﴿٩٨﴾وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ ۖ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا
অর্থঃ “অতঃপর তিনি পথ অবলম্বন করলেন। চলতে চলতে তিনি যখন দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী স্থানে পৌঁছলেন তখন তথায় এমন এক জাতির সন্ধান পেলেন যারা তাঁর কথা একেবারেই বুঝতে পারছিলনা। আরা বললঃ হে যুল-কারনাইন! ইয়াজুয ও মা’জুয পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করছে। আমরা কি আপনাকে বিনিময় স্বরুপ কর প্রদান করবো এই শর্তে যে, আপনি আমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি প্রচীর নির্মান করে দিবেন? যুল-কারনাইন বললেনঃ আমার প্রভু আমাকে যে ক্ষমতা দিয়েছেন তাই যথেষ্ট। তোমরা আমাকে শ্রম দিয়ে সাহায্য কর। আমি তোমাদের ও তাদের মাঝখানে একটি মজবুত প্রাচীর তৈরী করে দিবো। তোমরা লোহার পাত নিয়ে আসো। অতঃপর যখন দুই পাহাড়ের মধ্যর্তী ফাঁকাস্থান পূর্ণ হয়ে লৌহ স্তুপ দুই পর্বতের সমান হলো তখন যুল-কারনাইন বললেনঃ তোমরা ফুঁক দিয়ে আগুন জ্বালাও। যখন ওটা আগুনে পরিণত হলো তখন তিনি বললেনঃ তোমরা গলিত তামা আনয়ন কর ওটা আগুনের উপরে ঢেলে দেই। এভাবে প্রচীর নির্মান সম্পূর্ন হওয়ার পর ইয়াজুয ও মাজুয তা অতিক্রম করতে পারলো না এবং তা ছিদ্র করতেও সক্ষম হলো না। যুল-নাইন বললেনঃ এটা আমার প্রভুর অনুগ্রহ । যখন আমার প্রভুর ওয়াদা পূরনের সময় (কিয়ামত) নিকটবর্তী হবে তখন তিনি প্রাচীরকে ভেঙ্গে চুরমার করে মাটির সাথে মিশিয়ে দিবেন। আমার প্রতিপালকের ওয়াদা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে। সেদিন আমি তাদেরকে ছেড়ে দেবো দলের পর দলে সাগরের ঢেউয়ের আকারে। এবং শিংগায় ফুৎকার দেয়া হবে। অতঃপর আমি তাদের সকলকেই একত্রিত করবো” । (সূরা কাহাফঃ ৯২-৯৯)
আখেরী যামানায় কিয়ামতের পূর্বে পাহাড় ভেদ করে ইয়াজুয ও মা’জুযের আগমন সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র বলেনঃ
“ এমন কি যখন ইয়াজুয ও মা’জুযকে মুক্ত করা হবে তখন তারা প্রত্যেক উঁচু ভুমি থেকে দলে দলে ছুটে আসবে। যখন সত্য প্রতিশ্রুতি নিকটর্তী হবে তখন কাফেরদের চক্ষু স্থির হয়ে যাবে। তারা বলবেঃ হায় দুর্ভোগ আমাদের! আমরা তো ছিলাম এবিষয়ে উদাসীন; বরং আমরা ছিলাম জালেম”। (সূরা আম্বীয়াঃ ৯৬-৯৭)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, আল্লাহ তা’আলা ন্যায় পরায়ন বাদশা যুল-কারনাইনকে ইয়াজুয-মা’জুযের বিশাল প্রাচীর নির্মাণের ক্ষমতা দিয়েছিলেন। যাতে তারা মানুষের মাঝে এবং পৃথিবীতে অশান্তি ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে না পারা । যখন নির্দিষ্ট সময় এসে যাবে এবং কিয়ামত নিকটবর্তী হবে তখন উক্ত প্রাচীর ভেঙ্গে যাবে। প্রচন্ড বেগে তারা দলে দলে বের হয়ে আসবে। কোন শক্তিই তাদের সামনে দাঁড়াতে পারবেনা। পৃথিবীতে তারা অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। আর এটি হবে শিংগায় ফুঁক দেয়া, দুনিয়া ধ্বংস ও কিয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার অতি নিকটবর্তী সময়ে।
বুখারী ও মুসলিম শরীফে যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছেঃ
“ একদা নবী (ছাঃ) তাঁর নিকটে ভীত- সন্ত্রস্ত হয়ে প্রবেশ করলেন। তিনি বলিছিলেনঃ আরবদের জন্য ধ্বংস! একটি অকল্যান তাদের অতি নিকটবর্তী হয়ে গেছে। আজ ইয়াজুয-মা’জুযের প্রাচীর এই পরিমাণ খুলে দেয়া হয়েছে। এ কথা বলে তিনি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলী ও তার পার্শ্বের আঙ্গুল দিয়ে বৃত্ত তৈরী করে দেখালেন। যায়নাব বিনতে জাহশ (রাঃ) বলেনঃ আমি রাসূল (ছাঃ) কে বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল আমাদের মাঝে সৎ লোক থাকতেও আমরা ধ্বংস হয়ে যাবো? নবী (ছাঃ) বললেনঃ হ্যা, যখন পাপ কাজ বেড়ে যাবে”। (বুখারী, অধ্যায়ঃ কিতাবুর আম্বীয়া)