প্রশ্ন: যাদের বাড়ি মসজিদের নিকটবর্তী তারা কি বেশি নেকি লাভের আশায় (জুমার দিন অথবা অন্য যেকোনো দিন) রাস্তা পরিবর্তন করে দূর দিয়ে ঘুরে মসজিদে যেতে পারবেন কিনা?
উত্তর:
ইসলাম ইবাদত ও দৈনন্দিন জীবন যাপনের সর্বক্ষেত্রে সহজ ও স্বাভাবিক পন্থা অবলম্বন করতে উৎসাহিত করে। কৃত্রিম উপায়ে নিজেকে কষ্টে ফেলা কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে কঠিন পথ বেছে নেওয়াকে ইসলাম পছন্দ করে না। তাই অযথা নিজের ওপর বাড়তি কষ্ট চাপিয়ে দেওয়া অনুচিত।
এই কারণে অধিক সওয়াবের আশায় নিকটস্থ মসজিদ এড়িয়ে দূরের মসজিদে যাওয়া কিংবা অনর্থক দীর্ঘ পথ ঘুরে মসজিদে যাওয়া সমীচীন নয়।
আল্লাহর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,
«يَسِّرُوا وَلَا تُعَسِّرُوا، وَبَشِّرُوا وَلَا تُنَفِّرُوا»
"তোমরা সহজ করো, কঠিন করো না; সুসংবাদ দাও, বিতৃষ্ণা ছড়িও না।" [সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম]
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালেহ আল উসাইমিন (রহ.) বলেন:
فَاخْتَرِ الْأَيْسَرَ لَكَ فِي كُلِّ أَحْوَالِكَ: فِي الْعِبَادَاتِ، وَفِي الْمُعَامَلَاتِ مَعَ النَّاسِ، وَفِي كُلِّ شَيْءٍ؛ لِأَنَّ الْيُسْرَ هُوَ الَّذِي يُرِيدُهُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ مِنَّا وَيُرِيدُهُ بِنَا: ﴿يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ﴾. فَمَثَلًا إِذَا كَانَ لَكَ طَرِيقَانِ إِلَى الْمَسْجِدِ، أَحَدُهُمَا صَعْبٌ فِيهِ حَصًى وَأَحْجَارٌ وَأَشْوَاكٌ، وَالثَّانِي سَهْلٌ، فَالْأَفْضَلُ أَنْ تَسْلُكَ الْأَسْهَلَ. وَإِذَا كَانَ هُنَاكَ مَاءَانِ وَأَنْتَ فِي الشِّتَاءِ، وَكَانَ أَحَدُهُمَا بَارِدًا يُؤْلِمُكَ، وَالثَّانِي سَاخِنًا تَرْتَاحُ لَهُ، فَالْأَفْضَلُ أَنْ تَسْتَعْمِلَ السَّاخِنَ؛ لِأَنَّهُ أَيْسَرُ وَأَسْهَلُ.
"সব অবস্থায় তোমার জন্য যা সবচেয়ে সহজ তা-ই বেছে নাও—চাই তা ইবাদতে হোক, মানুষের সাথে লেনদেনে হোক, কিংবা যেকোনো বিষয়ে। কারণ সহজতাই আল্লাহ আমাদের কাছ থেকে চান এবং আমাদের জন্য চান: 'আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ চান, কঠিন চান না।' যেমন:
মসজিদে যাওয়ার দুটি পথ আছে; একটি কঠিন, কাঁকর, পাথর ও কাঁটায় ভরা, অন্যটি সহজ। তাহলে উত্তম হলো সহজ পথটি বেছে নেওয়া। আবার শীতকালে যদি দুই ধরনের পানি থাকে, একটি এত ঠাণ্ডা যে কষ্ট দেয়, অন্যটি গরম যা আরাম দেয়, তাহলে গরম পানি ব্যবহার করাই উত্তম, কারণ তা অধিক সহজ।" [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
❑ মসজিদের দিকে বেশি পদক্ষেপ ফেলা সংক্রান্ত হাদিসের ব্যাখ্যা:
হাদিসে এসেছে, আল্লাহর নবি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) সাহাবিদের উদ্দেশ্যে বললেন:
«أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللهُ بِهِ الْخَطَايَا، وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟ قَالُوا: بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ. قَالَ: إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ»
"আমি কি তোমাদের এমন আমলের কথা বলব না, যার মাধ্যমে আল্লাহ গুনাহ মিটিয়ে দেন এবং মর্যাদা বাড়িয়ে দেন?"
সাহাবিগণ বললেন, "অবশ্যই, হে আল্লাহর রসুল!"
তিনি বললেন: "কষ্টের সময়ও পূর্ণাঙ্গভাবে অজু করা, মসজিদের দিকে বেশি পদক্ষেপ ফেলা এবং এক নামাজের পর অন্য নামাজের অপেক্ষা করা। এটিই হলো রিবাত (আল্লাহর পথে সীমান্ত প্রহরা)।" [সহীহ মুসলিম]
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় শাইখ উসাইমিন (রাহ.) বলেন, "কিন্তু সহজ পথ সম্ভব থাকা সত্ত্বেও কেউ যদি কঠিনটির দিকে যায়, তবে তা উত্তমের খেলাফ। উত্তম হলো সব বিষয়ে সহজটি অনুসরণ করা... মোটকথা, যা-ই অধিক সহজ, তা-ই উত্তম, যতক্ষণ তা গুনাহ না হয়। কারণ উম্মুল মুমিনিন আয়েশা (রা.) (রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সম্পর্কে বলেন:
«مَا خُيِّرَ بَيْنَ شَيْئَيْنِ إِلَّا اخْتَارَ أَيْسَرَهُمَا مَا لَمْ يَكُنْ إِثْمًا»
'দুটি বিষয়ের মধ্যে এখতিয়ার দেওয়া হলে তিনি সহজটিই বেছে নিতেন, যতক্ষণ তা গুনাহ না হতো।' তবে যদি কোনও ইবাদত কষ্ট ছাড়া আদায় করা সম্ভব না হয় এবং সেই কষ্ট ইবাদতকে রহিত করে না আর তুমি কষ্ট সহ্য করে তা আদায় করো তাহলে এতে তোমার সওয়াব বৃদ্ধি পায়।" [ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব]
অতএব ইবাদতে বেশি সওয়াব বা নামাজের দিকে বেশি পদক্ষেপের যে ফজিলত এসেছে, তার উদ্দেশ্য এটি নয় যে, সহজ পথ থাকা সত্ত্বেও ইচ্ছা করে কঠিন পথ বেছে নিতে হবে, কিংবা কাছের পথ থাকতে দূরের পথে যেতে হবে। আপনি যে হাদিসটির দিকে ইঙ্গিত করেছেন, তা সুনান গ্রন্থকারগণ বর্ণনা করেছেন এবং আলবানি সেটিকে সহিহ বলেছেন। এটি মসজিদে পায়ে হেঁটে যাওয়ার অধিক সওয়াব প্রমাণ করে; দূরের বা কঠিন পথ বেছে নেওয়ার ফজিলত প্রমাণ করে না।
আল্লাহু আলাম
(উৎস: ইসলাম ওয়েব)
গ্রন্থনায়:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
জুবাইল, সৌদি আরব
No comments:
Post a Comment