Saturday, 5 September 2026

কুরআন কি আল্লাহর সৃষ্ট, নাকি অসৃষ্ট কালাম? তিলাওয়াতের আওয়াজ বা কণ্ঠস্বর, কুরআন লেখার কাগজ, কালি ইত্যাদি বিষয়ে সঠিক আকিদা কী?

 


প্রশ্ন: কুরআন মাজিদের শব্দ ও অর্থ কি সৃষ্ট, নাকি আল্লাহর অসৃষ্ট কালাম? তিলাওয়াতের আওয়াজ ও লেখার কাগজ ইত্যাদি বিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ-এর আকিদা কী?


উত্তর:

মহাগ্রন্থ কুরআন মহান আল্লাহর কালাম (বাণী), যা তাঁর সিফাত বা গুণ। কুরআনের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ এবং তার অর্থ—সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং অসৃষ্ট। ইমাম ইবনে কুদামা আল মাকদিসি (রহ.) তাঁর "লুমআতুল ই'তিকাদ" গ্রন্থে বলেন:


مُنَزَّلٌ غَيْرُ مَخْلُوقٍ، مِنْهُ بَدَأَ وَإِلَيْهِ يَعُودُ


"(কুরআন আল্লাহর নিকট থেকে) অবতীর্ণ, অসৃষ্ট; তাঁর থেকে শুরু হয়েছে এবং তাঁর দিকেই ফিরে যাবে।" [লুমআতুল ই'তিকাদ, পৃষ্ঠা: ১৮]


এই বিশুদ্ধ আকিদাটি মূলত দুটি ভ্রান্ত মতবাদকে খণ্ডন করে:



◈ মুতাজিলা ও জাহমিয়াদের মত, যাদের আকিদা হলো, কুরআন (শব্দ ও অর্থ উভয়ই) সৃষ্ট।

◈ পরবর্তী কিছু কালাম-শাস্ত্র বা যুক্তিবিদ (আশআরি-মাতুরিদি মতাবলম্বীদের একাংশ)-এর মত, যারা বলে আমরা মুখে যে কুরআন তিলাওয়াত করি তা প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর আসল কালাম নয়; বরং আল্লাহর আসল কালাম হলো কেবল একটি অদৃশ্য "অর্থ" (কালামে নাফসি বা আল্লাহর আত্মিক বাণী)। তাদের ধারণা অনুযায়ী, আমরা মুখে যে কালাম পাঠ করি তা সেই আসল অর্থের একটি মানবীয় প্রকাশ বা অনুবাদ মাত্র, যা সৃষ্ট।


আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ ও সালাফদের অবস্থান ছিল এর বিপরীত। তাঁরা বলেন, আল্লাহর কালাম শুধু নিছক কোনও অদৃশ্য অর্থ নয়; বরং কুরআন তার অক্ষর, শব্দ ও অর্থ—সকল দিক থেকেই আল্লাহর প্রকৃত কালাম এবং তা অসৃষ্ট।


এ বিষয়ে শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বায (রহ.) বলেন:


فَالْقُرْآنُ كُلُّهُ كَلَامُ اللَّهِ، مُنَزَّلٌ غَيْرُ مَخْلُوقٍ، مِنْهُ بَدَأَ وَإِلَيْهِ يَعُودُ بِحُرُوفِهِ وَمَعَانِيهِ جَمِيعًا


"সম্পূর্ণ কুরআন আল্লাহর কালাম, অবতীর্ণ, অসৃষ্ট—হরফ ও অর্থসহ সবকিছুই তাঁর থেকে শুরু হয়ে তাঁর দিকে ফিরে যাবে।" [ফতোয়া নং: ১০১৫২, শাইখ ইবনে বায-এর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট]


❑ তিলাওয়াতের আওয়াজ বা কণ্ঠস্বর ও কুরআন লেখার কাগজ, কালি ইত্যাদি প্রসঙ্গে:


এখানে একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য বোঝা জরুরি, যা আহলুস সুন্নাহর ইমামগণ স্পষ্ট করেছেন:


◈ যা তিলাওয়াত করা হয় এবং যা মুসহাফে (কুরআনে) লেখা আছে (অর্থাৎ কুরআনের শব্দমালা) তা অবশ্যই মহান আল্লাহর কালাম। এবং তা অসৃষ্ট।


◈ যে মাধ্যমে তা প্রকাশ পাচ্ছে (মানুষের কণ্ঠস্বর, উচ্চারণ-ক্রিয়া, কাগজ ও কালি): এগুলো বান্দার কর্ম এবং সৃষ্ট বস্তু।


আহলুস সুন্নাহর একটি প্রসিদ্ধ আকিদা হলো, أَفْعَالَ الْعِبَادِ مَخْلُوقَةٌ "বান্দার কর্ম মাখলুক বা সৃষ্ট।"


ইমাম বুখারি (রহ.) বলেন,


"حَرَكَاتُهُمْ وَأَصْوَاتُهُمْ وَاكْتِسَابُهُمْ وَكِتَابَتُهُمْ مَخْلُوقَةٌ، فَأَمَّا الْقُرْآنُ الْمَتْلُوُّ الْمُبِينُ الْمُثْبَتُ فِي الْمَصَاحِفِ الْمَسْطُورُ الْمَكْتُوبُ الْمَوْعَى فِي الْقُلُوبِ فَهُوَ كَلَامُ اللَّهِ لَيْسَ بِخَلْقٍ، قَالَ اللَّهُ: (بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ)". وَقَالَ إِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ: "فَأَمَّا الْأَوْعِيَةُ فَمَنْ يَشُكُّ فِي خَلْقِهَا؟" قَالَ اللَّهُ تَعَالَى: (وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ * فِي رَقٍّ مَنْشُورٍ).

وَقَالَ: (بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ * فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ).

فَذَكَرَ أَنَّهُ يُحْفَظُ وَيُسْطَرُ. قَالَ: (ن ۚ وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ).


"তাদের (মানুষের) নড়াচড়া, আওয়াজ, অর্জন ও লেখা—সবকিছুই সৃষ্ট। পক্ষান্তরে, যে কুরআন মুখে তিলাওয়াত করা হয়, স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়, মুসহাফসমূহে সুরক্ষিত ও লিপিবদ্ধ থাকে এবং মানুষের অন্তরে সংরক্ষিত থাকে—তা হলো স্বয়ং আল্লাহর কালাম; তা কোনোভাবেই সৃষ্ট নয়।"


আল্লাহ তাআলা বলেন: (بَلْ هُوَ آيَاتٌ بَيِّنَاتٌ فِي صُدُورِ الَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ) "বরং এটি সুস্পষ্ট আয়াত, যা ঐ সকল লোকের হৃদয়পটে সংরক্ষিত যাদেরকে ইলম প্রদান করা হয়েছে।" [সূরা আনকাবুত: ৪৯]


ইসহাক ইবনে ইব্রাহিম (রহ.) বলেছেন: "পক্ষান্তরে আধার বা সংরক্ষকসমূহ (যেমন কণ্ঠ, বুক, কাগজ ইত্যাদি) যে সৃষ্ট—এ বিষয়ে কে সন্দেহ করবে?"


আল্লাহ তাআলা বলেন: (وَكِتَابٍ مَسْطُورٍ * فِي رَقٍّ مَنْشُورٍ) "লিখিত কিতাবের কসম, যা উন্মুক্ত চামড়ায় লিপিবদ্ধ।" [সূরা তূর: ২-৩]


তিনি আরও বলেন: (بَلْ هُوَ قُرْآنٌ مَجِيدٌ * فِي لَوْحٍ مَحْفُوظٍ) "বরং এটি মর্যাদাবান কুরআন, যা সুরক্ষিত লাওহে মাহফুজে রয়েছে।" [সূরা আল-বুরুজ: ২১-২২]


মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন যে, কুরআন সুরক্ষিত রাখা হয় এবং লিপিবদ্ধ করা হয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন: (ن ۚ وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ) "নুন। কলমের এবং তারা যা লেখে তার কসম।" [সূরা কালাম: ১]


[উৎস: ইমাম বুখারি, খালকু আফআলিল ইবাদ (বান্দার কর্মসমূহ সৃষ্ট)]


অর্থাৎ আমরা যখন কুরআন পড়ি বা লিখি তখন আমাদের জিহ্বার নড়াচড়া, কণ্ঠের আওয়াজ, হাত দিয়ে লেখার কাজ এবং কাগজ-কালির ব্যবহার—এ সবকিছুই মানুষের কর্ম এবং তা সৃষ্ট। কিন্তু এই সৃষ্ট মাধ্যমগুলোর সাহায্যে আমরা যা মুখে উচ্চারণ করি (তিলাওয়াত করি), গ্রন্থকারে লিখে রাখি এবং হৃদয়পটে ধারণ করি—সেই মূল কুরআন হলো স্বয়ং আল্লাহর কালাম, যা কোনোভাবেই সৃষ্ট নয়।


-ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল (রহ.) সতর্ক করে বলেছেন:


مَنْ قَالَ: لَفْظِي بِالْقُرْآنِ مَخْلُوقٌ فَهُوَ جَهْمِيٌّ، وَمَنْ قَالَ: غَيْرُ مَخْلُوقٍ فَهُوَ مُبْتَدِعٌ


"যে বলে, আমার কুরআন-উচ্চারণ সৃষ্ট, সে জাহমি; আর যে বলে তা নিরঙ্কুশভাবে অসৃষ্ট, সে বিদআতি।" [আস সুন্নাহ: আবদুল্লাহ ইবনে ইমাম আহমদ (১/১৬৫); আস সুন্নাহ: আল খল্লাল; দারউ তাআরিযিল আকল ওয়ান নাকল: ইবনে তাইমিয়াহ (১/২৬১)]


এর কারণ হলো, "আমার উচ্চারণ সৃষ্ট" বললে কুরআনকেও সৃষ্ট বলে ধারণা করার আশঙ্কা থাকে। আবার "আমার উচ্চারণ অসৃষ্ট" বললে মানুষের কণ্ঠস্বরকেও আল্লাহর অসৃষ্ট গুণের সমতুল্য ভাবার ভুল হতে পারে। তাই সালাফগণ ঢালাওভাবে এমন বাক্য ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতেন।

❑ সারাংশ:

◈ কুরআনের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ এবং তার অর্থ—সবকিছুই আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ এবং অসৃষ্ট। ◈ কুরআনের কাগজ, কালি এবং তিলাওয়াতের ক্ষেত্রে আমাদের কণ্ঠস্বর ইত্যাদি সৃষ্ট।

আল্লাহু আলাম।

-আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি

No comments:

Post a Comment

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...