Thursday, 24 July 2014

কাউকে বন্ধু বা শত্রু হিসাবে গ্রহণ করার মূলনীতি কী?


বন্ধুত্ব তৈরী মানুষের স্বভাবজাত প্রবণতা। তাই বন্ধুত্বের ব্যাপারে ইসলামে যথেষ্ট গুরুত্ব এসেছে। বন্ধু তো বানাতে হবে তাই বলে তো যাকে তাকে  বন্ধু বানানো যায় না। কারণ, জীবনে বন্ধুর প্রভাব পড়ে। একজন ভাল বন্ধু একজন খারাপ মানুষকে ভাল বানাতে সাহায্য করতে পারে পক্ষান্তরে খারাপ বন্ধু একজন ভাল মানুষকে নিয়ে যেতে পারে অধ:পতনের অতল তলে। তাহলে বন্ধুত তৈরীর আগে অবশ্যই যাচাই-বাছাই করা আবশ্যক।
সুপ্রিয় সাথী, আমাদের এমন লোককেই বন্ধু বানানো উটিত যিনি আল্লাহ ও তার রাসূলকে ভালবাসেন। যিতি সততা ও নীতির প্রশ্নে অটুট। যিনি আপনাকে ভাল কাজে সাহায্য করতে পারবেন। পক্ষান্তরে এমন মানুষকে মনে প্রাণে বন্ধু হিসেবে গ্রহণ করা উটিত নয়, যে আল্লাহ ও তার রাসূলের সাথে দুশমনী মনোভাব পোষণ করে এবং সততা ও চরিত্রের প্রশ্নে উত্তীর্ণ নয়।
 যা হোক, এই পোস্টে একটা প্রশ্নোত্তর তুলে ধরা হল যেখানে আল্লামা শাইখ মুহাম্মাদ ইবন সালেহ উসাইমীন (রাহ:) কাফের-মুশরিকদের সাথে এবং মুসলমানদের সাথে বন্ধুত্ব তৈরীর বিষয়টি অত্যন্ত চমৎকার ভাবে কুরআন ও সুন্নাহরে আলোকে তুলে ধরেছেন।
প্রশ্নঃ কাউকে বন্ধু বা শত্রু হিসাবে গ্রহণ করার মূলনীতি কী? 
উত্তরঃ- আল্লাহ তাআ’লা যে সমস্ত ব্যক্তি বা বিষয় হতে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন, প্রত্যেক মুসলিমের উচিৎ তা থেকে নিজেকে মুক্ত ঘোষণা করা। আল্লাহ বলেন,
 
قَدْ كَانَتْ لَكُمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَآءُ مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ كَفَرْنَا بِكُمْ وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمْ الْعَدَاوَةُ وَالْبَغْضَاءُ أَبَدًا
অর্থঃ “তোমাদের জন্যে ইবরাহীম ও তার সংঙ্গীগণের মধ্যে চমৎকার আদর্শ রয়েছে। তারা তাদের সম্প্রদায়কে বলেছিল, তোমাদের সাথে এবং তোমরা আল্লাহ ব্যাতীত যার এবাদত কর, তার সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নেই। আমরা তোমাদেরকে মানি না। তোমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করলে তোমাদের আমাদের মধ্যে চিরশত্রুতা থাকবে।” (সূরা মুমতাহানাহঃ ৪) আর এটা হবে মুশরিকদের সাথে। আল্লাহ বলেন,
 
وَأَذَانٌ مِنْ اللَّهِ وَرَسُولِهِ إِلَى النَّاسِ يَوْمَ الْحَجِّ الْأَكْبَرِ أَنَّ اللَّهَ بَرِيءٌ مِنْ الْمُشْرِكِينَ وَرَسُولُهُ
অর্থঃ “আর মহান হজ্জের দিনে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে লোকদের প্রতি ঘোষণা দেয়া হচ্ছে যে, আল্লাহ মুশরিকদের থেকে দায়িত্ব মুক্ত এবং তাঁর রাসূলও।” (সূরা তাওবাঃ ৩) সুতরাং প্রতিটি মুমিনের উপর আবশ্যক হল কাফের-মুশরেকদের সাথে সকল প্রকার সম্পর্ক ছিন্ন করা। এমনিভাবে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের অপছন্দনীয় সকল কাজ থেকে বিরত থাকা প্রতিটি মুসলিমের উপর ওয়াজিব। যদিও তা কুফরীর পর্যায়ে না যায়। যেমন পাপাচারিতায় লিপ্ত হওয়া। আল্লাহ বলেন,
 
وَلَكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمْ الْإِيمَانَ وَزَيَّنَهُ فِي قُلُوبِكُمْ وَكَرَّهَ إِلَيْكُمْ الْكُفْرَ وَالْفُسُوقَ وَالْعِصْيَانَ أُوْلَئِكَ هُمْ الرَّاشِدُونَ
অর্থঃ “কিন্তু আল্লাহ তোমাদের অন্তরে ঈমানের প্রতি মহব্বত সৃষ্টি করে দিয়েছেন এবং তা হৃদয়গ্রাহী করে দিয়েছেন। পক্ষান্তরে কুফর, পাপাচার ও নাফরমানীর প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। তারাই সৎপথ অবলম্বনকারী।” (সূরা হুজুরাতঃ ৭) 
 
যদি কোন মুমিনের কাছে ঈমানের সাথে সাথে পাপাচারিতা থাকে, তাহলে আমরা মুমিন হওয়ার কারণে তাকে ভালবাসব এবং পাপ কাজে লিপ্ত হওয়ার কারণে ঘৃণা করব। এধরণের সম্পর্ক রাখার ব্যাপারে দৃষ্টান্ত হল, যেমন আমরা অরুচীকর ঔষধ গ্রহণ করি, অনিচ্ছা সত্বেও তা পান করি। কারণ তাতে আরোগ্যের আশা করা যায়। 
কোন কোন মানুষ পাপী মুমিনকে কাফের-মুশরেকের চেয়েও ঘৃণা করে। এটি খুবই আশ্চর্য্যের বিষয় এবং বাস্তবতার বিপরীত। কাফের আল্লাহর শত্রু, রাসূলের শত্রু এবং সমস্ত মুমিনের শত্রু। তাদেরকে অন-র থেকে ঘৃণা করা ওয়াজিব।
 
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا عَدُوِّي وَعَدُوَّكُمْ أَوْلِيَاءَ تُلْقُونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَقَدْ كَفَرُوا بِمَا جَاءَكُمْ مِنْ الْحَقِّ يُخْرِجُونَ الرَّسُولَ وَإِيَّاكُمْ أَنْ تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ رَبِّكُمْ إِنْ كُنتُمْ خَرَجْتُمْ جِهَادًا فِي سَبِيلِي وَابْتِغَاءَ مَرْضَاتِي تُسِرُّونَ إِلَيْهِمْ بِالْمَوَدَّةِ وَأَنَا أَعْلَمُ بِمَا أَخْفَيْتُمْ وَمَا أَعْلَنتُمْ وَمَنْ يَفْعَلْهُ مِنْكُمْ فَقَدْ ضَلَّ سَوَاءَ السَّبِيلِ
অর্থঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা আমার ও তোমাদের শত্রুদেরকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তোমরা তো তাদের প্রতি বন্ধুত্বের বার্তা পাঠাও, অথচ তোমাদের কাছে যে সত্য আগমণ করেছে, তারা তা অস্বীকার করছে। তারা রাসূলকে এবং তোমাদেরকে বহিস্কার করে, এই অপরাধে যে, তোমরা তোমাদের পালনকর্তার প্রতি বিশ্বাস রাখ। যদি তোমরা আমার সন্তুষ্টি লাভের জন্যে এবং আমার পথে জেহাদ করার জন্যে বের হয়ে থাক, তবে কেন তাদের প্রতি গোপনে বন্ধুত্বের পয়গাম প্রেরণ করছ? তোমরা যা গোপন কর এবং যা প্রকাশ কর, তা আমি খুব জানি। তোমাদের মধ্যে যে এটা করে, সে সরল পথ হতে বিচ্যুত হয়ে যায়।” (সূরা মুমতাহানাহঃ ১)
আল্লাহ বলেন,
 
يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى أَوْلِيَاءَ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ وَمَنْ يَتَوَلَّهُمْ مِنْكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ
অর্থঃ “হে মুমিনগণ! তোমরা ইয়াহুদী ও নাসাদেরকে বন্ধু হিসাবে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পরে বন্ধু। তোমাদের মধ্যে যে তাদের সাথে বন্ধুত্ব করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভূক্ত হবে। আল্লাহ জালেমদেরকে পথ প্রদর্শন করেন না।” (সূরা মায়িদাহঃ ৫১) আল্লাহ বলেন,
 
وَلَنْ تَرْضَى عَنْكَ الْيَهُودُ وَلَا النَّصَارَى حَتَّى تَتَّبِعَ مِلَّتَهُمْ
অর্থঃ “ইহুদী ও খৃষ্টানরা কখনই আপনার উপর সন্তুষ্ট হবে না, যে পর্যন্তু আপনি তাদের ধর্মের অনুসরণ না করবেন।” (সূরা বাকারাঃ ১২০)
 আল্লাহ আরো বলেন,
وَدَّ كَثِيرٌ مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ لَوْ يَرُدُّونَكُمْ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِكُمْ كُفَّارًا
অর্থঃ “আহ্ লে কিতাবদের অনেকেই প্রতিহিংসা বশতঃ কামনা করে যে, মুসলমান হওয়ার পর তোমাদেরকে কাফের বানিয়ে দেয়।” (সূরা বাকারাঃ ১০৯) 
এমনিভাবে প্রতিটি নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকা আবশ্যক। আমাদের জন্যে হারাম কাজের প্রতি ভালবাসা রাখা বৈধ নয়। আমরা পাপী মুমিনের পাপকাজকে ঘৃণা করি এবং তা থেকে আমরা নিজেদেরকে দূরে রাখি। কিন্তু আমরা তাকে ঈমানের কারণে ভালবাসি।

Wednesday, 23 July 2014

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নূরের তৈরী, না মাটির তৈরী?


লেখক: আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম

আমাদের মনে রাখতে হবে, সৃষ্টির উপাদানের উপর ভিত্তি করে কোন ব্যক্তির মর্যাদা নির্ণয় করা সরাসরি কুরআন ও হাদীছ বিরোধী কথা। কারণ মহান আল্লাহ বলেই দিয়েছেনঃ. ‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে ঐব্যক্তি বেশি সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বধিক তাক্বওয়াশীল’ পরহেযগার”। (সূরা হুজুরাত: ১৩)
নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেনঃ হে মানব মণ্ডলি! নিশ্চয় তোমাদের প্রতিপালক এক, সাবধান! কোন আরবীর আজমীর (অনারব) উপর, কোন আজমীর আরবীর উপর প্রাধান্য নেই। অনুরূপভাবে কোন লাল বর্ণের ব্যক্তির কালো ব্যক্তির উপর, কোন কালো ব্যক্তির লাল বর্ণের ব্যক্তির উপর প্রাধান্য নেই। প্রাধান্য একমাত্র তাকওয়া পরহেযগারিতার ভিত্তিতে হবে। ‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তি বেশি সম্মানিত যে তোমাদের মধ্যে সর্বধিক তাক্বওয়াশীল’-পরহেযগার (আহমাদ প্রভৃতি, হাদীছ ছহীহ। দ্রঃ শাইখ আলবানীর গায়াতুল মারাম, পৃঃ১৯০, হা/৩১৩)।
এ জন্যই তো আযরের মত মূর্তী পুজারী মুশরিক ব্যক্তির ঔরষজাত সন্তান ইবরাহীম (আলাইহিস্ সালাম) অন্যতম শ্রেষ্ঠ নবী, শুধু কি তাই মহান আল্লাহর খলীল তথা অন্তরঙ্গ বন্ধুও বটে, তার মিল্লাতের অনুসরন করার নির্দেশ আমাদের নবীকেও করা হয়েছে। পক্ষান্তরে নূহ নবীর মত একজন সম্মানিত ব্যক্তির ঔরষজাত সন্তান কাফের হওয়ার জন্য নিকৃষ্ট ব্যক্তি। বীর্য থেকে মানুষ সৃষ্টি হলেও মানুষই বীর্য অপেক্ষা উত্তম। এমনকি তুলনা করাটাও অনর্থক। আদী পিতা আদম (আলাইহিস্ সালাম) মাটির তৈরী হলেও মাটির থেকে তিনি সন্দেহাতীতভাবে উত্তম, এমনকি তুলনা করাটাও বাহুল্য কাজ..। আবু লাহাব সম্মানিত কুরাইশ বংশের হয়েও অতি নিকৃষ্ট কাফের, যার শানে আল্লাহ সূরা মাসাদ (লাহাব) নাযিল করেছেন। মহান আল্লাহ এই সূরায় বলেনঃ পরম করুনাময়, দয়ালু আল্লাহর নামে শুরু। ‘আবু লাহাবের দুটি হাত ধ্বংস হোক, সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার সম্পদ, ও যা সে উপার্জন করেছে -কোনই কাজে আসেনি। সে অচিরেই লেলিহান অগ্নিতে প্রবেশ করবে। এবং তার স্ত্রীও-যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে। (সূরা আল মাসাদ{লাহাব})
এ থেকেই অকাট্যভাবে প্রতীয়মান হয় যে, মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জন্মের উপাদানের উপর ভিত্তিশীল নয়। বরং এই শ্রেষ্টত্ব এবং সম্মান তাক্বওয়ার ভিত্তিতে হয়ে থাকে। কাজেই নবী নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) নূর থেকে সৃষ্টি না হয়ে মাটি থেকে সৃষ্টি হওয়া তাঁর জন্য মোটেও মানহানিকর বিষয় নয় যেমনটি অসংখ্য বিদআতী তাই ধারণা করে বসেছে। বরং নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মাটির তৈরী হয়েও সৃষ্টির সেরা ব্যক্তিত্ব, সর্বাধিক মুত্তাক্বী-পরহেযগার। সমস্ত সৃষ্টি কুলের সর্দার, নবীকুল শিরোমণী, আল্লাহর খালীল-অন্তরঙ্গ বন্ধু। আল্লাহর অনুমতি সাপেক্ষে হাশরের মাঠে মহান শাফাআতের অধিকারী, হাওযে কাউছারের অধিকারী, সর্ব প্রথম জান্নাতে প্রবেশকারী। মাক্বামে মাহমূদের অধিকারী, রহমাতুল লিল আলামীন, শাফিঊল লিল মুযনিবীন। এসব বিষয়ে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের মাঝে কোনই দ্বিমত নেই। ইহাই ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈনে ইযাম, আইম্মায়ে মুজতাহিদীনের বিশ্বাস। যুগ পরম্পরায় এই বিশ্বাসই করে আসছেন সকল সুন্নী মুসলিম।

“সালামের প্রচার-প্রসার ঘটাও“ (সালাম সংক্রান্ত বিধিবিধান)



মূল: আবদুল মালেক আল কাসেম
অনুবাদ: আখতারুল আমান বিন আব্দুস সালাম
সম্পাদনা: আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল

بسم الله الرحمن الرحيم
প্রশংসা মাত্র এক আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম অবতীর্ণ হোক প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর  উপর যার পর আর কোন নবী নেই।
সালাম একটি প্রাচীন সুন্নাত যা আদম আলাইহিস সালাম থেকে শুরু হয়ে কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হওয়া অবধি বিদ্যমান থাকবে। ইহাই জান্নাত বাসীদের শুভেচ্ছা। আর জান্নাতে তাদের শুভেচ্ছা হবে সালাম-শান্তি। ইহা নবী-আম্বিয়াদের সুন্নাত, মুত্তাকীদের স্বভাবগত গুণ খাঁটি মুমিনদের বৈশিষ্ট্য। অথচ ইদানীং কালে মুসলমানদের মধ্যে প্রকাশ্য নির্লজ্জতা ও সুস্পষ্ট বিভক্তি বিরাজিত। দেখা যাচ্ছে, একজন মুসলিম আরেক মুসলিম ভায়ের নিকট দিয়ে অতিক্রম করছে অথচ তাকে ইসলামের শুভেচ্ছা তথা সালাম প্রদান করে না। অনেকে তো পরিচিত ব্যক্তিকেই শুধু সালাম প্রদান করে। আবার কেউ অপরিচিত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে সালাম পেলে বিরক্ত হয়।
 এমনকি কোন কোন লোক তো সালাম প্রদান কারীকে মন্দ ভেবে জিজ্ঞেস করে, তুমি কি আমাকে চেন?… এগুলো সবই রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশের বিরোধিতা। যে কারণে আন্তরিকভাবে পারষ্পরিক দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। দলাদলি ও বিভক্তি বৃদ্ধি লাভ করেছে। নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: “তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না মুমিন না হওয়া পর্যন্ত।  আর তোমরা মুমানি হবে না যতক্ষণ না পরস্পরকে না  ভালবাসবে। আমি কি তোমাদেরকে এমন পদ্ধতির কথা বলে দিব না যা করলে তোমরা পরস্পরকে ভালবাসতে পারবে? তা হল, তোমাদের মধ্যে বেশী বেশী করে সালাম প্রচার ও প্রসার করবে।” (মুসলিম)
বুখারী ও মুসলিমের যৌথ বর্ণনায় এসেছে: “এক ব্যক্তি রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহ ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন: ইসলামের কোন বিশিষ্টটি সর্বোত্তম? তদুত্তরে তিনি বলেন: তুমি খাবার খাওয়াবে এবং যাকে চেন অথবা চেন না সবাই (মুসলিম)কে কে সালাম প্রদান করবে।
অত্র হাদীছে মুসলমানদের মধ্যে সালাম প্রসার করার প্রতি উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। আরও বলা হয়েছে, সালাম শুধু তোমার পরিচিত ও সাথী মহলের সাথেই খাস নয় বরং তা সমস্ত মুসলিমের জন্য। সাহাবী ইবনে উমর (রা:) বাজারে যাওয়ার সময় বলতেন: “আমরা বাজারে যাচ্ছি সালাম প্রদানের জন্য। সুতরাং যাদের সাথে আমাদের সাক্ষাৎ হবে তাদেরকে আমরা সালাম দিব।”
মূলত: সালাম মুসলিম ব্যক্তির বিনয়, অপরকে ভালবাসার দলীল স্বরূপ। হিংসা-বিদ্বেষ, ঘৃণা, অহংকার, অপরকে তুচ্ছ জ্ঞান করা ইত্যাদি মন্দ গুণ থেকে তার অন্তর পরিষ্কার থাকার প্রতি এই সালাম ইঙ্গিত করে। ইহা মুসলমানদের একে অপরের প্রতি ন্যায় অধিকার সমূহের অন্যতম অধিকার। এই সালামই পরস্পরিক পরিচিতি, একতা, প্রেম-প্রীতি ও ভালবাসা সৃষ্টি করার মাধ্যম। নেকী অর্জন ও জান্নাতে প্রবেশের অন্যতম কারণ। ইহার প্রসার ও প্রচারে রয়েছে নবী মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্নাত পুনর্জীবিত করণ।
নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: পাঁচটি  জিনিস একজন মুসলিম ব্যক্তির উপর অপর ভাইয়ের জন্য করা ওয়াজিব। যথা:
  • ১) সালামে জবাব দেওয়া,
  • (২) হাঁচির জবাব দেয়া অর্থাৎ হাঁচি দিয়ে হাঁচিদাতা আলহামদুলিল্লাহ বললে তার উত্তরে ইয়ার হামুকাল্লাহ বলা
  • (৩) দাওয়াত কবূল করা
  • (৪) রোগীর দেখা-শুনা করা
  • (৫) জানাজায় উপস্থিত হওয়া। (অর্থাৎ জানাজা নামায পড়া ও দাফনে শরীক হওয়া)। (মুসলিম)
কেউ সালাম দিলে নবীর নির্দেশের অনুসরণে তার জবাব দেওয়া ওয়াজিব। আবু সাঈদ খুদরী (রা:) হতে বর্ণিত নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমরা মানুষ চলাচলের রাস্তায় বসা হতে সাবধান। সাহাবীগণ বললেন: হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের ঐখানে বসে পরস্পরে আলাপ করা ছাড়া কোন উপায় নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: তোমরা যদি একান্ত বসতেই চাও তাহলে পথের হক আদায় করবে। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! পথের হক কি? তিনি বললেন: (নিষিদ্ধ বিষয় দেখা থেকে) চক্ষু নত রাখা, (কাউকে) কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, সালামের জবাব দেয়া, ন্যায়ের আদেশ দেয়া ও অন্যায় থেকে নিষেধ করা। (বুখারী ও মুসলিম)
ইমাম নাওয়াভী (রহ) বলেন: (হে পাঠক) একথা অবগত হবেন যে, সালামের চর্চা করা তথা সালাম দেওয়া সুন্নাত। তবে তার উত্তর দেওয়া ওয়াজিব। আর যদি সালাম প্রদানকারী একটি জামায়াত হয় তবে তাদের জন্য সালাম দেওয়া সুন্নতে কেফায়া (অর্থাৎ একজন সালাম দিলেই সকলের পক্ষ হতে এ সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে আর কেউ সালাম না দিলে সকলেই সুন্নাত পরিত্যাগ কারী বলে গণ্য হবে)। সুতরাং একজন সালাম দিলেই সকলের পক্ষ থেকে সালামের সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। যাকে সালাম দেয়া হল সে যদি এক জন ব্যক্তি হয় তবে তাকেই জবাব দেয়া আবশ্যক। আর যদি তারা এক জামায়াত (দল) হয়, তবে জবাব দেয়া তাদের জন্য ফরযে কেফায়া। যদি তাদের মধ্যে থেকে একজন সালামের জবাব দিয়ে দেয় তবে গুনাহ মুক্ত হয়ে যাবে। অবশ্য উত্তম হল প্রত্যেকেই শুরুতেই সালাম দিবে এবং (উপস্থিত) প্রত্যেকেই সালামের জবাব দিবে।
সালামের পদ্ধতি:
ইমাম নাওয়াভী বলেন: সালামের সর্বনিম্ন শব্দ হল: (السلام عليكم) আসসালামু আলাইকুম বলা। যাকে সালাম দেয়া হচ্ছে সে যদি একক ব্যক্তি হয়, তবে তার জন্য সর্ব নিম্ন শব্দ হল: (السلام عليك) আসসালামু আলায়কা বলা। তবে এক্ষেত্রে উত্তম হল (السلام عليكم) বলা যাতে করে এ সালাম তাকে ও তার দুই ফেরেশতাকেও শামিল করে। এর চেয়েও পূর্ণাঙ্গরূপ হল: (ورحمة الله) ওয়া রহমাতুল্লাহ বৃদ্ধি করে বলা, অনুরূপ ভাবে (وبركاته) ওয়া বারাকাতুহু শব্দ বৃদ্ধি করে বলা আরও উত্তম। যদি কেউ  (سلام عليكم) সালামুন আলাইকুম বলে তবুও তা তার জন্য যথেষ্ট হবে।
সালামের জবাব:
ইমাম নাওয়াভী বলেন: সালামের জওয়াব দেয়ার সর্বোত্তম ও পূর্নাঙ্গ পদ্ধতি হল: ( وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته)ওয়া আলাইকুমাসসালাম ওয়া রহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহ্‌ বলা। অর্থাৎ আলাইকুম, এর পূর্বে (و) ওয়াও অক্ষরটি উল্লেখ করবে। তা বাদ দিলেও জায়েজ আছে তবে সেটা উত্তম পদ্ধতি হবে না। কেউ যদি সালামের জবাবে শুধু ওয়া আলাই কুমুস্‌ সালাম বলে তবে তা যথেষ্ট হবে। তবে যদি শুধু (عليكم) আলাইকুম বলে তবে সকল বিদ্বানের নিকটেই তা যথেষ্ট হবে না।
সালামের স্তর:
তিনটি স্তরে সালাম বিভক্ত:
  • ১) সর্বোচ্চ, পূর্ণাঙ্গ ও সর্বোত্তম রূপ হল: (السلام عليكم ورحمة الله وبركاته) আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহু বলা।
  • ২) এর তার চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হল (আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্‌) বলা।
  • ৩) সবচেয়ে নিম্ন পর্যায়ের হল: আসসালামু আলাইকুম বলা।
মুসলিম ব্যক্তি হয় পূর্ণাঙ্গ নেকী নিবে অথবা তার চেয়ে কম নেকী নিবে অর্থাৎ সালাম অনুযায়ী সে কম বেশী সওয়াব পাবে। এজন্যই হাদীছে এসেছে যে, একজন ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করল অতঃপর আসসালামু আলাইকুম বলল তখন নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম মসজিদে বসে ছিলেন, সাহাবায়ে কেরাম তার সাথেই ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন: (ওয়া আলাইকুমুস সালাম) তুমি ১০টি নেকি পেয়েছ। এরপর অপর এক ব্যক্তি মসজিদে প্রবেশ করত: ”আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ্‌” বলল। নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম জবাবে বললেন: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহ্‌মাতুল্লাহ্‌। তুমি ২০টি নেকি পেয়েছো। অতঃপর আরও একজন ব্যক্তি প্রবেশ করত: ”বলল আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।” রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহে ওয়া বারাকাতুহ্‌ – তুমি পেয়েছো ৩০টি নেকি। হাদীছটি আবু দাঊদ, তিরমিযী বর্ণনা করেছেন। অত্র হাদীছে ১০, ২০, ৩০টি বলতে ঐ পরিমাণ নেকী বুঝানো হয়েছে।
সালামের কতিপয় আদব:
১) পথে দুজনের সাক্ষাত হলে সুন্নত হল আরোহী ব্যক্তি পদব্রজে চলমান ব্যক্তিকে, কম সংখ্যক মানুষ বেশী সংখ্যক মানুষকে সালাম দিবে। ছোট বড়কে সালাম দিবে। নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:  আরোহী ব্যক্তি পদব্রজে চলা ব্যক্তিকে, চলমান ব্যক্তি উপবিষ্ট ব্যক্তিকে, কম সংখ্যক বেশি সংখ্যক লোককে সালাম দিবে। (মুসলিম)
২) সালাম দানকারী ব্যক্তির উচিত, মুসলিমদের উদ্দেশ্যে তার শুভেচ্ছা বাণী যেন শুধুমাত্র সালামের মাধ্যমেই হয়। সাবাহাল খায়ের, শুভ সকাল, গুড মর্নি, মারহাবা, অথবা হ্যালো ইত্যাদি যেন না হয়। সালাম দিয়েই শুরু করে অতঃপর সমাজে প্রচলিত উপরোক্ত শব্দাবলী বা অন্য যে কোন বৈধ শব্দাবলী দ্বারা স্বাগত জানাতে কোন অসুবিধা নাই।
৩) মুসলিম ব্যক্তির জন্য মুস্তাহাব হল: সে যখন নিজ বাড়িতে প্রবেশ করবে সালাম দিবে। কারণ সালামের মাধ্যমে বরকত নাযিল হয়। যদি ঘরে কেউ না থাকে তবে বলবে: আসসালামু আলায়না ওয়া আলা ইবাদিল্লাহিস সালেহীন আমাদের উপর এবং আল্লাহ্‌র সৎ বান্দাদের উপর সালাম বর্ষিত হোক। (মুসলিম)
৪) শ্রোতাকে বিরক্ত করে না, ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগিয়ে তোলে না- এই ধরণের স্বরে সালাম প্রদান করা উচিত। হযরত মেক্বদাদ (রা:) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন:  আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম এর জন্য তার অংশ দুধ উঠিয়ে রাখতাম। তিনি রাত্রে আসতেন এবং এমনভাবে সালাম প্রদান করতেন যে তা ঘুমন্ত ব্যক্তিকে জাগ্রত করত না অথচ জাগ্রত ব্যক্তির কর্ণ গোচর হত। (মুসলিম)
৫) পুনরায় সালাম দেয়া এবং তার পুনরাবৃত্তি করা ঐ ব্যক্তির জন্য মুস্তাহাব যে তার ভাই থেকে সামান্য সময়ের জন্য হলেও পৃথক হয়েছিল। আবু হোরায়রা হতে বর্ণিত তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: যখন তোমাদের কেউ স্বীয় (মুসলিম) ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করবে তখন সে যেন তাকে সালাম দেয়। যদি উভয়ের মধ্যে গাছ, দেওয়াল বা পাথর অন্তরায় হয় অতঃপর আবার সে তার সাথে সাক্ষাৎ করে তবুও সে যেন তার ভাইকে সালাম করে। (অবূ দাঊদ)
৬) পুরুষ মহিলাকে সালাম দেয়া, অনুরূপ ভাবে মহিলা পুরুষকে সালাম প্রদান করা জায়েজ। সুতরাং মহিলা তার মাহারাম (বিবাহ যাদের সাথে বৈধ নয় এমন) ব্যক্তিদেরকে সালাম দিবে এবং তাদের সালাম এর উত্তর দেয়াও তার উপর ওয়াজিব। অনুরূপ ভাবে পুরুষ ব্যক্তি তার মাহরাম নারীদেরকে সালাম দিবে এবং তার উপর তাদের সালামের জওয়াব দেওয়া ওয়াজিব। যদি কোন মহিলা বেগানা হয় তবে তাকেও সালাম দেওয়া যাবে। আর যদি সে মহিলা সালাম করে, তার সালামেরও জওয়াব দিতে হবে। অবশ্য এ বিধান ফিতনা থেকে নিরাপদ থাকাবস্থায় প্রযোজ্য। তাদের সাথে সালাম বিনিময় কোন প্রকার মুসাফাহা, নরম ভাষায় কথোপকথন বর্জন করতে হবে। কিন্তু সালাম লেন-দেন হলে যদি ফেতনা সৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা থাকে তবে তা থেকে নারী-পুরুষ উভয় পক্ষের জন্য বিরত থাকা আবশ্যক।
৭) মানুষের মধ্যে হাত দিয়ে ইশারা ইঙ্গিতে সালাম দেওয়ার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। (সুতরাং এবিষয়ে কথা হল) যদি কোন মুসলিম ব্যক্তি দূরে থেকে সালাম দেয় এবং সাথে ইশারাও করে তবে তাতে কোন অসুবিধা নেই। যেহেতু সে (অর্থাৎ সালাম প্রদান কৃত ব্যক্তি) শুনতে পায় না। এমতাবস্থায় ইশারা করা সালাম দেয়ার প্রমাণ স্বরূপ। সালামের বিকল্প নয়। এভাবে প্রতি উত্তরেও বলা যায়। লক্ষণীয় বিষয় হল, হাত দ্বারা ইশারা করার সময় মুখেও সালাম উচ্চারণ করতে হবে। তাহলেই সালাম দেয়ার সওয়াব পাওয়া যাবে। অনুরূপভাবে সালামের উত্তর দেয়ার ক্ষেত্রে এ বিষয়টি লক্ষণীয়।
৮) কোন বৈঠক শেষে উঠার সময়ও সালাম দিয়ে বিদায় নেয়াও মুস্তাহাব। কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: যখন তোমাদের কেউ কোন মজলিসে পৌঁছে তখন সে যেন সালাম দেয়। মজলিস থেকে উঠার ইচ্ছা করলেও যেন সালাম দেয়। কারণ প্রথম সালাম দ্বিতীয় সালাম অপেক্ষা বেশী হকদার নয়।
৯) সালাম দিয়ে মুসাফাহ করা (হাত মিলানো) বা তোমার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি হাত বাড়িয়ে দেওয়া মুস্তাহাব। নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: দু জন মুসলিম ব্যক্তি সাক্ষাৎ কালীন পরস্পরে মুসাফাহা করলে পৃথক হওয়ার পূর্বেই তাদেরকে ক্ষমা করে দেয়া হয়। (আবু দাউদ, তিরমিযী)
হযরত আনাস বিন মালিক হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে কোন ব্যক্তি উপস্থিত হয়ে তার সাথে মুসাফাহা করলে, তিনি স্বীয় হাত মোবারক ছোটাতেন না যতক্ষণ পর্যন্ত ঐ ব্যক্তি নিজেই তার হাত টেনে না নিত। (তিরমিযী)
১০) সালামের সময় প্রফুল্ল ও হাস্যোজ্জল চেহারা ও মৃদু হাসার প্রতি আগ্রহী হোন। কেননা নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমার ভাইয়ের সামনে মুচকি হাঁসিটাও সদকা। তিনি আরও বলেন: ভালো কাজের কোন কিছুকেই খাটো করে দেখ না যদিও তা তোমার ভায়ের সাথে হাস্য মুখে সাক্ষাৎকার হয়। (মুসলিম)
১১) ছোট ছেলেদের সালাম দেয়া- যেমনটি নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম করতেন – মুস্তাহাব। এতে করে তাদের সামনে প্রফুল্লতা দেখানো হয়, তাদের অন্তরে বিশ্বস্ততার বীজ বপন করা হয়। তাদের অন্তরে ইসলামের শিক্ষা প্রথিত করা হয়।
১২) কাফেরদের প্রথমে সালাম দেয়া যাবে না। কারন নবী সাল্লাল্লাহু আরাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: তোমরা ইয়াহুদ ও নাসারাদেরকে প্রথমে সালাম প্রদান করো না। আর যদি তোমরা পথিমধ্যে তাদের কারো সাক্ষাৎ পাও তবে তাকে সংকীর্নতম পথে চলার প্রতি বাধ্য কর। (মুসলিম)
তিনি আরও বলেন: যখন তোমাদেরকে কিতাব ধারী গন (তথা ইয়াহুদী-খৃষ্টানগণ) সালাম দিবে তখন তোমরা বলবে ”ওয়ালাইকুম”। (বুখারী ও মুসলিম)
হে আল্লাহর বান্দাগণ! অন্তর সমূহকে পরস্পরের নিকটবর্তী করতে, আল্লাহর নিকট প্রতিদান ও নেকী হাসিলের উদ্দেশ্যে মুসলমানদের মাঝে এই সুন্নাতটি পুনর্জীবিত করুন। আল্লাহ আমাদের প্রিয় নবী মোহাম্মাদ ন ও তার পরিবার পরিজন ও সাহাবীদের উপর রহমতের বারী ধারা অবতীর্ণ করুন। আমীন।

ফরয সালাতের পরে সম্মিলিত মুনাজাত একটি প্রচলিত বিদআত




আমাদের সমাজে যতগুলি বিদ’আত প্রচলিত আছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফরয সালাতের পর সম্মিলিত মুনাজাত। এই সম্মিলিত মুনাজাতের দলীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পাওয়া যায় না । কোন কোন বিদ’আত বছরে একবার করা হয় , কোন কোনটি হয়ত মাসে একবার , কোন কোনটি হয়তো সপ্তাহে একবার । কিন্তু সম্মিলিত মুনাজাত এমন এক বিদ’আত যা প্রতিদিন পাঁচবাব করা হয় । সুতরাং এর থেকে দুরে থাকতে হবে ।
হাদীসে বর্ণিত ফরয সালাতের পর পঠিতব্য দুআ ও যিকিরগুলো এককী পড়তে হবে, দলবদ্ধভাবে নয় । কারণ, হাদীসে এ ক্ষেত্রে পঠিতব্য দুআগুলো প্রায়ই সবই এক বচনের শব্দে এসেছে ।দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ভারত বর্ষের প্রায় সকল মুসলিম জনগণ (আলিম ও সাধারণ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সালাতের পর পঠিতব্য দুআর তালিকাটি আংশিক বা পুরোপুরি বাদ দিয়ে নিজেরাই বিভিন্ন দুআ নির্বাচন ও সংযুক্ত করেছে। এর সাথে আরো যোগ করেছে দলবদ্ধ ও সম্মিলিত রুপ । ফলে সালাতের পরে দুআর নামে সম্মিলিত মুনাজাতের মাধ্যমে অনেকগুলো সুন্নাত উৎখাত হয়েছে । প্রথমতঃ যে সুন্নাতটি উঠেছে সেটা হল, ফরয সালাতের পর যে নির্দিষ্ট কিছু দুআ ও যিকির রয়েছে এটার জ্ঞানই অধিকাংশ লোকের নেই । যার জন্য ওগুলো কন্ঠস্থ করার সুযোগ তাদের হয়নি । ঐ সকল দুআ ও যিকির সম্বলিত হাদীসগুলো পড়ার কিম্বা ইমাম সাহেবের মাধ্যমে শোনার অবকাশ হয়নি বা নেই । এখন আমি যে সকল স্থানে হাত তুলে দোয়া করা যায় তা সহীহ হাদীসের মাধ্যমে তুলে ধরবোঃ
যে সকল স্থানে হাত তুলে দোয়া করা যায়:
(১) বৃষ্টি প্রার্থনার জন্যঃ
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন , নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় এক বছর দুর্ভিক্ষ দেখা দিল । সে সময় একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা প্রদানকালে জনৈক বেদুঈন উঠে দাঁড়াল এবং আরয করল , হে আল্লাহর রাসূল ! বৃষ্টি না হওয়ার কারণে সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে , পরিবার পরিজন অনাহারে মরছে । আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুন । অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় হস্তদয় উত্তোলন পূর্বক দোয়া করলেন । সে সময় আকাশে কোন মেঘ ছিল না । (রাবী বলেন) আল্লাহর কসম করে বলছি, তিনি হাত না নামাতেই পাহাড়ের মত মেঘের খন্ড এসে একত্র হয়ে গেল এবং তার মিম্বার থেকে নামার সাথে সাথেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল । এভাবে দিনের পর দিন ক্রমাগত পরবর্তি জুম’আ পর্যন্ত হ’তে থাকল । অতঃপর পরবর্তি জুম’আর দিনে সে বেদুঈন অথবা অন্য কেউ দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতি বৃষ্টিতে আমাদের বাড়ীঘর ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছে, ফসল ডুবে যাচ্ছে । অতএব আপনি আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য দোয়া করুন । তখন তিনি দু’হাত তুললেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহ ! আমাদের পার্শ্ববর্তি এলাকায় বৃষ্টি দাও , আমাদের এখানে নয় । এ সময় তিনি স্বীয় আঙ্গুলী দ্বারা মেঘের দিকে ইশারা করছিলেন । ফলে সেখান থেকে মেঘ কেটে যাচ্ছিল । ( বুখারী , প্রথম খন্ড , পৃঃ ১২৭ , হা/৯৩৩ জুম’আর সালাত’ অধ্যায়)
একই বিষয় সম্পর্কিত আরও হাদীস দেখুন – বুখারী প্রথম খন্ড , পৃঃ ১৪০ , হা/১০২৯ ‘ইস্তিস্কা’ অধ্যায় ।
বৃখারী , প্রথম খন্ড , পৃঃ ১৩৭ ; মুসলিম , প্রথম খন্ড , পৃঃ ২৯৩-২৯৪ ।
মুসলিম , মিশকাত হা/১৪৯৮ ‘ইস্তিস্কা’ অনুচ্ছেদ ।
বুখারী , প্রথম খন্ড , পৃঃ ১৪০ , হা/১০৩১ ; মিশকাত হা/১৪৯৯।
(২) বৃষ্টি বন্ধের জন্যঃ
উপরে এক নম্বরে আলোচিত দলীল সমূহ ।
(৩) চন্দ্র ও সূর্য গ্রহনের সময়ঃ

প্রশ্নোত্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জীবনী



১. প্রশ্নঃ আমাদের প্রিয় নবীজীর নাম কি?
উত্তরঃ মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।
২. প্রশ্নঃ তাঁর পিতা- মাতা ও দাদার নাম কি?
উত্তরঃ পিতাঃ আবদুল্লাহ, মাতাঃ আমেনা, দাদাঃ আবদুল মুত্তালিব।
৩. প্রশ্নঃ তাঁর দুধমাতার নাম কি?
উত্তরঃ প্রথম দুধমাতা ছুওয়াইবা (আবু লাহাবের কৃতদাসী) তারপর হালিমা সাদিয়া (রাঃ)।
৪. প্রশ্নঃ আমাদের প্রিয় নবীজীর নাম কয়টি ও কি কি?
উত্তরঃ পাঁচটি। মুহাম্মাদ, আহমাদ, মাহী, হাশের, আক্বেব (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। (বুখারী)
৫. প্রশ্নঃ তিনি কখন জন্মলাভ করেন?
উত্তরঃ ৯ই রবিউল আওয়াল। মতান্তরে ১২ই রবিউল আওয়াল সোমবার দিন। ৫৭০ মতান্তরে ৫৭১খৃঃ। হস্তি বছর।
৬. প্রশ্নঃ জন্মলাভের পর কে তাঁর লালন-পালনের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন?
উত্তরঃ দাদা আবদুল মুত্তালিব।
৭. প্রশ্নঃ কে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর নাম মুহাম্মাদ রাখেন?
উত্তরঃ দাদা আবদুল মুত্তালিব।
৮. প্রশ্নঃ নবীজীর কত বছর বয়সে তাঁর পিতা-মাতা ইন্তেকাল করেন?
উত্তরঃ তাঁর জন্মের পূর্বে পিতা এবং তাঁর বয়স ৬ বছর হলে মাতা ইন্তেকাল করেন।
৯. প্রশ্নঃ নবীজীর কত বছর বয়সে তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালেব ইন্তেকাল করেন?
উত্তরঃ তখন তাঁর বয়স ৮ বছর।
১০. প্রশ্নঃ দাদা আবদুল মুত্তালেব ইন্তেকাল করার পর কে তাঁর লালন-পালনের দায়িত্ব নেন?
উত্তরঃ চাচা আবু তালেব।
১১. প্রশ্নঃ নবীজী কত বছর বয়সে চাচা আবু তালেবের সাথে শাম দেশ (সিরিয়া) সফর করেন?
উত্তরঃ ১২ বছর বয়সে।
১২. প্রশ্নঃ কৈশরে নবীজী কি কাজ করতেন?
উত্তরঃ অল্প বেতনে মক্কাবাসীদের ছাগল চরানোর কাজ করতেন।
১৩. প্রশ্নঃ কৈশরে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পিতৃব্যদের সাথে একটি যুদ্ধে অংশ নেন। যুদ্ধটির নাম কি?
উত্তরঃ হারবুল ফুজ্জার।
১৪. প্রশ্নঃ হিলফুল ফযূল কি?

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য-সমর্থন করার একশত উপায়



প্রিয় পাঠক ও পাঠিকা, আপনাদের কারো অজানা নয় যে, কাফের সম্প্রদায় কখনো ইসলাম নিয়ে, কখনো মুসলমানদের নিয়ে কখনো নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিয়ে আবার কখনো ইসলামে বিশেষ কোন দিক নিয়ে আক্রমণাত্মক, ব্যাঙ্গাক্তক ও উস্কানি মূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। সম্প্রতি আমেরিকায় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও ইসলাম নিয়ে ব্যঙ্গাক্ত ফ্লিম তৈরি করেছে। এ প্রেক্ষাপটে আমরা কিভাবে নবী সাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাহায্য ও সমর্থন করতে পরি এ প্রবন্ধে সে ব্যাপারে একশটি উপায় তা আলোচনা করা হয়েছে।
সকল প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। নবী ও রাসূলদের শ্রেষ্ঠতম সত্বা, আমাদের নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম , তাঁর সাথী-সঙ্গী এবং পরিবার-পরিজনের প্রতি সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক।
ইসলামের মূলভিত্তি সমূহের একটি হল: এ কথার ঘোষণা দেয়া যেঃ  আল্লাহ তাআলা ব্যতীত ইবাদতের উপযুক্ত সত্যিকার কোন মাবুদ নেই ও মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর রাসূল।
ইসলামের এ মহান দু’টো ঘোষণার দ্বিতীয়টি হল:  মুহাম্মাদ [সা:] আল্লাহর প্রেরিত রাসূল।
নিম্নোক্ত পদ্ধতিতে এ ঘোষণার বাস্তবায়ন করা যায়ঃ
প্রথমতঃ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা কিছু নিয়ে এসেছেন তা সত্য বলে মেনে নেয়া। তিনি মানব ও জ্বিনসহ সকলের জন্য প্রেরিত। তার প্রধান মিশন হল আল-কুরআন ও সুন্নাহ। এ দু’টো বাদ দিয়ে কোন ধর্ম আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়তঃ তার আনুগত্য করা, তার হুকুমে সন্তুষ্ট থাকা। তার সিদ্ধান্ত ও নির্দেশ সম্পূর্ণভাবে মেনে নেয়া, তার সুন্নাত ও আদর্শের অনুসরণ করা। এবং এর বাহিরে যা আছে তা প্রত্যাখ্যান করা।
তৃতীয়তঃ নিজের চেয়ে, নিজের মাতা-পিতা ও পরিবার-পরিজনের চেয়ে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বেশী মুহাব্বত করা-ভালবাসা। এ ভালবাসার যথার্থ রূপ হচ্ছে তাকে সম্মান করা, মর্যাদা দেয়া, সাহায্য করা এবং তার পক্ষ সমর্থন করা।
সকল মুসলিমের কর্তব্য হলঃ এ বিষয়গুলো বাস্তবে রূপদানের চেষ্টা করা। এতে তার ঈমান পরিশুদ্ধ হবে, কালেমায়ে তাওহীদের দ্বিতীয় ঘোষণা সঠিক বলে গৃহীত হবে। শুধু মুখে স্বাক্ষ্য দেয়ার নাম ঈমান নয়। যেমনটি করে মুনাফিকরা।
আল্লাহ বলেনঃ
মুনাফিকরা বলে, আমরা স্বাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল। আল্লাহও জানেন নিশ্চয়ই আপনি তাঁর রাসূল। কিন্তু আল্লাহ স্বাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, মুনাফিকরা মিথ্যাবাদী। (সূরা আল-মুনাফিকুনঃ )
কেন মুনাফিকদের এ ঘোষণা কাজে আসেনি? কারণ তারা এ ঘোষণার বাস্তবায়নে কাজ করেনি।
এ প্রসঙ্গে আমরা আপনার খেদমতে এমন কিছু বিষয় পেশ করছি যা দিয়ে আপনি আল্লাহর রাসূলকে মুহাব্বত ও ভালবাসার পরিচয় দিতে পারবেন। বিশেষ করে বর্তমানের এ সংকটময় সময়ে তার মুহাব্বত ও ভালবাসার প্রমাণ দেয়া অনেক জরুরী হয়ে পড়েছে। ঈমানের দাবীতে পরিণত হয়েছে। প্রত্যেকে যার যার সামর্থ অনুযায়ী মুহাব্বতের দাবীর প্রমাণ দিবেন। নিজে এর দায়িত্ব বহন করবেন।
ব্যক্তি হিসাবে দায়িত্বঃ
[১ ] রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়তের অকাট্য প্রমাণাদির ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করা, যা দিয়ে প্রমাণ হয় যে, তিনি মহান রাব্বুল আলামীনের রাসূল। এ সকল প্রমাণের মূল হল আল-কুরআন। এতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নবুওয়তের সত্যতার বিষয়ে যে সকল বানী এসেছে তা অনুধাবন করা ও তাতে চিন্তা-গবেষণা করা।
[২]  নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আনুগত্য ও অনুসরণ যে অবশ্য কর্তব্য এবং তার সকল নির্দেশ পালন করা যে অপরিহার্য, এ বিষয়ে কুরআন,সুন্নাহ ও ইজমার প্রমাণাদিগুলো শিক্ষা করা।
[৩]  মহান আল্লাহ তাআলা যে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাহ সংরক্ষণ করেছেন সে ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন করা এবং সঠিক ধারণা লাভ করা। আর সেটি সম্পন্ন হয়েছে কঠোর পরিশ্রম ও অক্লান্ত চেষ্টা-মেহনতের মাধ্যমে। যেমন আমরা দেখি উম্মাতের হাদীস বিশারদগণ অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দূর্বল হাদীস, সহীহ হাদীস, বানোয়াট হাদীস চিহ্নত করেছেন এবং এগুলো নিরূপনের অত্যান্ত সূক্ষ্ম ও গ্রহনযোগ্য কিছু মূলনীতি প্রনয়ন করেছেন। এটা শুধু এ উম্মাতে মুহাম্মদীই করেছে এবং করছে। অন্য কোন জাতি তাদের নবীর আদর্শ সংরক্ষণের বিষয়ে এমন ভূমিকা অতীতে রাখেনি।
[৪]  অন্তরে আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মুহাব্বতের অনুভূতি জাগ্রত করার চেষ্টা করা। এটা তার অনুপম স্বভাব, চরিত্র, আচার-আচারণ ও বিশেষ বৈশিষ্ট মন্ডিত অবয়ব-আকৃতি সম্পর্কে অধ্যয়ন ও তার সীরাত পাঠের মাধ্যমে অর্জন করা যায়।

‘আল্লাহ’ এবং ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ এক সাথে লেখা। সমস্যা কোথায়?

আমাদের দেশে দেখা যায়, পাশাপাশি ‘আল্লাহ’ এবং ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ মসজিদের মধ্যে, ঘরে, দোকানে, যানবাহন ইত্যাদিতে লিখে রাখা হয়। এটা কি জায়েজ? এ ব্যাপারে সৌদী আরবের অন্যতম সেরা আলেম আল্লামা মুহাম্মাদ বিন সালিহ আল উসাইমীন (রাহ.) কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি যে ফতোয়া দিয়েছেন তা  নিম্নে তুলে ধরা হল:
আল্লামা মুহাম্মদ বিন সালিহ আল উসাইমীন (রাহ:) এর ফতোয়া:
প্রশ্ন: আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। ‘আল্লাহ’ এবং ‘মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ লিখে ছবি আকারে দেয়ালে টাঙ্গীয়ে রাখার বিধান কি? আমরা অনেক সময় দেখি দেয়ালে ‘আল্লাহ’ শব্দ এবং তার পাশে ‘মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম’ লিখে টাঙ্গীয়ে রাখা হয়েছে। অথবা কাপড়ের টুকরা, বই-পুস্তক বা কুরআনের উপর এভাবে লিখে রাখা হয়েছে। এটা কি ঠিক?
উত্তর: না, এটা ঠিক নয়। কারণ এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর সমকক্ষ বানানো হয়। আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলকে চেনে না এমন কোন লোক যদি এই লেখা দেখে তবে নি:সন্দেহে ধারণা করবে এ দুটি নাম সমমর্যাদার অধিকারী। সুতরাং এ অবস্থায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাম মুছে ফেলা আবশ্যক।
এখন বাকি থাকল শুধু ‘আল্লাহ’ শব্দ। কিন্তু এখানেও সমস্যা হল, এটাও সুফীবাদীদের কথা। কারণ, সুফীবাদীরা (কুরআনের ও হাদীসের)  যিকির বাদ দিয়ে শুধু ‘আল্লাহ’ ‘আল্লাহ’ বলে যিকির করে। অত:এব, শুধু আল্লাহ শব্দও মুছে ফেলতে হবে। মোটকথা, ((আল্লাহ)) অথবা ((মুহাম্মাদ)) কোন দেয়ালে, কাপড়ের টুকরা বা অন্য কোথাও লেখা যাবে না।
 এরকম লেখা থাকলে ঘরে বরকত নাযিল হবে এ ধারণা কুরআন-সুন্নাহ বিরোধী। কোথাও নাই যে, এভাবে আল্লাহ ও রাসূলের নাম ঘরে থাকলে বরকত নাযিল হবে। বরং প্রকৃত বরকত হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল এর আদেশ এবং নিষেধকে মনে-প্রাণে গ্রহন করা এবং তদানুযায়ী আমল করা এবং কুরআন-সুন্নাহতে বর্ণিত দুআ ও যিকির সঠিক পদ্ধতিতে নিয়মিত পাঠ করা।  সাহাবায়ে কেরামও তাঁদের নাম কখনো ঝুলিয়ে রাখতেন না। বরং পরবর্তীতে মানুষের মাঝে মূর্খতা ছড়িয়ে পড়ার ফলে এভাবে মানুষ কুরআন-সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন-যাপন বাদ দিয়ে নিজেদের ঘরে, দোকান পাটে এমন কি মসজিদের মধ্যেও বরকত লাভের আশায় এসব লিখে ঝুলিয়ে রাখা শুরু করে। 

পরিশেষে বলব, মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হল, সকল ধরণের শিরক, বিদআত, কুসংস্কার এবং ইসলামের নামে নিজেদের মনগড়া কার্যক্রম থেকে বের হয়ে আসা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের দেখানো পথ ধরে চলা। তবেই দুনিয়ার জীবনে যেমন পাওয়া যাবে আল্লাহর রহমত, বরকত, সুখ-সমৃদ্ধি তেমনি পাওয়া যাবে জাহান্নামের কঠিন শস্তি থেকে পরিত্রাণ।

Tuesday, 22 July 2014

সহজ হজ্জ ও ওমরাহ্‌ নির্দেশিকা


সংকলন: শাইখ মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ্‌ আল কাফী

হজ্জ হলো ইসলামের ৫টি রূকনের সর্বশেষ তথা পঞ্চম রূকন। ইহা একটি ইবাদত যা আত্মিক, মৌখিক, দৈহিক ও আর্থিক ত্যাগ সমন্ময়ে গঠিত। প্রতিটি সামর্থবান ব্যক্তির উপর উহা পালন করা ফরয। কুরআনে এরশাদ হচেছঃ ‘মানুষের উপর আল্লাহ্‌র অধিকার এই যে, যারা এই ঘর পর্যন্ত আসার সমর্থ রাখে তারা ইহার হজ্জ পালন করবে।’ (সূরা আল্‌ ইমরানঃ ৯৭) রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: ‘যে ব্যক্তি (হজ্জ ওমরা করার জন্য) এঘরে আসবে, অত:পর স্ত্রী সহবাসে লিপ্ত হবে না এবং পাপাচারে লিপ্ত হবে না, সে এমন (নিষ্পাপ) অবস্থায় ফিরে আসবে যেমন তার মাতা তাকে ভুমিষ্ট করেছিল।’ (মুসলিম)। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরো বলেন: ‘মসজিদে হারামে এক ছলাত অন্য মসজিদে এক লক্ষ ছালাতের চাইতে বেশী উত্তম।’ (আহমাদ ও ইবনু মাজাহ্‌)। এই গুরুত্বপূর্ণ ইবাদতটি বিশুদ্ধভাবে আদায়ের চেষ্টা করা একান্ত ভাবে অপরিহার্য। এ লক্ষ্যে কুরআন- হাদীছের নির্যাস নিম্ন লিখিত সংক্ষিপ্ত বিষয়গুলি সকলের জন্য অনুসরণীয়ঃ
1) একনিষ্ঠতার সাথে শুধুমাত্র আল্লাহ্‌কে রাজী-খুশী করার জন্য হজ্জ্ব পালন করা।
2) উহা পালনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের তরীকা ও পদ্ধতি অনুসরণ করা।
3) হালাল বা বৈধ উপার্জন থেকে হজ্জ্বব্রত পালন করা।
4) হজ্জ্বের বিধান সমপর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জন করা।
5) যাবতীয় শির্‌ক, বিদআত ও পাপাচার থেকে বিরত থাকা।
হজ্জ ও উমরাহ্‌র কাজগুলি ধারাবাহিকভাবে নিম্নরূপঃ
6) ইহরামের পূর্বে শারীরিকভাবে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা তথা- নাভীমূল, বগলের লোম পরিস্কার করা, নখ কাটা।
7) মিক্কাত থেকে ইহ্‌রাম বাঁধা। (ওয়াজিব)
8) মীকাতে গিয়ে ইহরামের উদ্দেশ্যে প্রথমে গোসল করা।
9) মাথা, দাড়ি বা শরীরে আতর-সুগন্ধি ব্যবহার করা।
10) সেলাই বিহীন দুটি কাপড়ে ইহ্‌রাম বাঁধা। (শুধু পূরুষদের জন্য)
11) কাপড় দুটি সাদা হওয়া উত্তম।
12) হজ্জ্ব বা উমরার উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট মীকাত অতিক্রমের পূর্বে (অন্তরে) নিয়ত করে ইহ্‌রাম বাঁধা। (রুকন)
13) তামাত্তু হজ্জ্বের জন্য প্রথমে উমরাহ্‌ আদায় করা।
14) উমরার ইহ্‌রাম বাঁধার সময় বলাঃ “আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা উমরাতান।”
15) ক্বিরান হজ্জ্বের ইহ্‌রাম বাঁধার সময় বলাঃ “আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান ওয়া উমরাতান।”
16) ইফরাদ হজ্জ্বের ইহ্‌রাম বাঁধার সময় বলাঃ “আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা হাজ্জান।”
17) রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লামের এর পঠিত তালবিয়া জোরে জোরে পাঠ করা।
18) তালবিয়াঃ (لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لاَ شَرِيْكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لاَ شَرِيْكَ لَكَ) ‘লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা, লাব্বাইকা লা-শারীকা লাকা লাব্বাইকা, ইন্নাল হামদা ওয়ান্‌নি’য়মাতা লাকা ওয়াল্‌ মুল্‌ক্‌, লা-শারীকা লাকা’।
19) অজু-গোসল করে পবিত্রতার সহিত মসজিদুল হারামে প্রবেশ করা।
20) মসজিদে হারামে প্রবেশের পূর্বে তালবিয়া বলা বন্ধ করা।
21) তাওয়াফের জন্য সরাসরি হজরে আসওয়াদের দিকে এগিয়ে যাওয়া।
22) তাওয়াফ শুরুর পূর্বে (পুরুষের জন্য) ইযতিবা করা। (ইহরামের কাপড় ডান বগলের নীচ দিয়ে নিয়ে বাম কাধের উপর রাখা) নামাযের সময় উভয় কাঁধ ঢেকে রাখা জরুরী।
23) بسم الله، الله أكبر ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আক্‌বার’ বলে হজরে আসওয়াদকে চুমু দিয়ে বা ইশারা করে তওয়াফ শুরু করা।
24) প্রথম তিন চক্করে রমল করা। (দ্রুত পদে চলা)
25) তাওয়াফ অবস্থায় কোন দু’আ নির্দিষ্ট না করে যে কোন দু’আ যিকির পাঠ করা।
26) আল্লাহ্‌র ঘর বাম দিকে রেখে তওয়াফ করা।
27) হাতিমের বাহির দিয়ে তওয়াফ করা।
28) রোক্‌নে ইয়ামানী সপর্শ করা। তা না পারলে ইঙ্গিত না করেই চলতে থাকা।
29) রোকনে ইয়ামানী এবং হজরে আসওয়াদের মধ্যবর্তী স্থানে এই দোয়া পড়াঃ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাঁও ওয়া ক্কিনা আযাবান্নার।”
30) একাধারে সাত চক্কর পূর্ণ করা। (রুকন)
31) মাকামে ইবরাহীমের পিছনে ২ রাকাত নামায পড়া। (সেখানে সম্ভব না হলে মসজিদুল হারামের যে কোন স্থানে তা আদায় করা।
32) সূরা ফাতিহার পর প্রথম রাকাআতে সূরা কাফেরূন এবং দ্বিতীয় রাকাআতে সূরা ইখলাছ পড়া।

বিদ‘আতের দশটি কুফল


এমন অনেকের সাক্ষাত পাবেন যারা ইসলামী চেতনায় সমৃদ্ধ। কিন্তু বলেন, বিদ‘আতের বিরোধিতায় এত বাড়াবাড়ির কি দরকার? কেহ একটু মীলাদ পড়লে, কুলখানি বা চল্লিশা-চেহলাম পালন কিংবা এ জাতীয় কিছু করলে দ্বীন ইসলামের কি এমন ক্ষতি হয়ে যায়?
আমি একদিন এক মাসজিদের ইমাম সাহেবের বক্তব্য শুনছিলাম। তিনি বলছিলেন শবে মিরাজ উপলক্ষ্যে এ রাতে কোন বিশেষ সালাত, ইবাদাত-বন্দেগী বা সিয়াম নেই। যদি শবে মিরাজ উপলক্ষ্যে কোন ‘আমল করা হয় তা বিদ‘আত হিসাবেই গণ্য হবে। তার এ বক্তব্য শেষ হতে না হতেই কয়েকজন শিক্ষিত শেণীর মুসল্লী বলে উঠলেন, হুজুর এ কি বলেন! রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বতে এ রাতে কিছুকরলে বিদ‘আত হবে কেন? প্রশ্নকারী লোকগুলোযে বিভ্রান্ত বা বিদ‘আতপন্থী তা কিন্তু নয়। তাদের খারাপ কোন উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তারা যা করার ইচ্ছা করেছেন, উহার ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই।
অবশ্যই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহব্বত ঈমানের অঙ্গ। আর সব ধরনের মুহাব্বতেই আবেগ থাকে। রাসূল সাল্লাল্লাহু‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহব্বতেও থাকবে। কিন্তুসেই আবেগ যেন মুহব্বতের নীতিমালা লংঘন না করে। সেই আবেগভরা মুহাব্বত যেন আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ ও সুন্নাহর বিরুদ্ধে ব্যবহৃত না হয়। যদি এমনটি হয় তাহলে বুঝতে হবে যে, রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বতের নামে শয়তান তাকে ধোকায় ফেলেছে।
এ কথাতো মুসলিমদের কাছে দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, খৃষ্টানরা বিদ‘আতী কাজ-কর্ম করে ও তাদের নবীর মুহব্বতে বাড়াবাড়ি করে পথভ্রষ্ট হয়ে গেছে। এ কথা যেমন আল-কুরআনে এসেছে, তেমনি হাদীসেও আলোচনা করা হয়েছে। আমি অতি সংক্ষেপে এখানে বিদ‘আতের কতিপয় পরিণাম সম্পর্কে আলোচনা করছি
(১) বিদআত মানুষকে পথভ্রষ্ট করে।
নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা উম্মতের জন্য নিয়ে এসেছেন তা হল হক্ক। এ ছাড়া যা কিছুধর্মীয় আচার হিসাবে পালিত হবে তা পথভ্রষ্টতা। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : হক আসার পর বিভ্রান্তি ব্যতীত আর কি থাকে? (সূরা ইউনূস, ৩২)
রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : সকল ধরনের বিদ‘আত পথভ্রষ্টতা। (মুসলিম, ইবনে মাজাহ)
(২) বিদ‘আত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের আনুগত্য থেকে মানুষকে বের করে দেয় এবং সুন্নাতের বিলুপ্তি ঘটায়।
কেননা বিদ‘আত অনুযায়ী কেউ ‘আমল করলে অবশ্যই সে এক বা একাধিক সুন্নাত পরিত্যাগ করে। উলামায়ে কিরাম বলেছেন : “যখন কোন দল সমাজে একটা বিদ‘আতের প্রচলন করে, তখন সমাজ থেকে কম করে হলেও একটি সুন্নাত বিলুপ্ত হয়ে যায়।”
আর এটা অভিজ্ঞতায় প্রমাণিত যে, যখনই কোন বিদ‘আত ‘আমলে আনা হয়েছে তখনই সেই স্থান থেকে একটি সুন্নাত চলে গেছে বা গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছে। এ প্রসঙ্গে মুজাদ্দিদ আলফেসানীর মাকতুবাত থেকে উদ্ধৃতি দেয়া যায়। তিনি লিখেছেন : এক ব্যক্তি আমাকে প্রশ্ন করল ‘আপনারা বলেছেন : যে কোন বিদ‘আত নাকি একটি সুন্নাতকে বিলুপ্ত করে। আচ্ছা, যদি মৃত ব্যক্তিকে কাফনের সাথে একটি পাগড়ী পড়িয়ে দেয়া হয় তাহলে কোন সুন্নাতটি বিলুপ্ত হয়? কি কারণে এটা বিদ‘আত বলা হবে?’ আমি জবাবে লিখলাম : অবশ্যই একটি সুন্নাত বিলুপ্ত হয় যদি মৃতের কাফনে পাগড়ী দেয়া হয়। কারণ পুরুষের কাফনের সুন্নাত হল কাপড়ের সংখ্যা হবে তিন। পাগড়ী পড়ালে এ সংখ্যা আর ‘তিন’ থাকেনা, সংখ্যা দাড়ায় ‘চার।’
উদাহরণ হিসাবে আরো বলা যায়, এক ব্যক্তি ঋণগ্রস্থ হয়ে পড়ল। ঋণ পরিশোধ করতে পারছে না। এ সমস্যার জন্য এক পীর সাহেবের কাছে গেল। পীর সাহেব তাকে বললেন, তুমি এক খতম কুরআন বখশে দাও অথবা নির্দেশ দিলেন একটা মীলাদ দাও বা খতমে ইউনূসের ব্যবস্থা কর। সে তাই করল। ফলাফল কি দাড়াল? ঋণ পরিশোধে অক্ষম ব্যক্তির জন্য একটি দু‘আ রয়েছে যা ‘আমল করা সুন্নাত। বিদ‘আত অনুযায়ী ‘আমল করার কারণে সে সেই সুন্নাতটি পরিত্যাগ করল। জানার চেষ্টা করলনা যে, এ ক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি ব্যবস্থা দিয়ে গেছেন। অন্যদিকে সে মিলাদ, কুরআন খতম ইত্যাদি বিদ‘আতী কাজ করে আরও আর্থিক ঋণভারে জর্জরিত হলো।
রামাযানের শেষ দশ দিনের রাতসমূহে রাত জেগে ইবাদাত-বন্দেগী করা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত, যা কেউ অস্বীকার করতে পারে না। কিন্তু ১৫ শাবানে রাত জাগাকে যেমন গুরুত্ব দেয়া হয় তেমনভাবে এ সুন্নাতী ‘আমলের প্রচলন দেখা যায় না। বরং শবে কদরের মূল্যায়ন শবে বরাতকে করা হচ্ছে। ফরয সালাত আদায়ের পর সর্বদা জামাতবদ্ধ হয়ে মুনাজাত করা একটি বিদ‘আত। এটা ‘আমল করার কারণে ফরয সালাত আদায়ের পর যে সকল যিকর-আযকার সুন্নাত হিসাবে বর্ণিত আছে তা পরিত্যাগ করা হয়।
আপনি দেখবেন এভাবে প্রতিটি বিদ‘আত একটি সুন্নাতকে অপসারিত করে উহার স্থান দখল করে নিয়েছে।
(৩) বিদ‘আত আল্লাহর দ্বীনকে বিকৃত করে।
এর জ্বলন্ত উদাহরণ আজকের খৃষ্টান ধর্ম। তারা ধর্মের বিদ‘আত প্রচলন করতে করতে উহার মূল কাঠামো পরিবর্তন করে আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে পথভ্রষ্ট হিসাবে অভিহিত হয়েছে। তাদের বিদ‘আত প্রচলনের কথা আল-কুরআনে উলেখ− করা হয়েছে : আর সন্ন্যাসবাদ! ইহাতো তারা নিজেরাই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় প্রচলন করেছিল। আমি তাদের এ বিধান দেইনি। (সূরা হাদীদ. ২৭)
সন্ন্যাসবাদ তথা বৈরাগ্যবাদের বিদ‘আত খৃষ্টানেরা তাদের ধর্মের প্রবর্তন করেছে। তাদের উদ্দেশ্য ভাল ছিল; উদ্দেশ্য ছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি। কিন্তু ভাল উদ্দেশ্য নিয়ে নিজেদের ইচ্ছামত যে কোন কাজ করলেই তা গ্রহণযোগ্য হয় না। এ জন্য আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের অনুমোদন প্রয়োজন। এভাবে যারা ধর্মের বিদ‘আতের প্রচলন করে তাদের অনেকেরই লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ভাল থাকে। কিন্তু তাতে নাজাত পাওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই। ইয়াহুদী ও খৃষ্টানেরা তাদের ধর্মের অন্য জাতির রসম-রেওয়াজ ও বিদ‘আত প্রচলন করে ধর্মকে এমন বিকৃত করেছে যে, তাদের নবীগণ যদি আবার পৃথিবীতে ফিরে আসেন তাহলে তাদের রেখে যাওয়া ধর্ম তাঁরা নিজেরাই চিনতে পারবেন না।
আমাদের মুসলিম সমাজে শিয়া সম্প্রদায় বিদ‘আতের প্রচলন করে দ্বীন ইসলামকে কিভাবে বিকৃত করেছে তা নতুন করে বর্ণনা করার প্রয়োজন নেই।
(৪) বিদ‘আত ইসলামের উপর একটি আঘাত।
যে ইসলামে কোন বিদ‘আতের প্রচলন করল সে মূলতঃ অজ্ঞ লোকদের মত এ কথা স্বীকার করে নিল যে, ইসলাম পরিপূর্ণ জীবন বিধান নয়, তাতে সংযোজনের প্রয়োজন আছে। যদিও সে মুখে এ ধরনের বক্তব্য দেয় না, কিন্তু তার কাজ এ কথার স্বাক্ষী দেয়। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন : আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম। (সূরা মায়িদা,৩)
(৫) বিদ‘আত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিরুদ্ধে খিয়ানাতের এক ধরনের অভিযোগ।
যে ব্যক্তি কোন বিদ‘আতের প্রচলন করল বা ‘আমল করল আপনি তাকে জিজ্ঞেস করুন “এ কথা বা কাজটি যে ইসলাম ধর্মের পছন্দের বিষয় এটা কি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম জানতেন? তিনি উত্তরে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বলবেন। যদি ‘না’ বলেন তাহলে তিনি স্বীকার করে নিলেন যে, ইসলাম সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম কম জানতেন। আর যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন তাহলে তিনি স্বীকার করে নিলেন যে,আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিষয়টি জানতেন, কিন্তু উম্মাতের মধ্যে প্রচার করেননি। এ অবস্থায় তিনি তাবলীগে শিথিলতা করেছেন। (নাউ‘যুবিল্লাহ!)
(৬) বিদ‘আত মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করে ও ঐক্য সংহতিতে আঘাত করে।
বিদ‘আত মুসলিম উম্মাহর মধ্যে শত্রুতা ও বিবাদ-বিচ্ছেদ সৃষ্টি করে তাদের মারামারি হানাহানিতে লিপ্ত করে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যে, একদল লোক মীলাদ বা মীলাদুন্নবী পালন করল। আরেক দল বিদ‘আত হওয়ায় তা বর্জন বা বিরোধিতা করল। যারা এটা পালন করল তারা প্রচার করতে লাগল যে, অমুক দল আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের জন্মদিনে আনন্দিত হওয়া পছন্দ করে না। তাঁর গুণ-গান করা তাদের কাছে ভাল লাগেনা। তাদের অন্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বত নেই। যাদের অন্তরে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুহাব্বত নেই তারা বেঈমান, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের দুশমন। আর এ ধরনের প্রচারনায় তারা দুটি দলে বিভক্ত হয়েএকে অপরের দুশমনে পরিণত হয়ে হানাহানিতে লিপ্ত হয়ে পড়ল। এভাবে ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই বিদ‘আতকে গ্রহণ ও বর্জনের প্রশ্নে মুসলিম উম্মাহ শিয়া ও সুন্নি এবং পরবর্তী কালে আরো শত দলে বিভক্ত হয়ে গেল। কত প্রাণহানির ঘটনা ঘটল, রক্তপাত হল।
তাই মুসলিম উম্মাহকে আবার একত্র করতে হলে সকলকে কুরআন ও সুন্নাহর দিকে আহ্বান ও বিদ‘আত বর্জনের জন্য অহিংস ও শান্তিপূর্ণপন্থায় পরম ধৈর্য্যের সাথে আন্দোলন করতে হবে। আন্দোলন করতে হবে সকল মানুষ ও মানবতার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালবাসা প্রদর্শন করে । কারো অনুভূতিতে আঘাত লাগে এমন আচরণ করা যাবে না। এ বিশ্বাস রাখতে হবে যে, যা হক ও সত্য তা-ই শুধু টিকে থাকবে। আর যা বাতিল তা দেরীতে হলেও বিলুপ্ত হবে।
(৭) বিদ‘আত ‘আমলকারীর তাওবা করার সুযোগ হয় না।
বিদ‘আত যিনি প্রচলন করেন বা সেই অনুযায়ী ‘আমল করেন তিনি এটাকে এক মহৎ কাজ বলে মনে করেন। তিনি মনে করেন এ কাজে আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্ট হবেন। যেমন আল্লাহ খৃষ্টানদের সম্পর্কে বলেছেন তারা ধর্মের বৈরাগ্যবাদের বিদ‘আত চালু করেছিল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য। যেহেতু বিদ‘আতে লিপ্ত ব্যক্তি বিদ‘আতকে পাপের কাজ মনে করেন না, তাই তিনি এ কাজ থেকে তাওবা করার প্রয়োজন মনে করেন না এবং তাওবা করার সুযোগও হয় না। অন্যান্য পাপের বেলায় কমপক্ষে যিনি পাপে লিপ্ত হন তিনি এটাকে অন্যায় মনে করেই করেন। পরবর্তীতে তার অনুশোচনা আসে, এক সময় তাওবা করে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা লাভ করেন। কিন্তুবিদ‘আতে লিপ্ত ব্যক্তির এ অবস্থা কখনো হয় না।
(৮) বিদ‘আত প্রচলনকারী রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের শাফাআত পাবে না।
রাহমাতুলি−ল আলামীন সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর গুনাহগার উম্মাতের শাফায়াতের ব্যাপারে হাশরের ময়দানে খুব আগ্রহী হবেন । আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অনুমতি লাভ করার পর তিনি বহু গুনাহগার বান্দা-যাদের জন্য শাফাআত করতে আল্লাহ তা‘আলা অনুমতি দিবেন-তাদের জন্য শাফাআত করবেন। কিন্তু বিদ‘আত প্রচলনকারীর জন্য তিনি শাফাআত করবেন না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : শুনে রেখ! হাউজে কাউছারের কাছে তোমাদের সাথে আমার দেখা হবে। তোমাদের সংখ্যার আধিক্য নিয়ে আমি গর্ব করব। সেই দিন তোমরা আমার চেহারা মলিন করে দিওনা। জেনে রেখ! আমি সেদিন অনেক মানষু কে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাব। কিন্তু তাদের অনেককে আমার থেকে দূরে সরিয়ে নেয়া হবে। আমি বলব : হে আমার প্রতিপালক! তারা তো আমার প্রিয় সাথী-সঙ্গী, আমার অনুসারী। কেন তাদের দূরে সরিয়ে দেয়া হচ্ছে? তিনি উত্তর দিবেন : আপনি জানেন না যে, আপনার চলে আসার পর তারা ধমের্র মধ্যে কি কি নতুন বিষয় আবিস্কার করেছে। (ইবনে মাজাহ)
অন্য এক বর্ণনায় আছে এর পর আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজেই তাদের উদ্দেশে বলবেন : দূর হও! দূর হও!!
(৯) বিদ‘আত মুসলিম সমাজে কুরআন ও হাদীসের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়।
কুরআন ও সুন্নাহ হল মুসলিম উম্মাহ ও ইসলামের রক্ষা কবচ। ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বের একমাত্র উপাদান। তাইতো বিদায় হজ্জেও নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন : আমি তোমাদের জন্য দুটি জিনিস রেখে যাচ্ছি যতক্ষণ তোমরা তা আঁকড়ে রাখবে ততক্ষণ বিভ্রান্ত হবে না।
বিদ‘আত অনুযায়ী ‘আমল করলে কুরআন ও সুন্নাহর মর্যাদা মানুষের অন্তর থেকে কমে যায়। ‘যে কোন নেক ‘আমল কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত হতে হবে’ – এ অনুভূতি মানুষের অন্তর থেকে ধীরে ধীরে লোপ পেতে থাকে। তারা কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি বাদ দিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তি, পীর-মাশায়েখ ও ইমামদের উদ্ধৃতি দিয়ে থাকে।
(১০) বিদ‘আত প্রচলনকারী অহংকারের দোষে দুষ্ট হয়ে পড়ে ও নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে দ্বীনকে ব্যবহার ও বিকৃত করতে চেষ্টা করে।
বিদ‘আত প্রচলনকারী তার নিজ দলের একটি আলাদা কাঠামো দাঁড় করিয়ে ব্যবসায়িক বা আর্থিক সুবিধা লাভের জন্য এমন কাজের প্রচলন করে থাকে যা সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মীয় রূপ লাভ করলেও কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত হয় না। কারণ সেই কাজটা যদি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা সমর্থিত হয় তাহলে তার দলের আলাদা কোন বৈশিষ্ট থাকে না। কেননা কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত ‘আমল সকল মুসলিমের জন্যই প্রযোজ্য। তাই সে এমন কিছুআবিস্কার করতে চায় যার মাধ্যমে তার দলের আলাদা পরিচয় প্রতিষ্ঠা করা যায়।
এ অবস্থায় যখন হাক্কানী উলামায়ে কিরামগণ এর প্রতিবাদ করেন বা এ কাজটি চ্যালেঞ্জ করেন তখন তার ঔদ্ধত্য বেড়ে যায়। নিজেকে সে কুতুবুল আলম, ইমাম-সম্রাট, হাদীয়ে উম্মাত, রাহবারে মিল্লাত, যিল্লুর রহমান বলে দাবী করতে থাকে। প্রচার করতে থাকে এ দুনিয়ায় সে’ই একমাত্র হক পথে আছে, বাকী সবাই ভ্রান্ত।

কবর, মাযার ও মৃত্যু সম্পর্কীত কতিপয়


 আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ,
আকাশে ঘন কালো মেঘের আড়ালে অনেক সময় সূর্য্যের কিরণ ঢাকা পড়ে যায়। মনে হয় হয়ত আর সূর্য্যের মুখ দেখা যাবে না। কিন্তু সময়ের ব্যাবধানে নিকশ কালো মেঘের বুক চিরে আলো ঝলমল সূর্য্য বের হয়ে আসে। ঠিক তেমনি বর্তমানে আমাদের সমাজের দিকে তাকালে দেখা যাবে বিদ’আতের কালিমা ইসলামের স্বচ্ছ আসমানকে ঘিরে ফেলেছে। যার কারণে কোন কাজটা সুন্নাত আর কোন কাজটা বিদ’আত তা পার্থক্য করাটাই অনেক মানুষের জন্য কঠিন হয়ে গেছে। যা হোক শত রকমের বিদ’আতের মধ্য থেকে এখানে শুধু কবর, মাযার ও মৃত্যু সম্পর্কীত কয়েকটি প্রসিদ্ধ বিদ’আত তুলে ধরা হল। যদিওএ সম্পর্ক আরও অনেক বিদ’আত আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। যদি এতে আমাদের সমাজের বিবেকবান মানুষের চেতনার দুয়ারে সামান্য আঘাত হানে তবেই এ প্রচেষ্টা সার্থক হবে।
১) মৃত্যুবার্ষিকী পালন করা:
আজকেআমাদের সমাজে পিতা-মাতা, দাদা-দাদী সন্তান-সন্ততি ইত্যাদির মৃত বার্ষিকী অত্যন্ত জমজমাট ভাবে পালন করা হয়ে থাকে। সেখানে অনেক টাকা-পয়সা খরচ করে বিশাল খাবার-দাবারের আয়োজন করা হয়। যদিও গরীব শ্রেণীর চেয়ে অর্থশালীদের মধ্যে এটা পালন করার ব্যাপারটি বেশি চোখে পড়ে কিন্তু আমরা কজনে জানি বা জানার চেষ্টা করি যে, মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা কারো মৃত্য উপলক্ষ্যে শোক দিবস পালন পালন করা জঘন্যতম বিদ্‌’আত? অথচ ইসলামের দৃষ্টিতে এ উপলক্ষ্যে শামিয়ানা টাঙ্গানো, ঘর-বাড়ী সাজানো, আলোকসজ্জা করা এবং কুরআন তেলাওয়াত বা বিভিন্ন তাসবীহ-ওযীফা ইত্যাদি পাঠ করে সেগুলোর সাওয়াব মৃতব্যক্তির রূহের উদ্দেশ্যে বখশানো বিদ’আত। আব্দুল্লাহ ইব্‌ন উমর (রাঃ) বলেন, “মৃত ব্যক্তিকে ছায়া দিতে পারে কেবল তার আমল; তাঁবু টানিয়ে ছায়া দেয়া সম্ভব নয়।”
অনুরূপভাবে জানাযা দিয়ে ফিরে আসার পর জানাযায় অংশগ্রহণকারীদেরকে, যে সমস্ত মানুষ শোক জানাতে আসে তাদেরকে অথবা ফকীর-মিসকীনদের খানা খাওয়ানো, বৃহস্পতিবার, মৃত্যু বরণ করার চল্লিশ দিন পর অথবা মৃত বার্ষিকীতে খাওয়ার অনুষ্ঠান করা, মীলাদ মাহফিল করা, ‘চার কুল’ এর ওযিফা পড়া ইত্যাদি সবই হারাম এবং বিদ’আতী কাজ। কারণ, নবী (সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সুন্নত এবং সাহাবীগণের কার্যক্রমে এ সব কাজের কোন প্রমাণ নেই। এ সব জীবিকা উপার্জন, অর্থ অপচয় এবং ধ্বংশের মাধ্যম ছাড়া আর কিছুই নয়।
২) চল্লিশা পালন:
মানুষ মারা যাওয়ার চল্লিশ দিন বিদ্‌আতঃপরে মৃতের চল্লিশা উপলক্ষ্যে খানার আয়োজন করা অথবা চল্লিশদিন পর্যন্ত প্রত্যেক বৃহস্পতিবার শোক পালন করা, মৃত্যুর পর প্রথম ঈদকে বিশেষভাবে শোকদিবস হিসেবে পালন করা, সে দিন কুরআনের হাফেয বা কারী সাহেবদের ডেকে কুরআন পড়ানো এবং শোক পালনের জন্য লোকজন একত্রিত করা ইত্যাদি সবই বিদ’আত এবং হারাম।
ইমাম আহমদ বিন হাম্বল এবং ইমাম ইব্‌ন মাজাহ (রহঃ) ছহীহ সনদে আব্দুল্লাহ আল বাজালী (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন “আমরা মৃত্যুবরণকারী সাহাবীগনের কাফন-দাফন সম্পন্ন করে মৃতের বাড়ীতে একত্রিত হওয়া এবং তাদের পক্ষ থেকে খাবারের আয়জন করাকে ‘নাওহা’ এর মতই মনে করতাম।” ইমাম আহমদ বলেন, “এটি একটি জাহেলী কাজ।” নাওহা অর্থঃ কারো মৃত্যেুতে চিৎকার করে কান্নাকাটি করা, শরীরে আঘাত করা, চুল ছেড়া, জামা-কাপড় ছেড়া …ইত্যাদি।  এসব কাজ করা ইসলামে হারাম।
৩) নির্দিষ্ট কোন দিনে কবর যিয়ারতের জন্য একত্রিত হওয়া, হাফেজদের দিয়ে কুরআন খতম করিয়ে পারিশ্রমিক দেয়া ইত্যাদি।
ঈদ বা জুমার দিন পুরুষ-মহিলা একসাথে বা আলাদা আলাদাভাবে কবরের পাশে একত্রিত হওয়া, খানা বিতরণ অথবা কিছু তথাকথিত মৌলোভী বা কুরআনের হাফেজদেরকে একত্রিত করে কুরআন পড়িয়ে তাদেরকে পারিশ্রমিক দেয়া ইত্যাদি কাজ সুস্পষ্ট বিদ’আত এবং নাজায়েয।
কবর যিয়ারতের জন্য জুমা বা ঈদের দিনের বিশেষ কোন বৈশিষ্ট প্রামাণিত নয়। অনুরূপভাবে কাবরের পাশে কুরআন পড়া বা পড়ানো একাটি ভিত্তিহীন কাজ। একে জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করা আরও বেশি অন্যায়।
৪) সবীনা পাঠ:
রমাযান বা অন্য মাসে সারারাত ধরে কুরআন খতম করানো এবং এজন্য বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা রাসলুল্লাহ (সাল্লাল্ল্ল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল্লাম) এর শিক্ষা এবং সাহাবায়ে কেরামের নীতি বিরুদ্ধ কাজ। নির্ভরযোগ্য কোন কিতাবে এর দলীল নেই।
শরীয়তের দাবী হল, আমরা নিজেরা এ কুরআন পাঠ করব, নিজেদের মধ্যে তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করব এবং কুরআনের মর্ম-উদ্দেশ্য বুঝার জন্য গবেষণা করব।
রাসূল (সাল্লাল্ল্ল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্ল্লাম) এর নিয়ম ছিল, তিনি রমাযানের শেষ দশকে ইবাদত-বন্দেগীর জন্য কোমর বেঁধে নামতেন, আর বাড়ীর সবাইকে জাগিয়ে রাত জাগরণ করাতেন (বুখারী ও মুসলিম)। কিন’, কুরআনের সবীনা পড়া করা অথবা হাফেজ সাহেবদের ডেকে অর্থের বিনিময়ে কুরআন পড়ানোর কোন প্রমাণ নেই।

কবর পাকা করা



সকল প্রশংসা একমাত্র মহান রাব্বুল আলামীনের জন্যে, যিনি জগত সমূহের একচ্ছত্র মালিক। অজস্র শান্তির ধারা বর্ষিত হোক নবীকুল শিরোমনী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম, তাঁর পরিবারবর্গ এবং তাঁর সকল অনুসারীদের উপর। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে কবর পাকা করা, চুনকাম করা, কবর উঁচু করার প্রবনতা দেখা যায়। বিশেষ করে আমাদের দেশ বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্থানে এ ধরণের কর্মকান্ড খুবই বেশী। প্রতিনিয়ত তা বেড়েই চলছে। মানুষের ধারণা হল এ সমস্ত কাজ শরীয়ত সম্মত এবং এতে ছোয়াব রয়েছে। তাই দেখা যায় করবস্থানে, রাস্তার আশে-পাশে, চৌরাস্তায় ও বটগাছ তলায় কবর পাকা করে, চুনকাম করে, তাতে উন্নত নেমপ্লেট ব্যবহার করে মৃত্যু ব্যক্তির জন্ম, মৃত্যু তারিখ ও বিভিন্ন বানী লিখে রাখা হয়। এ জাতীয় সকল কাজ শরীয়ত বিরোধী। শরীয়তে এর হুকুম হল বিদআত। কারণ এ গুলো করার পিছনে ইসলামী শরীয়তে কোন দলীল নেই, বরং এ গুলো থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে শরীয়ত কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। বিশিষ্ট সাহাবী জাবের (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন,
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يُجَصَّصَ الْقَبْرُ وَأَنْ يُقْعَدَ عَلَيْهِ وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهِ.
“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবরে চুন কাম করা, তার উপর বসা এবং তার উপর বিল্ডিং নির্মান করতে নিষেধ করেছেন। (মুসলিম)
এ হাদীস দ্বারা স্পষ্ট প্রমাণ হল যে, কবরে প্লাস্টার লাগানো, চুন কাম করা, পাকা করা, কবরের উপর বিল্ডিং ও গম্বুজ নির্মাণ করা কঠোর ভাবে নিষেধ। তারা বলে থাকেন আমরা সৌন্দর্য প্রকাশ ও কবরকে হেফাযতের জন্য এ গুলো করে থাকি। জেনে রাখুন সোন্দর্য প্রকাশের জন্য হোক, মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য হোক কিংবা হেফাযতের জন্য হোক, তা শরীয়তে জঘন্যতম বিদআত। এ গুলো করার পিছনে কোন দলীল নেই।

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...