Saturday, 3 October 2026

ঘরে খেলনার পুতুল থাকলে সালাত আদায়ের সময় করণীয় কী এবং এগুলো ঘরে থাকার দায় কার উপর বর্তাবে?



প্রশ্ন: আমার ছোট ভাই বোন তারা পুতুল দিয়ে খেলা করে কিন্তু পুতুল ঘরে থাকলে তো ঘরে রহমতের ফেরেশতা প্রবেশ করে না। আমি চাইলেও পুতুল গুলো সরাতে পারবো না এক্ষেত্রে আমার কী করণীয়? আমি শুনেছি ফজর এবং মাগরিবের ওয়াক্তে রহমতের ফেরেশতা ঘরে প্রবেশ করে তাই ঐ সময়ে পুতুল গুলো লুকিয়ে রাখলে যথেষ্ট হবে কি?

আর যে ঘরে নামাজ পড়বো ঐ ঘরে পুতুল থাকলে কি কোনও সমস্যা আছে?

উত্তর:

ঘরে কোন প্রাণীর ছবি, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদি রাখা জায়েজ নেই। ঠিক তদ্রূপ বাচ্চাদের খেলনা পুতুলও রাখা জায়েজ নেই। (অবশ্য যদি সেগুলোর নাক, চোখ, মুখ, কান ইত্যাদি অবয়বগুলো মুছে দেওয়া হয় তাহলে তাতে কোন সমস্যা নেই ইনশাআল্লাহ)।। হাদিসে সাব্যস্ত হয়েছে, আবু ত্বলহা রা. হতে বর্ণিত, রসুলুল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

"‏ لاَ تَدْخُلُ الْمَلاَئِكَةُ بَيْتًا فِيهِ كَلْبٌ وَلاَ تَصَاوِيرُ ‏"

"যে ঘরে কুকুর এবং প্রাণীর ছবি থাকে সেই ঘরে (আল্লাহর রহমতের) ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” [সহীহ বুখারী (তাওহীদ পাবলিকেশন), অধ্যায়: ৭৭/ পোশাক, পরিচ্ছেদ: ৭৭/৮৮. ছবি সম্পর্কিত]

তাই অনতিবিলম্বে এগুলো থেকে ঘরবাড়িকে পরিষ্কার করা আবশ্যক। অন্যথায় বাড়ির প্রধান কর্তা ব্যক্তি এ জন্য গুনাহগার হবে। আপনার দ্বারা যদি সেগুলো ফেলে দেওয়া বা নষ্ট করা সম্ভব না হয় তাহলে এতে আপনি গুনাহগার হবেন না ইনশাআল্লাহ। কেননা তা আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। যে ঘরে প্রাণীর ছবি, মূর্তি, ভাস্কর্য ইত্যাদি রয়েছে সে ঘরেও সালাত শুদ্ধ হবে ইনশাআল্লাহ। তবে উত্তম হলো, এসব থেকে মুক্ত অন্য কোনও ঘরে সালাত আদায় করা। কমপক্ষে সালাতের সময় এসব জিনিস কাপড় বা কোন কিছু দিয়ে ঢেকে রাখা।

আল্লাহ তৌফিক দান করুন। আমিন।

➤ আর‌ও পড়ুন :

✪ ঘরে প্রাণীর ছবি, কার্টুন, প্রতিকৃতি বা মূর্তি থাকলে সে ঘরে সালাত আদায় করার বিধান

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=403754580044093&id=235040300248856&mibextid=Nif5oz

✪ টিনের চালে গরু, উট, মোরগ ইত্যাদির ছবি থাকলে করণীয় এবং এমন ছবিযুক্ত ঘরে সালাত আদায়ের বিধান

https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=1157054421380768&id=235040300248856&mibextid=Nif5oz

উত্তর প্রদানে:

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব।

আল্লাহর শুকরিয়া আদায়ের অপরিহার্যতা ও পদ্ধতি

 


প্রশ্ন: কীভাবে আল্লাহ সুবহানাল্লাহু ওয়া তা'আলার জন্য উত্তম উপায়ে শুকরিয়া আদায় করতে পারি? যে নিয়ামতগুলোর মধ্যে আছি, সুন্দরভাবে শুকরিয়া আদায় করলে অন্তর প্রশান্ত হবে? জাযাকাল্লাহু খাইরান।

উত্তর:

আল্লাহতালা অসংখ্য নেয়ামত দ্বারা আমাদের জীবনকে ঋদ্ধ করেছেন। আমরা প্রতি মুহূর্তে তার নেয়ামত ভোগ করছি। তাই আমাদের কর্তব্য, মহান রবের দরবারে কৃতজ্ঞতা আদায় করা। 

আমরা আল্লাহর যত বেশি শুকরিয়া আদায় করব তিনি তত বেশি আমাদেরকে দান করবেন। কিন্তু অকৃতজ্ঞ হলে রয়েছে কঠিন শাস্তি। 

আল্লাহ তাআলা বলেন, 

لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ ۖ وَلَئِن كَفَرْتُمْ إِنَّ عَذَابِي لَشَدِيدٌ

" যদি তোমরা শুকরিয়া আদায় করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের (নিয়ামত) বাড়িয়ে দেব; আর যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি কঠোর।" [সূরা ইব্রাহিম: ৭]

মহান আল্লাহ আমাদেরকে তার শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ এবং অকৃতজ্ঞ হওয়া থেকে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বলেন,

فَاذْكُرُونِي أَذْكُرْكُمْ وَاشْكُرُوا لِي وَلَا تَكْفُرُونِ

Friday, 2 October 2026

গর্ভবতী নারীর তালাকের ইদ্দত কত দিন?



প্রশ্ন: স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা কাটাকাটি হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়েছে এবং তারা আলাদা হয়ে গিয়েছে। মেয়েটি এখন ছয় মাসের গর্ভবতী; সন্তান প্রসবে আরও চার-পাঁচ মাস বাকি। এই অবস্থায় মেয়েটির ইদ্দত কি তিন হায়েজ হবে, নাকি সন্তান প্রসব হলে ইদ্দত শেষ হবে?

উত্তর:

গর্ভবতী নারীর ইদ্দত তিন হায়েজ নয় বরং তার ইদ্দত শেষ হবে, সন্তান প্রসব হওয়ার মাধ্যমে সময় কম বা বেশি যাই হোক না কেন।

সুতরাং প্রসবের আরো চার-পাঁচ মাস বা তারও বেশি সময় বাকি থাকলেও এই বিধানে কোনো পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ সন্তান প্রসব হওয়ার পরেই ইদ্দত শেষ হবে।

✪ আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَنْ يَضَعْنَ حَمْلَهُنَ

"আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতকাল হলো সন্তান প্রসব করা পর্যন্ত।" [সুরা তালাক: ৪]

তিন হায়েজের বিধান হলো যাদের গর্ভ নেই তাদের জন্য। গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে আয়াতটি সুস্পষ্ট ও সাধারণ (আম)। তাই তালাকপ্রাপ্তা গর্ভবতী নারীও এর অন্তর্ভুক্ত।

✪ হাদিসে এসেছে,

عَنِ الْمِسْوَرِ بْنِ مَخْرَمَةَ أَنَّ سُبَيْعَةَ الْأَسْلَمِيَّةَ نُفِسَتْ بَعْدَ وَفَاةِ زَوْجِهَا بِلَيَالٍ، فَجَاءَتِ النَّبِيَّ ﷺ فَاسْتَأْذَنَتْهُ أَنْ تَنْكِحَ، فَأَذِنَ لَهَا فَنَكَحَتْ

"সুবাইআ আল-আসলামিয়্যা (রা.) স্বামীর মৃত্যুর কয়েক রাত পরেই সন্তান প্রসব করেন। এরপর তিনি রসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর কাছে এসে বিবাহের অনুমতি চাইলে তিনি অনুমতি দিলেন এবং তিনি বিবাহ করলেন।" [সহিহ বুখারি: ৫৩২০]

একটি হারিয়ে যাওয়া সুন্নত: উপরে ওঠার সময় আল্লাহু আকবার এবং নিচে নামার সময় সুবহানাল্লাহ পাঠ করা:



প্রশ্ন: উঁচু স্থানে উঠার সময় 'আল্লাহু আকবার' এবং নিচু স্থানে নামার সময় 'সুবহানাল্লাহ' পাঠ করা সুন্নত। ঘরের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা বা নামার ক্ষেত্রেও কি তা সুন্নত?

উত্তর:

উঁচু স্থানে উঠতে আল্লাহর বড়ত্ব প্রকাশ স্বরূপ ‘আল্লাহু আকবার’ এবং নীচে নামতে ‘সুবহানাল্লাহ’ বলা সুন্নত। প্রখ্যাত সাহাবি জাবির রা. বলেন,

كُنَّا إِذَا صَعِدْنَا كَبَّرْنَا وَإِذَا نَزَلْنَا سَبَّحْنَا 

"আমরা যখন উপরের দিকে উঠতাম, ‘আল্লাহু আকবার’ ও যখন নীচের দিকে নামতাম তখন ‘সুবহানাল্লাহ’ বলতাম।" [বুখারি, হা/২৯৯৩]

অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, ইবনে উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, 

كَانَ النَّبِيُّ ﷺ وَجُيُوشُهُ إِذَا عَلَوا الثَّنَايَا كَبَّرُوا، وَإِذَا هَبَطُوا سَبَّحُوا  

এক মিনিটে আপনি কি কি আমল করতে পারেন



||||||||||||||||||||||||||||||||||

প্রশ্ন: আমরা অফিসে বা কর্মস্থলে ইবাদত-বন্দেগী ও নেককাজের তেমন কোন সময় পাই না। অফিসের পর বাকী যে সামান্য সময় পাই এর মধ্যে আমরা কি কি আমল করতে পারি এবং এ সময়কে কিভাবে কাজে লাগাতে পারি?

===============

উত্তর: সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য।সময় মানুষের জীবন সময়কে কখনো অপচয় হতে বা অকাজে নষ্ট হতে দেয়ার মত নয়। প্রজ্ঞাবান ও বুদ্ধিমান সেই ব্যক্তি যে তার সময়ের সদ্ব্যবহার করে। তাই বুদ্ধিমান ব্যক্তি সময়কে অহেতুক কাজে বা অর্বাচীন কথায় ব্যয় করে না। বরং তিনি সময়কে প্রশংসনীয় উদ্যোগ ও ভাল কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেন। যে কাজ আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে এবং মানুষের উপকার বয়ে আনে। জীবনের প্রতিটি মিনিটে আপনি একটি করে প্রস্তর স্থাপন করতে পারেন যা আপনার মর্যাদার ভবনকে উচ্চকিত করবে এবং যা দিয়ে আপনার জাতি সৌভাগ্যমণ্ডিত হতে পারবে।

আপনি যদি মর্যাদার শিখরে পৌঁছুতে চান এবং আপন জাতিকে সৌভাগ্যমণ্ডিত করতে চান তবে আরাম-আয়েশকে না-বলুন এবং অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করুন।

এক মিনিট সময়ের মাঝে অনেক ভাল কাজ করা যেতে পারে এবং বিশাল সওয়াব পাওয়া যেতে পারে। শুধু আপনার জীবনের এক মিনিট সময় ব্যয় করে আপনি আপনার দানের পরিধি বাড়াতে পারেন, কোন কিছু উপলব্ধি করতে পারেন, কোন কিছু মুখস্থ করতে পারেন, যে কোন নেককাজ করতে পারেন। শুধু এক মিনিটেই আপনার ভালো কাজের আমলনামায় এই আমলগুলো লেখা হয়ে যাবে যদি আপনি জানেন কিভাবে এক মিনিট সময়কে কাজে লাগাতে হয় এবং বাস্তবে কাজে লাগান। কবি বলেন:

“প্রতিটি মিনিটে বৃহত্তর কল্যাণে প্রবৃত্ত হও।

জুমার দিনে তিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ করণীয় ও ফযিলত:

 


1⃣ ১) দুয়া করা:

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: 

يَوْمُ الْجُمُعَةِ اثْنَتَا عَشْرَةَ سَاعَةً ، لَا يُوجَدُ فِيهَا عَبْدٌ مُسْلِمٌ يَسْأَلُ اللَّهَ شَيْئًا إِلَّا آتَاهُ إِيَّاهُ فَالْتَمِسُوهَا آخِرَ سَاعَةٍ بَعْدَ الْعَصْرِ

“জুমার দিনে ১২টি ঘণ্টা রয়েছে। এর মধ্যে এমন একটি ঘণ্টা রয়েছে যেখানে এমন কোন মুসলিম নাই যে, সে যদি তখন আল্লাহর নিকট কিছু চায় আল্লাহ তাকে দিবেন না। আর তোমরা আসরের পরে (মাগরিবের আগের) শেষ ঘণ্টায় সে সময়টা অনুসন্ধান করো।”

(সুনান আবু দাউদ, অনুচ্ছেদ: জুমার দিন দুয়া কবুল হওয়ার সময় কোনটি? শাইখ আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। )

◾ উল্লেখ্য যে, অন্য একটি যঈফ বা দুর্বল হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, উক্ত সময়টা হল:

حِينَ تُقَامُ الصَّلَاةُ إِلَى الِانْصِرَافِ مِنْهَا

“জুমার সালাতের একামত হওয়া থেকে নিয়ে শুরু করে সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত।” (তিরমিযী ও ইবনে মাজাহ। কিন্তু শাইখ আলবানী বলেছেন  এটি ضعيف جدا খুব দুর্বল।)

◾ অধিকাংশ সালাফের মত হল, তা আসরের পর থেকে মাগরিবের পূর্ব পর্যন্ত সময়টি। আল্লাহ ভালো জানেন।

▬▬▬▬▬▬▬

2⃣ ২) সূরা কাহাফ পাঠ:

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

مَن قَرَأَ سورةَ الكَهفِ يومَ الجُمُعةِ أضاءَ له من النورِ ما بَينَ الجُمُعتينِ

“যে ব্যক্তি জুমআর দিনে সূরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য পরবর্তী জুমা পর্যন্ত আলোকময় হবে (অর্থাৎ সে হেদায়েতের আলোর উপর পরিচালিত হবে ইনশাআল্লাহ)। (দেখুনঃ সহিহ তারগিব ওয়াত্ তারহিব, হাদিস নং- ৭৩৬, ইবনে হাজার  আসকালানী এটিকে হাসান বলেছেন। তিনি আরও বলেন, এ হাদিসটি সূরা কাহাফ প্রসঙ্গে বর্ণিত সবচেয়ে শক্তিশালী হাদিস, {ফায়যুল কাদির ৬/১৯৮})

◾উল্লেখ্য যে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত (জুমার রাত) থেকে শুরু করে শুক্রবার সূর্য ডুবার পূর্ব পর্যন্ত যে কোন সময় (এক বৈঠকে অথবা একাধিক বৈঠকে) সূরা কাহাফ পুরোটা পড়ে শেষ করতে হবে। তাহলে উক্ত মর্যাদা লাভ করা যাবে ইনশাআল্লাহ।

▬▬▬▬▬▬▬

3⃣ ৩) অধিক পরিমানে দরূদ পাঠ:

আউস বিন আউস রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: 

إِنَّ مِنْ أَفْضَلِ أَيَّامِكُمْ يَوْمَ الْجُمُعَةِ ، فِيهِ خُلِقَ آدَمُ عَلَيْهِ السَّلَام ، وَفِيهِ قُبِضَ ، وَفِيهِ النَّفْخَةُ ، وَفِيهِ الصَّعْقَةُ ، فَأَكْثِرُوا عَلَيَّ مِنْ الصَّلَاةِ فَإِنَّ صَلَاتَكُمْ مَعْرُوضَةٌ عَلَيَّ ، قَالُوا : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، وَكَيْفَ تُعْرَضُ صَلاتُنَا عَلَيْكَ وَقَدْ أَرَمْتَ -أَيْ يَقُولُونَ قَدْ بَلِيتَ- قَالَ : إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ قَدْ حَرَّمَ عَلَى الأَرْضِ أَنْ تَأْكُلَ أَجْسَادَ الأَنْبِيَاءِ عَلَيْهِمْ السَّلام

 “তোমাদের দিন সমূহের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ দিন হল জুমার দিন। এই দিনে আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে, এই দিনে তাকে মৃত্যু দেওয়া হয়েছে, এই দিনে সিংগায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং মহা বিপর্যয়ও (ক্বিয়ামত) ঘটবে এই দিনেই। তাই এই দিনে তোমরা বেশি বেশি আমার উপর দরুদ পাঠ করবে; কেননা তোমাদের দরুদ আমার উপর পেশ করা হয় জুমার দিনে।

 সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলে, হে  আল্লাহর রাসূল, আপনি কবরে গলে শেষ হওয়ার পরেও  কিভাবে আপনার উপর দরুদ পেশ  করা হয়? তিনি বললেন, আল্লাহ তাআলা মাটির জন্য নবীদের দেহ ভক্ষণ করা হারাম করে দিয়েছেন।  ” 

(আবু দাউদ,নাসাঈ,ইবনু মাজা প্রমুখের বরাতে সহীহ আত তারগীব ওয়াত তারহীব,মিশকাত আলবানী হা/১৩৬১)

▬▬▬🏮🏮🏮▬▬▬

লেখক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

দাঈ, জুবাঈল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সৌদি আরব

জুমার দিন সূরা কাহফ পাঠের সঠিক সময়: রাত নাকি দিন?

 


সূরা কাহফ পাঠ করা জুমার দিনের অন্যতম একটি সুন্নাহ সম্মত আমল। তা জুমার রাতে অথবা দিনে সুবিধাজনক যে কোন সময়ে এক বা একাধিক বৈঠকে পড়া যায়। চাই অর্থসহ পড়া হোক কিংবা অর্থ ছাড়া—এতে কোন সমস্যা নেই।

কতিপয় আলেম জুমার রাতে নয় বরং দিনে পড়ার কথা বলেছেন। কিন্তু গ্রহণযোগ্য সনদে মাউকুফ হাদিস দ্বারা রাতে পড়ার বিষয়টিও প্রমাণিত হয়েছে।

তাছাড়া আমরা জানি, চাঁদের হিসেবে জুমার রাত শুরু হয় বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে এবং জুমার দিন শেষ হয় শুক্রবার সূর্যাস্তের মাধ্যমে।

অতএব দলিল এবং যুক্তির নিরিখে এটি পাঠের গ্রহণযোগ্য সময়সীমা হলো, বৃহস্পতিবার সূর্যাস্ত থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত।

🔸 মুহাদ্দিস শাইখ আলবানি (রহ.)-এর বিশিষ্ট ছাত্র মুহাদ্দিস শাইখ মাশহুর ইবনে হাসান আলে সালমান (হাফিযাহুল্লাহ):

 প্রশ্ন: শুক্রবারের রাতে সূরা কাহফ পড়া কি শুক্রবার দিনে পড়ার পরিবর্তে যথেষ্ট হবে?

উত্তর:

"হ্যাঁ, জুমার দিন সম্পর্কে প্রসিদ্ধ হাদিসসমূহে কোনো কোনোটিতে "يوم الجمعة" (জুমার দিন) এবং কোনো কোনোটিতে "ليلة الجمعة" (জুমার রাত) উল্লেখ এসেছে।

আবু সাঈদ আল-খুদরি (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মাউকুফ আছারে এসেছে:

حَدَّثَنَا أَبُو النُّعْمَانِ، حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، حَدَّثَنَا أَبُو هَاشِمٍ، عَنْ أَبِي مِجْلَزٍ، عَنْ قَيْسِ بْنِ عَبَّادٍ، عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ: "مَنْ قَرَأَ سُورَةَ الْكَهْفِ لَيْلَةَ الْجُمُعَةِ، أَضَاءَ لَهُ مِنَ النُّورِ فِيمَا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْبَيْتِ الْعَتِيقِ".

"যে ব্যক্তি জুমার রাতে সূরা কাহফ পাঠ করবে তার এবং বাইতুল আতিক (কাবা)-এর মধ্যবর্তী স্থান তার জন্য আলোকিত হয়ে যাবে।" [দারিমি, ৩৪৫০; ইরওয়াউল গালীল, ৩/৯৪]

শাইখ আলবানি (রাহিমাহুল্লাহ) ইরওয়াউল গালিলে বলেন:

قُلْتُ: وَهَذَا سَنَدٌ صَحِيحٌ رِجَالُهُ كُلُّهُمْ ثِقَاتٌ رِجَالُ الشَّيْخَيْنِ، وَأَبُو النُّعْمَانِ وَإِنْ كَانَ تَغَيَّرَ فِي آخِرِهِ فَقَدْ تَابَعَهُ سَعِيدُ بْنُ مَنْصُورٍ كَمَا تَقَدَّمَ، ثُمَّ هُوَ وَإِنْ كَانَ مَوْقُوفًا، فَلَهُ حُكْمُ الْمَرْفُوعِ؛ لِأَنَّهُ مِمَّا لَا يُقَالُ بِالرَّأْيِ كَمَا هُوَ ظَاهِرٌ.

"আমি বলছি, এই সনদ সহিহ। এর রাবীগণ সকলেই সিকাহ (নির্ভরযোগ্য) এবং বুখারি-মুসলিমের রাবি। আবু নুমান যদিও শেষ বয়সে তার স্মৃতিশক্তিতে কিছুটা পরিবর্তন এসেছিল, তবে পূর্বে উল্লেখিত মতো সাঈদ ইবনে মানসুর তার মুতাবাআত করেছেন। অতঃপর এটি মাউকুফ হলেও এর হুকুম মারফু-এর মতোই; কারণ এ ধরনের বিষয় রায় বা ব্যক্তিগত মত অনুযায়ী বলা যায় না, যা স্পষ্ট।"

সুতরাং যে ব্যক্তি জুমার দিনে অথবা জুমার রাতে সূরা কাহফ পাঠ করবে, তার জন্য তা যথেষ্ট হবে।"

وَاللهُ تَعَالَى أَعْلَمُ

— শাইখ মাশহুর ইবনে হাসান আলে সালমান (হাফিযাহুল্লাহ)

(মাজলিসে ফাতাওয়াল জুমুআহ, ২১ রবিউস সানি, ১৪৪০ হিজরি / ২৮-১২-২০১৮ খ্রিষ্টাব্দ) [meshoor]

▪️ইমাম মুনাবি (রাহ.) বলেন:

قَالَ الْحَافِظُ ابْنُ حَجَرٍ فِي "أَمَالِيهِ": كَذَا وَقَعَ فِي رِوَايَاتِ "يَوْمِ الْجُمُعَةِ" وَفِي رِوَايَاتِ "لَيْلَةِ الْجُمُعَةِ"، وَيُجْمَعُ بِأَنَّ الْمُرَادَ الْيَوْمُ بِلَيْلَتِهِ وَاللَّيْلَةُ بِيَوْمِهَا.

"হাফিজ ইবনে হাজার তার 'আমালি' গ্রন্থে বলেন: এভাবে কিছু বর্ণনায় 'يوم الجمعة' (জুমার দিন) এবং কিছু বর্ণনায় 'ليلة الجمعة' (জুমার রাত) এসেছে। এর সমন্বয় এভাবে করা হয় যে, দিন বলতে তার রাতসহ এবং রাত বলতে তার দিনসহ উদ্দেশ্য নেওয়া হয়েছে।" [ফাইদুল কাদির, ৬/১৯৯]

ইমাম মুনাবি (রাহিমাহুল্লাহ) আরো বলেন:

فَيُنْدَبُ قِرَاءَتُهَا يَوْمَ الْجُمُعَةِ وَكَذَا لَيْلَتَهَا كَمَا نَصَّ عَلَيْهِ الشَّافِعِيُّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ

"সুতরাং জুমার দিনে এবং তার রাতেও সূরা কাহফ পাঠ করা মুস্তাহাব, যেমনটি ইমাম শাফিঈ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।" [ফাইদুল কাদির, ৬/১৯৮]

[Islamqa info]

গ্রন্থনায়: 

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

দাঈ,‌ জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব 

সবরের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা


▬▬▬ ✪◉✪ ▬▬▬

সবর বা ধৈর্য ধারণ করা আকিদার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। জীবনে বিপদ-মুসিবত নেমে এলে অস্থিরতা প্রকাশ করা যাবে না। বরং ধৈর্য ধারণ করতে হবে। পাশাপাশি আল্লাহর নিকট প্রতিদান পাওয়ার আশা করতে হবে।

 ◈ ইমাম আহমদ রহ. বলেন, “আল্লাহ তায়ালা কুরআনে নব্বই স্থানে সবর সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।”

 ◈ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে,

الصبر ضياء

“সবর হল জ্যোতি।” (মুসনাদ আহমদ ও মুসলিম)

 ◈ উমর রা. বলেন, “সবরকে আমরা আমাদের জীবন-জীবিকার সর্বোত্তম মাধ্যম হিসেবে পেয়েছি।” (সহিহ বুখারি)

 ◈ আলী রা. বলেন, “ঈমানের ক্ষেত্রে সবরের উদাহরণ হল দেহের মধ্যে মাথার মত।” এরপর আওয়াজ উঁচু করে বললেন, “যার ধৈর্য নাই তার ঈমান নাই।” 

 ◈ আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

مَا أَعْطَى اللَّهُ أَحَدًا مِنْ عَطَاءٍ أَوْسَعَ مِنَ الصَّبْرِ

“আল্লাহ তায়ালা ধৈর্যের চেয়ে উৎকৃষ্ট এবং ব্যাপকতর দান কাউকে দেন নি।” (সুনান আবু দাউদ, অনুচ্ছেদ: নিষ্কলুষ থাকা। সহিহ)

 ❑ সবরের প্রকারভেদ: 

সবর তিন প্রকার। যথা:

 ✪ ১. আল্লাহর আদেশের উপর সবর করা।

 ✪ ২. আল্লাহর নিষেধের উপর সবর করা।

 ✪ ৩. বিপদাপদে সবর করা। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ وَمَنْ يُؤْمِنْ بِاللَّهِ يَهْدِ قَلْبَهُ

“আল্লাহর হুকুম ছাড়া কোন বিপদ আসে না। আর যে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে তিনি তাঁর অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন।” (সূরা তাগাবুন: ১১)

আলকামা বলেন, “আল্লাহ তায়ালা ‘যার অন্তরকে সঠিক পথের সন্ধান দেন’ সে হল ঐ ব্যক্তি যে বিপদে পড়লে বিশ্বাস করে এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে। ফলে বিপদে পড়েও সে খুশি থাকে এবং সহজভাবে তাকে গ্রহণ করে।”

অন্য মুফাসসিরগণ উক্ত আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, “যে ব্যক্তি বিপদে পড়লে বিশ্বাস রাখে যে এটা আল্লাহর ফায়সালা মোতাবেক এসেছে। ফলে সে সবর করার পাশাপাশি পরকালে এর প্রতিদান পাওয়ার আশা রাখে এবং আল্লাহর ফয়সালার নিকট আত্মসমর্পণ করে আল্লাহ তায়ালা তার অন্তরকে সঠিক পথে পরিচালিত করেন, আর দুনিয়ার যে ক্ষয়-ক্ষতি হয়েছে তার বিনিময়ে তিনি তার অন্তরে হেদায়েত এবং সত্যিকার মজবুত একিন দান করেন। যা নিয়েছেন তার বিনিময় দান করবেন।”

সাঈদ বিন জুবাইর রা. বলেন, “যে ব্যক্তি ঈমান আনে আল্লাহ তার অন্তরকে হেদায়েত দেন।” এ আয়াতের তাফসীর প্রসঙ্গে বলেন, অর্থাৎ সে কোন ক্ষয়-ক্ষতি ও বিপদের সম্মুখীন হলে বলে ‘ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেঊন’ অর্থাৎ আমরা আল্লাহর জন্যই আর তাঁর নিকটই ফিরে যাব। (সূরা বাকারা: ১৫৬)

উক্ত আয়াতে প্রমাণিত হয় যে, আমল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। আরও প্রমাণিত হয় যে, ধৈর্য ধরলে অন্তরের হেদায়াত অর্জিত হয়।

❑ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রয়োজনীয়তা:

প্রতিটি পদক্ষেপে মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন। আল্লাহর নির্দেশের সামনে ধৈর্যের প্রয়োজন। আল্লাহর পথে দাওয়াতের ক্ষেত্রে ধৈর্যের প্রয়োজন। কারণ, এ পথে নামলে নানা ধরণের কষ্ট ও বিপদের মুখোমুখি হতে হবে। 

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

ادْعُ إِلَى سَبِيلِ رَبِّكَ بِالْحِكْمَةِ وَالْمَوْعِظَةِ الْحَسَنَةِ وَجَادِلْهُمْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ إِنَّ رَبَّكَ هُوَ أَعْلَمُ بِمَنْ ضَلَّ عَنْ سَبِيلِهِ وَهُوَ أَعْلَمُ بِالْمُهْتَدِينَ… وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ

“তোমার প্রভুর পথে আহবান কর হেকমত এবং ভাল কথার মাধ্যমে। আর সর্বোত্তম পন্থায় তাদের সাথে বিতর্ক কর। তোমার প্রভু তো সব চেয়ে বেশি জানেন, কে তাঁর পথ থেকে বিপথে গেছে আর তিনিই সব চেয়ে বেশি জানেন কারা সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত রয়েছেন।…আর ধৈর্য ধর। ধৈর্য ধর কেবল আল্লাহর উপর।” (সূরা নাহল: ১২৫-১২৭)

 সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ করতে গেলেও চরম ধৈর্যের পরিচয় দেয়া প্রয়োজন। কারণ, এ পথে মানুষের পক্ষ থেকে নানা ধরণের যাতনার সম্মুখীন হতে হয়। যেমন আল্লাহ তাআলা লোকমান সম্পর্কে বলেন, (তিনি তার সন্তানকে উপদেশ দিতে গিয়ে বলেন):

يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ

“হে বৎস, নামাজ প্রতিষ্ঠা কর, সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ কর। আর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধারণ কর। বিপদে ধৈর্য ধরণ করা তো বিশাল সংকল্পের ব্যাপার।” (সূরা লোকমান: ১৭)

 মুমিনের ধৈর্যের প্রয়োজন জীবনের নানান বিপদ-মুসিবত, কষ্ট ও জটিলতার সামনে। সে বিশ্বাস করে যত সংকটই আসুক না কেন সব আসে আল্লাহর পক্ষ থেকে। ফলে সে তা হালকা ভাবে মেনে নেয়। বিপদে পড়েও খুশি থাকে। এ ক্ষেত্রে ক্ষোভ, হতাশা ও অস্থিরতা প্রকাশ করে না। নিজের ভাষা ও আচরণকে সংযত রাখে। কারণ, সে আল্লাহর প্রতি গভীরভাবে বিশ্বাসী। সে তকদিরকে বিশ্বাস করে। তকদীরকে বিশ্বাস করা ঈমানের ছয়টি রোকনের একটি। 

তকদিরের উপর ঈমান রাখলে তার অনেক সুফল পাওয়া যায়। তন্মধ্যে একটি হল, বিপদে ধৈর্য ধারণ। সুতরাং কোন ব্যক্তি বিপদে সবর না করলে তার অর্থ হল, তার কাছে ঈমানের এই গুরুত্বপূর্ণ খুঁটিটি অনুপস্থিত। অথবা থাকলেও তা খুব নড়বড়ে। ফলে সে বিপদ মুহূর্তে রাগে-ক্ষোভে ধৈর্যহীন হয়ে পড়ে। অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খবর দিয়েছেন যে, এটা এমন এক কুফরি মূলক কাজ যা আকিদার মধ্যে ফাটল সৃষ্টি করে।

❑ বিপদ-আপদের মাধ্যমে বান্দার গুনাহ মোচন হয়:

আল্লাহ তায়ালা তার বান্দাদেরকে বিভিন্ন বালা-মুসিবত দেন এক মহান উদ্দেশ্যে। তা হল এসবের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা বান্দার গুনাহ মোচন করে থাকেন। যেমন: আনাস রা. বর্ণিত হাদিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِهِ الْخَيْرَ عَجَّلَ لَهُ الْعُقُوبَةَ فِي الدُّنْيَا وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِعَبْدِهِ الشَّرَّ أَمْسَكَ عَنْهُ بِذَنْبِهِ حَتَّى يُوَافِيَ بِهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ

“আল্লাহ যখন কোন বান্দার কল্যাণ চান তখন দুনিয়াতেই তাকে শাস্তি দেন। কিন্তু বান্দার অকল্যাণ চাইলে তিনি তার গুনাহের শাস্তি থেকে বিরত রেখে কিয়ামতের দিন তার যথার্থ প্রাপ্য দেন।" (সহিহ তিরমিযি-আলবানি, হা/২৩৯৬)

ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন, "বিপদ-মুসিবত হল নেয়ামত। কারণ এতে গুনাহ মাফ হয়। বিপদে ধৈর্য ধারণ করলে তার প্রতিদান পাওয়া যায়। বিপদে পড়লে আল্লাহর কাছে আরও বেশি রোনাজারি করতে হয়। তার নিকট আরও বেশি ধর্না দিতে হয়। আল্লাহর নিকট নিজের অভাব ও অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরার প্রয়োজন হয়। সৃষ্টি জীব থেকে বিমুখ হয়ে এক আল্লাহর দিকে ফিরে আসতে হয়।…বিপদের মধ্যে এ রকম অনেক বড় বড় কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

বিপদে পড়লে যদি গুনাহ মোচন হয়, পাপরাশী ঝরে যায় তবে এটা তো বিশাল এক নেয়ামত। সাধারণভাবে বালা-মসিবত আল্লাহর রহমত ও নেয়ামত লাভের মাধ্যম। তবে কোন ব্যক্তি যদি এ বিপদের কারণে এর থেকে আগের থেকে আরও বড় গুনাহের কাজে জড়িয়ে পড়ে তবে তা দ্বীনের ক্ষেত্রে তার জন্য বিশাল ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে। কারণ, কিছু মানুষ আছে যারা দরিদ্রতায় পড়লে বা অসুস্থ হলে তাদের মধ্যে মুনাফেকি, ধৈর্য হীনতা, মনোরোগ, স্পষ্ট কুফুরী ইত্যাদি নানান সমস্যা সৃষ্টি হয়। এমনকি অনেকে কিছু ফরয কাজ ছেড়ে দেয়। অনেকে বিভিন্ন হারাম কাজে লিপ্ত হয়। ফলে দ্বীনের ক্ষেত্রে তার বড় ক্ষতি হয়ে যায়। সুতরাং এ রকম ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিপদ না হওয়াই কল্যাণকর। মুসীবতের কারণে নয় বরং মুসীবতে পড়ে তার মধ্যে যে সমস্যা সৃষ্টি তার কারণে বিপদ না আসাই তার জন্য কল্যাণকর।

পক্ষান্তরে বিপদ-মুসীবত যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে ধৈর্য ও আনুগত্য সৃষ্টি করে তবে এই মুসীবত তার জন্য দ্বীনের ক্ষেত্রে বিশাল নেয়ামতে পরিণত হয়….।”

❑ বিপদ-আপদ দিয়ে আল্লাহ তায়ালা বান্দার ধৈর্যের পরীক্ষা নেন:

বিপদ দিয়ে আল্লাহ পরীক্ষা করেন কে ধৈর্যের পরিচয় দেয় এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট থাকে পক্ষান্তরে কে ধৈর্য হীনতার পরিচয় দেয় ও আল্লাহর সিদ্ধান্তে অসন্তোষ প্রকাশ করে। যেমন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

إِنَّ عِظَمَ الْجَزَاءِ مَعَ عِظَمِ الْبَلَاءِ وَإِنَّ اللَّهَ إِذَا أَحَبَّ قَوْمًا ابْتَلَاهُمْ فَمَنْ رَضِيَ فَلَهُ الرِّضَا وَمَنْ سَخِطَ فَلَهُ السَّخَطُ

“বিপদ যত কঠিন হয় পুরস্কারও তত বড় হয়। আল্লাহ কোন জাতিকে ভালবাসলে তাদেরকে পরীক্ষা করেন। সুতরাং যে তাতে সন্তুষ্ট থাকে আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান আর যে তাতে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হয়ে যান।” (সহিহ তিরমিযি-আলবানি, হা/২৩৯৬)

অত্র হাদিসে আমাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় দিক রয়েছে। যেমন:

 ✪ ১. বান্দা যেমন আমল করবে তেমনই প্রতিদান পাবে। “যেমন কর্ম তেমন ফল।”

 ✪ ২. এখানে আল্লাহর একটি গুনের পরিচয় পাওয়া যায়। তা হল ‘সন্তুষ্ট হওয়া’। আল্লাহ তায়ালার অন্যান্য গুনের মতই এটি একটি গুন। অন্য সব গুনের মতই এটিও আল্লাহর জন্য প্রযোজ্য হবে যেমনটি তার জন্য উপযুক্ত হয়।

 ✪ ৩. অত্র হাদিসে জানা গেল যে, আল্লাহ তায়ালা এক বিশাল উদ্দেশ্যে বান্দার উপর বিপদ-মসিবত দিয়ে থাকেন। তা হল তিনি এর মাধ্যমে তার প্রিয়পাত্রদেরকে পরীক্ষা করেন। 

 ✪ ৪. এখানে তকদীরের প্রমাণ পাওয়া যায়।

 ✪ ৫. মানব জীবনে যত বিপদাপদই আসুক না কেন সব আসে আল্লাহর তকদীর তথা পূর্ব নির্ধারিত ফয়সালা অনুযায়ী।

 ✪ ৬. এখান থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে, বিপদ নেমে আসলে ধৈর্যের সাথে তা মোকাবেলা করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি মহুর্তে প্রতিটি বিপদের মুখে আল্লাহর নিকটই ধর্না দিতে হবে এবং তার উপরই ভরসা রেখে পথ চলতে হবে।

❑ ধৈর্যের পরিণতি প্রশংসনীয়:

জীবনের সকল কষ্ট ও বিপদাপদে আল্লাহ তায়ালা নামায ও সবরের মাধ্যমে তাঁর নিকট সাহায্য চাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ, এতেই মানুষের কল্যাণ নিহিত রয়েছে। ধৈর্যের পরিণতি প্রশংসনীয়। আল্লাহ তায়ালা খবর দিয়েছেন যে, তিনি ধৈর্যশীলদের সাথেই থাকেন। অর্থাৎ তাদেরকে তিনি তাদের সাহায্য করেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

“হে ঈমানদারগণ, তোমরা নামায ও সবরের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য অনুসন্ধান কর। নিশ্চয় আল্লাহ সবর কারীদের সাথে থাকেন।” (সূরা বাকারা: ১৫৩)

এখান থেকে ধৈর্য ধারণ করার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করা যায়। মুমিন ব্যক্তির জন্য জীবনের প্রতিটি পদে পদে ধৈর্যের পরিচয় দেয়া দরকার। এই সবরের মাধ্যমে আকীদা ও বিশ্বাস দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হয়।

আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে ধৈর্য ধারণ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬

সবরের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা:

মূল: ড. শাইখ সালিহ ফাউযান আল ফাউযান (হাফিযাহুল্লাহ)

অনুবাদক: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

Wednesday, 30 September 2026

কিয়ামতের দিন পৃথিবী হবে এক রুটি! জান্নাতবাসীদের প্রথম আপ্যায়ন (চমৎকার একটি হাদিস এবং আল্লামা উসাইমিন (রাহ.)-এর ব্যাখ্যা)

 


―――――――――――

প্রখ্যাত সাহাবি আবু সাঈদ আল-খুদরি (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:


«تَكُونُ الأَرْضُ يَوْمَ القِيَامَةِ خُبْزَةً وَاحِدَةً، يَتَكَفَّؤُهَا الجَبَّارُ بِيَدِهِ، كَمَا يَكْفَأُ أَحَدُكُمْ خُبْزَتَهُ فِي السَّفَرِ، نُزُلًا لِأَهْلِ الجَنَّةِ».

فَأَتَى رَجُلٌ مِنَ اليَهُودِ فَقَالَ: بَارَكَ الرَّحْمَنُ عَلَيْكَ يَا أَبَا القَاسِمِ، أَلَا أُخْبِرُكَ بِنُزُلِ أَهْلِ الجَنَّةِ يَوْمَ القِيَامَةِ؟ قَالَ: «بَلَى». قَالَ: تَكُونُ الأَرْضُ خُبْزَةً وَاحِدَةً، كَمَا قَالَ النَّبِيُّ ﷺ. فَنَظَرَ النَّبِيُّ ﷺ إِلَيْنَا ثُمَّ ضَحِكَ حَتَّى بَدَتْ نَوَاجِذُهُ، ثُمَّ قَالَ: أَلَا أُخْبِرُكَ بِإِدَامِهِمْ؟ قَالَ: إِدَامُهُمْ بَالَامٌ وَنُونٌ. قَالُوا: وَمَا هَذَا؟ قَالَ: ثَوْرٌ وَنُونٌ، يَأْكُلُ مِنْ زَائِدَةِ كَبِدِهِمَا سَبْعُونَ أَلْفًا.


“কিয়ামতের দিন সমস্ত পৃথিবী একটিমাত্র রুটি হয়ে যাবে। মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তাআলা নিজ হাতে তা এমনভাবে উল্টেপাল্টে সমতল করবেন, যেমন তোমাদের কেউ সফরকালে তার খামিরের রুটিকে উল্টেপাল্টে তৈরি করে থাকে। এটি হবে জান্নাতবাসীদের প্রথম মেহমানদারির খাবার।'


এমন সময় এক ইহুদি এসে বলল, 'হে আবুল কাসিম! রাহমান (অতি দয়াময় আল্লাহ) আপনার ওপর বরকত বর্ষণ করুন। আমি কি আপনাকে কিয়ামতের দিন জান্নাতবাসীদের আপ্যায়নের বিষয়ে জানাব না?'


তিনি বললেন: 'হ্যাঁ, বলো।'

প্রশ্ন: জিনেরা কি মানুষের অর্থ-সম্পদ চুরি করে? এ থেকে বাঁচার উপায় কি?



উত্তর:

জিন হল, এক অদৃশ্য জগতের নাম। যাদের সম্পর্কে আমাদের সব কিছু বিস্তারিত জানা সম্ভব নয় আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ওহির মারফতে আমাদেরকে তাদের সম্পর্কে যতটুকু তথ্য প্রদান করেছেন তা ব্যতিরেকে।


যাহোক, জিন কর্তৃক মানুষের অর্থ-সম্পদ চুরি করা প্রসঙ্গে আলেমগণ বলেন যে, তারা মানুষের অর্থ-সম্পদ চুরি করতে পারে। কারণ তাদের মধ্যে ভালো-মন্দ দু ধরণের জিন আছে। সুতরাং তাদের মধ্যে খারাপ জিন (শয়তান) গুলো মানুষের ক্ষয়ক্ষতি করার সর্বপ্রকার পন্থা অবলম্বন করে থাকে। জিন সম্পর্কে কুরআনে এসেছে,

وَأَنَّا مِنَّا الصَّالِحُونَ وَمِنَّا دُونَ ذَٰلِكَ ۖ كُنَّا طَرَائِقَ قِدَدًا ‎

“(জিনরা বলে) আমাদের কেউ কেউ সৎকর্ম পরায়ণ এবং কেউ কেউ এরূপ নয়। আমরা ছিলাম বিভিন্ন পথে বিভক্ত।" [সূরা জিন: ১১] অর্থাৎ তারা সৎকর্মশীল এবং পাপাচারী এ দুটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত।


❑ জিনেরা কেন মানুষের সম্পদ চুরি করে?

প্রশ্ন: মাদ্রাসা শিক্ষা দ্বারা মানুষের কী উপকার হয়েছে?



উত্তর: মাদ্রাসা শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য, ইসলামের খেদমত এবং দ্বীনের প্রচার ও প্রসার করা। অর্থাৎ কুরআন, হাদিস, তাফসির, ফিকহ আরবি ভাষা সাহিত্য, আরবি ব্যাকরণ‌ ইত্যাদি সম্পর্কে গভীর বুৎপত্তি অর্জন এবং ইসলামের আলোকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নানা সমস্যার সমাধান। 

কারো কাছে যদি এই বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ মনে না হয় তাহলে তার কাছে মাদ্রাসা কোন উপকার করেনি সেটাই মনে হবে।

কিন্তু একই প্রশ্ন যদি উল্টা করে করা হয় তখন উত্তর কী হবে?

সরকারের তেমন সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই মাদ্রাসা ছাত্ররা কী উপকার করল এটা নিয়ে প্রশ্ন করা যায়। কিন্তু বিশাল অংকের বাজেট খরচ করার পরেও দেশের কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেশের কতটুকু উপকার করেছে সে জবাবদিহি কে করবে? 

একটা সুই পর্যন্ত যারা আবিষ্কার করতে পারেনি, বিদেশ থেকে আমদানি করা ছাড়া চলে না তাদের মুখে মাদ্রাসা শিক্ষার উপকারিতার ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হাস্যকর। 

দেশের সম্পদ বিদেশে পাচার করা, সরকারি খাতে বিশাল বিশাল দুর্নীতি, প্রশাসনিক পদে থেকে মানুষের উপরে জুলুম নির্যাতন করার কালো অধ্যায়গুলো মাদ্রাসা ছাত্ররা করেনি। বারবার প্রশ্ন ফাঁসের কেলেঙ্কারিতে মাদ্রাসা ছাত্ররা জড়িত নয়। দেশের প্রতিটি সেক্টরে চরম পর্যায়ের ঘুষ বাণিজ্য ইত্যাদিতে মাদ্রাসার ছাত্ররা জড়িত নয়।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রতিনিয়ত রক্তপাত ও হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়া যায়। সারা দেশের মাদ্রাসাগুলোতে এর পরিমাণ ‌ এক পারসেন্টও হবে না।

এগুলো করছে দেশের তথাকথিত উচ্চশিক্ষিত সাধারণ শিক্ষিত লোকজন। 

আশা করি এবার দেশের পুরা শিক্ষা ব্যবস্থার উপরে প্রশ্ন তুলবেন।

তবে আমি বলি না যে মাদ্রাসার শিক্ষার সংস্কারের প্রয়োজন নাই। বরং দেশের পুরো সিস্টেমটাই সংস্কার করা প্রয়োজন।

উত্তর প্রদানে:

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি 

দাঈ,জুবাইল দাওয়াহ অ্যাসোসিয়েশন, সৌদি আরব। 

Sunday, 27 September 2026

পুরুষ শিক্ষক কর্তৃক মেয়েদের (অনলাইনে কিংবা অফলাইনে) পাঠদান করার বিধান

 



- সৌদি আরবের দাওয়াহ, গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি

প্রশ্ন: সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটির ফতওয়ায় বলা হয়েছে: “কোনো পুরুষের জন্য মেয়েদেরকে সরাসরি (সামনাসামনি) পাঠদান করা বৈধ নয়। কারণ এতে রয়েছে বিশাল বিপদ ও ভয়াবহ পরিণতি।” [ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ, ১২/১৮২]

এই লেখাটা বা এমন কিছু লেখা কিছু বোন অনলাইনে প্রচার করছে। এই কথার প্রকৃত অর্থ কী?

মেয়েরা কি কোনো পুরুষ আলেমের কাছে ইলম নিতে পারবে যদি পর্দার ব্যবস্থা থাকে বা ফেতনার আশঙ্কা না করে? দয়া করে এর সঠিক ব্যাখ্যা দিয়ে দিয়ে সবাইকে উপকৃত করবেন।

উত্তর: 

সৌদি আরবের সৌদি আরবের দাওয়াহ, গবেষণা ও ফতোয়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি (আল-লাজনাতুদ দাইমাহ)-এর উপরোক্ত ফতওয়াটির মর্মার্থ পূর্ণাঙ্গভাবে বুঝা যায় তাদের বিস্তারিত ফতওয়ায়। 

তাই এই সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ ফতওয়াটি প্রদান করা হলো: 

ফাতাওয়া লাজনাহ দায়েমাহ-তে এসেছে:

স্বামী বা স্ত্রীর মৃত্যুর পর একে অপরকে দেখা, স্পর্শ, গোসল, কাফন ইত্যাদির বিধান: দূর হোক সমাজের বিভ্রান্তি



প্রশ্ন: মৃত্যুর পর কি স্ত্রী তার স্বামীর জন্য হারাম হয়ে যান? মৃত্যুর পর একে অপরকে দেখা, স্পর্শ করা, গোসল দেওয়া, কাফন পরানো ইত্যাদির বিধান কী?

উত্তর:

আমাদের সমাজে এটি একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা যে, স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর তারা একে অপরের জন্য হারাম হয়ে যান। এর ফলে অনেককেই দেখা যায় যে, মৃত স্বামীকে গোসল করানো বা কবরে নামানোর মতো চূড়ান্ত কাজে স্বামী বা স্ত্রীকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। 

মূলত এটি আবু হানিফা, সুফিয়ান সাওরি প্রমুখ সহ রায় পন্থীদের অভিমত। তাদের যুক্তি হল, স্বামী স্ত্রীকে এ কারণে গোসল দিতে পারবে না যে, মৃত্যুর মাধ্যমে দাম্পত্য জীবনের সমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ তারা এখন আর স্বামী-স্ত্রী নয়। কারণ স্বামী এখন চাইলে তার মৃত স্ত্রীর বোনকে বিয়ে করতে পারবে এবং আরও চার জন নারীকে বিয়ে করার অধিকার লাভ করবে।

কিন্তু যুক্তি চেয়ে দলিল অগ্রগামী। বহু সংখ্যক দলিলের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পবিত্র সম্পর্ক মৃত্যুর কারণে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয় না বরং মৃত্যুর পরও স্বামী-স্ত্রীর পরস্পরকে দেখা, স্পর্শ করা, গোসল করানোর বা কাফন পরানো ইত্যাদির বৈধতা বিদ্যমান থাকে।

 বরং স্বামী বা স্ত্রী মারা যাওয়ার পর একে অপরকে গোসল দেওয়ার জন্য অন্য সকলের চেয়ে বেশি হকদার। কারণ মৃত্যুর পরও স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য অন্যের চেয়ে বেশি আপন থাকেন। তাই তাঁদের মধ্যে পর্দার জটিলতা থাকে না এবং গভীর ভালোবাসার কারণে তাঁরা মৃত সঙ্গীর যত্নও সবচেয়ে ভালোভাবে নিতে পারেন।

তবে এই বৈধতা ইদ্দত (অপেক্ষা কাল)-এর সাথে শর্তযুক্ত।

Saturday, 26 September 2026

সালাতে সাহু সিজদা করার সঠিক পদ্ধতি

 


প্রশ্নঃ সাহু সিজদা করার কারণ সমূহ কি কি?

উত্তরঃ

 সাহু সিজদা সংবিধিবদ্ধ করার পিছনে রহস্য হল এই যে, এটা নামাযের মধ্যে যে ত্রুটি হয় তার পূর্ণতা দান করে।

তিনটি কারণে নামাযে সাহু সিজদা দিতে হয়ঃ

১) নামায বৃদ্ধি হওয়া। যেমন, কোন রুকূ বা সিজদা বা বসা ইত্যাদি বৃদ্ধি হওয়া।

২) হ্রাস হওয়া। কোন রুকন বা ওয়াজিব কম হওয়া।

৩) সন্দেহ হওয়া। কত রাকাত পড়েছে তিন না চার এ ব্যাপারে সংশয় হওয়া।

🔘 প্রথমতঃ ছালাতে বৃদ্ধি হওয়া:

মুছল্লী যদি নামাযের অন্তর্ভূক্ত এমন কিছু কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে বৃদ্ধি করে যেমনঃ দাঁড়ানো, বসা, রুকূ‘, সিজদা ইত্যাদি- যেমন দু‘বার করে রুকূ করা, তিন বার সিজদা করা, অথবা যোহর পাঁচ রাকাত আদায় করা। তবে তার ছালাত বাতিল বা ভঙ্গ হয়ে যাবে। কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশের বিপরীত আমল করেছে।

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন,

مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ

“যে ব্যক্তি এমন আমল করবে, যার পক্ষে আমাদের নির্দেশনা নেই, তবে উহা প্রত্যাখ্যাত।” (মুসলিম, অধ্যায়ঃ আকযিয়া, অনুচ্ছেদ, বাতিল ফায়সালা সমূহ প্রত্যাখ্যান করা।)

কিন্তু যদি ভুলবশতঃ তা করে এবং ঐভাবেই ছালাত শেষ করে দেয়ার পর স্মরণ হয় যে, ছালাতে বৃদ্ধি হয়ে গেছে, তবে শুধুমাত্র সাহু সিজদা করবে। তার ছালাতও বিশুদ্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু ছালাতরত অবস্থায় যদি উক্ত বৃদ্ধি স্মরণ হয়- যেমন চার রাকাআত শেষ করে পাঁচ রাকাআতের জন্য দাঁড়িয়ে গেছে- তবে সে ফিরে আসবে এবং শেষে সিজদায়ে সাহু করবে।

উদাহরণ: জনৈক ব্যক্তি যোহরের ছালাত পাঁচ রাকাআত আদায় করে নিয়েছে। কিন্তু শেষ তাশাহুদে বসার সময় এবৃদ্ধির কথা তার স্মরণ হল, তাহলে সে তাশাহুদ পূর্ণ করবে এবং সালাম ফেরাবে। তারপর সাহু সিজদা করবে এবং সালাম ফিরাবে। আর যদি সালাম ফেরানোর পর তা স্মরণ হয়, তবে সাহু সিজদা করবে এবং সালাম ফিরাবে।

আর যদি পঞ্চম রাকাআত চলা অবস্থায় স্মরণ হয় তবে তখনই বসে পড়বে এবং তাশাহুদ পড়ে সালাম ফেরাবে। তারপর সিজদায়ে সাহু করে আবার সালাম ফেরাবে।

দলীল:

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ قَالَ صَلَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الظُّهْرَ خَمْسًا فَقَالُوا أَزِيدَ فِي الصَّلَاةِ؟ قَالَ: وَمَا ذَاكَ؟ قَالُوا: صَلَّيْتَ خَمْسًا، فسجد سجدتين بعد ما سلم. وفي رواية: فَثَنَى رِجْلَيْهِ وَسَجَدَ سَجْدَتَيْنِ ثم سلم

আবদুল্লাহ্‌ বিন মাসঊদ (রা:) কর্তৃক বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যোহরের নামায পাঁচ রাক্‌আত পড়লেন। তাঁকে প্রশ্ন করা হল, নামায কি বৃদ্ধি করা হয়েছে? তিনি বললেন, কিভাবে? তাঁরা বললেন, আপনি আজ পাঁচ রাকাআত পড়েছেন। তখন তিনি দু‘টি সিজদা করলেন। অন্য রেওয়ায়াতে এসেছে, তখন তিনি পা গুটিয়ে ক্বিবলামুখি হলেন, দু‘টি সিজদা করলেন অত:পর সালাম ফেরালেন। (বুখারী, অধ্যায়ঃ ছালাত, অনুচ্ছেদঃ ক্বিবলার বিবরণ। মুসলিম, অধ্যায়ঃ মসজিদ ও নামাযের স্থান, অনুচ্ছেদঃ নামাযে সাহু বা ভুল করা।)

ছালাত পূর্ণ হওয়ার আগেই সালাম ফেরানো:

নামায পূর্ণ হওয়ার আগেই সালাম ফেরানো ছালাতে বৃদ্ধি করার অন-র্গত। কেননা ছালাতরত অবস্থায় সে সালামকে বৃদ্ধি করেছে। একাজ যদি ইচ্ছাকৃত করে তবে ছালাত বাতিল হয়ে যাবে। আর যদি ভুলক্রমে হয়, কিন্তু অনেক পরে তার এ ভুলের কথা মনে পড়ল তবে নামায পুনরায় ফিরিয়ে পড়বে। আর যদি একটু পরেই (যেমন দু/এক মিনিট) তবে সে অবশিষ্ট ছালাত পূর্ণ করবে এবং সালাম ফিরাবে। অতঃপর সাহু সিজদা করে সালাম ফিরাবে।

Friday, 25 September 2026

ফেরেশতা ও জিনের মধ্যে পার্থক্য কি? ইবলিস শয়তান কি ফেরেশতা ছিল?

 


▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬

প্রশ্ন: জিন এবং ফেরেশতার মধ্যে পার্থক্য কি? কেউ কেউ বলে থাকে যে, ইবলিস শয়তান জিন ছিল; ফেরেশতা নয়। এটা কতটুকু সত্য?

উত্তর: 

ফেরেশতা ও জিনের মাঝে অনেক দিক দিয়ে পার্থক্য আছে। সেগুলোর মধ্যে মৌলিক চারটি পার্থক্য উপস্থাপন করা হল:

1⃣  ১ম পার্থক্য: ফেরেশতাগণ সৃষ্টি হয়েছে নূর বা আলো থেকে আর জিন সৃষ্টির হয়েছে আগুন থেকে।

আয়েশা রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, 

 «خُلِقَتِ المَلاَئِكَةُ مِنْ نُورٍ، وَخُلِقَ الجَانُّ مِنْ مَارِجٍ مِنْ نَارٍ، وَخُلِقَ آدَمُ مِمَّا وُصِفَ لَكُمْ» 

"ফিরিশতাদেরকে জ্যোতি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। জিন জাতিকে সৃষ্টি করা হয়েছে অগ্নিশিখা হতে। আর আদমকে সৃষ্টি করা হয়েছে সেই বস্তু থেকে, যা তোমাদেরকে বর্ণনা করা হয়েছে। [অর্থাৎ মাটি থেকে]।" মুসলিম)

ইবলিস শয়তান ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত। সে নিজের সৃষ্টি সম্পর্কে বলেছে,

قَالَ أَنَا خَيْرٌ مِّنْهُ ۖ خَلَقْتَنِي مِن نَّارٍ وَخَلَقْتَهُ مِن طِينٍ

“সে (ইবলিস) বলল: আমি তার চেয়ে উত্তম আপনি আমাকে আগুনের দ্বারা সৃষ্টি করেছেন, আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটির দ্বারা।” (সূরা সোয়াদ: ৭৬)

2⃣  ২য়: ফেরেশতাগণ কখনো আল্লাহর আনুগত্য করেন। তারা কখনও তাঁর অবাধ্যতা করেন না। আল্লাহ তাআলা তাদের সম্পর্কে বলেছেন:

 لَّا يَعْصُونَ اللَّـهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ 

“তারা আল্লাহ তা’আলা যা আদেশ করেন, তা অমান্য করে না এবং যা করতে আদেশ করা হয়, তাই করে।” (সূরা আত তাহরীম: ৬)

 পক্ষান্তরে জিন জাতির মধ্যে কিছু আছে ঈমানদার আর কিছু আছে কাফের। কিছু আছে নেককার এবং কিছু আছে পাপিষ্ঠ -যেমন রয়েছে মানুষের মধ্যে।

জিনদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন: (জিনরা বলেছিল)

وَأَنَّا مِنَّا الْمُسْلِمُونَ وَمِنَّا الْقَاسِطُونَ ۖ فَمَنْ أَسْلَمَ فَأُولَـٰئِكَ تَحَرَّوْا رَشَدًا - وَأَمَّا الْقَاسِطُونَ فَكَانُوا لِجَهَنَّمَ حَطَبًا 

“আমাদের কিছুসংখ্যক আজ্ঞাবহ এবং কিছুসংখ্যক অন্যায়কারী। যারা আজ্ঞাবহ হয়, তারা সৎপথ বেছে নিয়েছে। আর যারা অন্যায়কারী, তারা তো জাহান্নামের ইন্ধন।” সূরা জিন: ১৪ ও ১৫)

ফেরেশতাগণ মানুষকে সর্বদা ভালো কাজের আদেশ করেন; কখনও খারাপ কাজের আদেশ করেন না। পক্ষান্তরে ভালো ও সৎ জিনরা মানুষকে ভালো কাজের আর খারাপ জিনরা পাপাচার ও অন্যায়-অপকর্মের নির্দেশ দেয়।

3⃣  ৩য়: ফেরেশতাদের মধ্যে জৈবিক চাহিদা নাই। পক্ষান্তরে জিনদের মাঝে জৈবিক চাহিদা আছে।

4⃣  ৪র্থ: ফেরেশতা ও জিন উভয়েই বিভিন্ন আকার-আকৃতি ধারণ করতে সক্ষম কিন্তু ফেরেশতারা কখনও খারাপ ও ভয়ঙ্কর জিনিসের রূপ ধারণ করেন না বরং তারা কখনও কখনও সুন্দর ও ভালো জিনিসের আকার ধারণ করে মানুষের সামনে হাজির হয়। যেমন, বিখ্যাত হাদিসে জিবরাঈল। জিবরাঈল ফেরেশতা একজন সুদর্শন যুবকের আকৃতিতে দ্বীন ইসলাম শিখানোর জন্য সাহাবীদের সামনে উপস্থিত হয়ে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে কতিপয় প্রশ্নের মাধ্যমে তাদেরকে দ্বীন শিখিয়েছেন।

 পক্ষান্তরে জিনরা ভালো-মন্দ উভয় জিনিসের আকার ধারণ করে। খারাপ জিনগুলো কখনও কখনো ভয়ঙ্কর ও নোংরা জিনিসের আকার ধারণ করে মানুষকে ভয় দেখায়।

♻ ইবলিস শয়তান কি জিন ছিল না কি ফেরেশতা ছিল?

এর উত্তরে আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণীটি যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَإِذْ قُلْنَا لِلْمَلَائِكَةِ اسْجُدُوا لِآدَمَ فَسَجَدُوا إِلَّا إِبْلِيسَ كَانَ مِنَ الْجِنِّ فَفَسَقَ عَنْ أَمْرِ رَبِّهِ

“যখন আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম: আদমকে সেজদা কর, তখন সবাই সেজদা করল ইবলিস ব্যতীত। সে ছিল জিনদের একজন। সে তার পালনকর্তার আদেশ অমান্য করল।” (সূরা কাহফ: ৫০)

 আল্লাহু আলাম

▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬

উত্তর প্রদানে: 

আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ এন্ড গাইডেন্স সেন্টার, সউদী আরব।

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...