‘আল্লামাহ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরাইশী (রাহিমাহুল্লাহ)
·
শাইখ পরিচিতি:

শাইখ পরিচিতি:
‘আল্লামাহ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরাইশী (রাহিমাহুল্লাহ) সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) একজন প্রখ্যাত সালাফী দা‘ঈ ও বিদ্বান ছিলেন। তাঁর জন্ম পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার টুবগ্রামে ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে। তিনি পিতার নিকট ফারসি ও আরবির প্রারম্ভিক শিক্ষালাভ করেন। তারপর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা আব্দুল্লাহেল বাকীর কাছে পারিবারিক মাদরাসায় আরবি ও ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়নের পর তিনি কলকাতা আলিয়া মাদরাসায় অ্যাংলো-পারসিয়ান বিভাগ হতে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। সেন্ট জেভিয়ারস কলেজে বি.এ. ক্লাসে অধ্যয়নকালে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাবে উপমহাদেশ শোষণকারী সাম্রাজ্যবাদী ধবল দস্যুদের প্রবর্তিত শিক্ষা বর্জন করে তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯২১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি মাওলানা আকরাম খাঁর উর্দু দৈনিক ‘যামানা’র সম্পাদনা বিভাগে যোগদান করেন এবং খণ্ডকালীন সম্পাদকেরও দায়িত্ব পালন করেন।
১৯২২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি “জাম‘ইয়াতু ‘উলামা-ই বাঙ্গালা” প্রতিষ্ঠানের সহ-সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯২৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি নিজ সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘সত্যাগ্রহী’ প্রকাশ করেন। ১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে হোসেন সোহরাওয়ার্দীর সহকারীরূপে তিনি ইনডিপেন্ডেন্ট মুসলিম পার্টির সংগঠন কার্যে আত্মনিয়োগ করেন। একই সাথে তিনি সারা বাংলায় জালসা ও ধর্মসভাগুলোতে জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতার মাধ্যমে ক্বুরআন-সুন্নাহ’র বাণী প্রচার এবং শির্ক ও বিদ‘আতের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যান।
১৯৪৬ সালে রংপুরের হারাগাছ বন্দরে তিনি নিখিল বঙ্গ ও আসাম-আহলে হাদীস কনফারেন্সে গঠিত “নিখিল বঙ্গ ও আসাম জমঈয়তে আহলে হাদীস” এর সভাপতি নির্বাচিত হন। জমঈয়তের দফতর স্থাপিত হয় কলকাতার মিসরীগঞ্জে। ১৯৪৮ সালে দফতর পাবনা শহরে স্থানান্তরিত হলে সংগঠনের নাম হয় “পূর্ব পাকিস্তান জমঈয়তে আহলে হাদীস”। তাঁরই প্রচেষ্টায় ১৯৪৯ সালে “আল হাদীস প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিশিং হাউজ” নামে জমঈয়তের নিজস্ব একটি মুদ্রণালয় ও প্রকাশনী প্রতিষ্ঠান স্থাপিত হয় এবং একই সালে জমঈয়তের মুখপাত্ররূপে তাঁর সুুযোগ্য সম্পাদনায় মাসিক ‘তর্জুমানুল হাদীস’ আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৫৬ সালের শেষের দিকে জমঈয়তের দফতর ঢাকায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৫৭ সালের ৭ই অক্টোবর তাঁর সম্পাদনায় সাপ্তাহিক ‘আরাফাত’ আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৫৮ সালে তাঁরই উদ্যোগে ঢাকাস্থ নাজিরাবাজারে ‘মাদরাসাতুল হাদীস’ প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলামী বিষয়ে বিভিন্ন ভাষায় তাঁর রচিত (প্রকাশিত-অপ্রকাশিত) অর্ধ শতাধিক গ্রন্থ রয়েছে। তাঁর জীবনব্যাপী ইসলামী সাহিত্য সাধনা ও গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬০ সালে বাংলা একাডেমি তাঁকে সাহিত্য পুরস্কার প্রদান করে। তিনি ১৯৬০ সালের ৪ঠা জুন পরলোকগমন করেন। আল্লাহ এই নির্ভীক সিপাহসালারকে উত্তম প্রতিদান দান করুন এবং তাঁকে সর্বোচ্চ জান্নাতে দাখিল করুন। আমীন। সংগৃহীত: ‘আল্লামাহ মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরাইশী (রাহিমাহুল্লাহ), ফিরকাবন্দী বনাম অনুসরণীয় ইমামগণের নীতি; পৃষ্ঠা: ৬; তৃতীয় সংস্করণ (জুন, ২০০৬ খ্রি.)।
·
‘আল্লামাহ কুরাইশীর বক্তব্য:
‘আল্লামাহ কুরাইশীর বক্তব্য:
বাংলাদেশে আহলেহাদীস আন্দোলনের অগ্রবর্তী সেনানায়ক প্রথিতযশা সাহিত্যিক সাবেক পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) জমঈয়তে আহলে হাদীসের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আশ-শাইখ আল-‘আল্লামাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরায়শী (রাহিমাহুল্লাহ) [মৃত: ১৯৬০ খ্রি.] প্রণীত একটি ঐতিহাসিক পুস্তিকার নাম—‘একটি পত্রের জওয়াব’। এই পুস্তিকায় ‘আল্লামাহ কুরাইশী পাক-ভারত উপমহাদেশে মুসলিম ব্রাদারহুডেরই নব্যরূপ জামায়াতে ইসলামীর মতাদর্শ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।
১৯৫৭ সালে গাইবান্ধার জনৈক আহলেহাদীস মৌলবি সাহেব ‘আল্লামাহ কুরায়শীকে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদানের উপদেশ খয়রাত করে একটি পত্র লিখেছিলেন। যার জবাবস্বরূপ ‘আল্লামাহ কুরায়শী তাঁর সম্পাদিত মাসিক তর্জুমানুল হাদীসে দুটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন।
তর্জুমানের ৭ম বর্ষ ৩য় সংখ্যার (ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৭) ১৪৩-১৪৮ পৃষ্ঠায় এবং ৬ষ্ঠ বর্ষ ১ম সংখ্যার (শ্রাবণ, ১৩৬২) ৪১-৪৫ পৃষ্ঠায় প্রবন্ধ দুটি প্রকাশিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ‘যুবসংঘ প্রকাশনী’ (রাণীবাজার, রাজশাহী) ১৯৯৩ সালের মার্চে প্রবন্ধ দুটি পুস্তক আকারে প্রকাশ করে। আমি ‘যুবসংঘ প্রকাশনী’ কর্তৃক প্রকাশিত পুস্তিকাটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু অংশ অবিকৃতরূপে হুবহু পেশ করার প্রয়াস পাব, ইনশাআল্লাহ।
আশ-শাইখ আল-‘আল্লামাহ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহেল কাফী আল-কুরায়শী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন—
১. পত্রলেখক বলিতে চাহিয়াছেন, এইরূপ অন্ধকার পরিবেশে তিনি অকস্মাৎ আলোকের সন্ধান পাইলেন। পাক পাঞ্জাবের সামরিক আদালত মওলানা মওদুদীকে ফাঁসীর হুকুম দেওয়ায় দেশব্যাপী যে আন্দোলন সৃষ্টি হইয়াছিল এবং পূর্ব পাকিস্তান জমঈয়তে আহলেহাদীছের মুখপাত্র “তর্জুমানের পৃষ্ঠায় সম্পাদকের জোরাল মুক্তি দাবী” দর্শন করিয়া এবং তর্জুমান সম্পাদকের কাঁদ কাঁদ সুরে “মওদুদীকে বর্তমান যুগের মুজাদদিদ বলা চলে” শ্রবণ করিয়া এবং পাঞ্জাবের কারাগারে অন্যান্য বর্ষীয়ান উলামার লাঞ্ছনার বিবরণ অবগত হইয়া তিনি মওদুদী ছাহেবের আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হইয়া পড়িলেন।
আমার বক্তব্য এই যে, কোন ব্যক্তি ফাঁসীর আসামী হইলে এবং তজ্জন্য দেশে তোলপাড় ঘটিলেই তাঁহার প্রবর্তিত দলে প্রবেশ করিতে হইবে এবং নিজের জামাআতকে পরিত্যাগ করিতে হইবে এরূপ কথা আলেম দূরে থাক, সাধারণ বুদ্ধি বিবেচনা সম্পন্ন লোকও উচ্চারণ করিতে পারে না। (পৃ. ৭-৮)
আমার বক্তব্য এই যে, কোন ব্যক্তি ফাঁসীর আসামী হইলে এবং তজ্জন্য দেশে তোলপাড় ঘটিলেই তাঁহার প্রবর্তিত দলে প্রবেশ করিতে হইবে এবং নিজের জামাআতকে পরিত্যাগ করিতে হইবে এরূপ কথা আলেম দূরে থাক, সাধারণ বুদ্ধি বিবেচনা সম্পন্ন লোকও উচ্চারণ করিতে পারে না। (পৃ. ৭-৮)
২. মওলানা মওদুদীকে আমি মুজাদদিদ বলিয়াছি এরূপ কথা আমি স্মরণ করিতে অসমর্থ। আর কেহ মুজাদদিদ হইতে পারে; এরূপ সম্ভাবনা এমনকি নিশ্চয়তা প্রদান করিলেই যে তাঁহাকে ইমামতের একচ্ছত্র সিংহাসন প্রদান করিতে হইবে, ইহাও মূর্খতাব্যঞ্জক উক্তি। (পৃ. ৮)








