একথায় কোন সন্দেহ নাই যে, বর্তমান সময়ে মোবাইল ফোন অত্যন্ত প্রয়োজনীয় একটি প্রযুক্তিগত মাধ্যম। এটি জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে, এ ছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ মানুষের জীবন যাপন কষ্টসাধ্য বা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কারণে ইসলামিক দৃষ্টি থেকে এই মোবাইল ফোন ব্যবহারের মূলনীতি এবং শর্তাবলী জানা অপরিহার্য।
📱নিচে মোবাইল ফোন ব্যবহারের শর্তাবলী এবং মূলনীতিগুলো তুলে ধরা হলো:
▪️১. বৈধ এবং কল্যাণকর কাজে ব্যবহার করা:
মোবাইল ফোন আল্লাহর দেওয়া এক বড় নেয়ামত। কিন্তু এর ব্যবহারই নির্ধারণ করে দেয় আমাদের গন্তব্য—জান্নাত নাকি জাহান্নাম। এর সঠিক ব্যবহারে আমরা যেভাবে দ্বীন ও দুনিয়ার বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশাল কল্যাণ অর্জন করতে পারি তেমনি এর অপব্যবহারে জীবনে নেমে আসতে পারি চরম বিপর্যয়, বিশৃঙ্খলা এবং অন্ধকার।
যে প্রযুক্তি দিয়ে আমরা কুরআন তিলাওয়াত, ইলম অর্জন, ইসলামের প্রচার-প্রসার, আত্মীয়তার হক আদায় কিংবা জরুরি প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারি সেই প্রযুক্তিই যদি হারাম কাজে লিপ্ত হওয়ার মাধ্যম হয়ে ওঠে তবে তা ইহকাল ও পরকাল—উভয়কেই ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।
আমাদের সমাজের দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেকেই এই মোবাইলকে গিবত, চোগলখুরি, হিংসা-বিদ্বেষ ছড়ানো এবং মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নষ্ট করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।
অনেকেই এর মাধ্যমে অবৈধ সম্পর্ক ও পরকীয়ায় লিপ্ত হচ্ছে। এতে ধ্বংস হচ্ছে অসংখ্য পারিবারিক বন্ধন এবং সমাজে সৃষ্টি হচ্ছে রক্তপাত, হত্যাকাণ্ড সহ নানা বিশৃঙ্খলা।
এছাড়াও মোবাইল ফোনকে অশ্লীলতার প্রসার, গুজব এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি, নিরপরাধ ব্যক্তিকে হুমকি-ধমকি দেওয়া এবং অবৈধ চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। এগুলো কেবল ধর্মীয় দৃষ্টিতেই হারাম নয় বরং সামাজিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং আইনের চোখে দণ্ডনীয় অপরাধ।
অনেক যুবক অনলাইন ভিত্তিক জুয়া বা বেটিংয়ের মতো মরণফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে। অথচ এগুলো সুস্পষ্ট হারাম এবং কবিরা গুনাহ।
আজকের দিনে অনলাইন গেমস, সোশ্যাল মিডিয়া, রিলস কিংবা অন্তহীন নাটক-সিনেমা মানুষকে এমন এক কৃত্রিম নেশায় ডুবিয়ে রেখেছে, যা তার জীবনের মূল্যবান সময়কে তিলে তিলে ধ্বংস করছে। বাস্তবতার চেয়ে ভার্চুয়াল জগত নিয়ে পড়ে থাকাটা এখন অনেকের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কিন্তু এর পরিণাম মারাত্মক ভয়াবহ। যেমন:
১. মোবাইলে ডুবে থেকে সালাতের মতো আবশ্য পালনীয় ইবাদত, কুরআন তেলাওয়াত কিংবা জ্ঞান অর্জনের মতো মহৎ কাজগুলো আজ অনেকের কাছে গৌণ হয়ে পড়েছে। জিকির-আজকার তো দূরের কথা রবের স্মরণের জন্য এক মুহূর্ত সময় বের করার মানসিকতাটুকুও অনেকে হারিয়ে ফেলেছেন।
২. এই আসক্তি অনেক মানুষকে এতটাই অন্ধ করে দিচ্ছে যে, সে নিজের পরিবার, স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি দায়িত্ব পালনেও চরম অবহেলা প্রদর্শন করছে। যে সময়টা তার স্ত্রী-পরিবারকে দেওয়ার কথা, যে সময়টা সন্তানদের লালন-পালন ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য ব্যয় করার কথা তা সে নিঃশেষ করছে অর্থহীন স্ক্রলিং আর গেমিংয়ের পেছনে।
এটি একটি বিরাট সামাজিক অবক্ষয়। ধর্মীয় ও সামাজিক—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই এ ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ প্রত্যাখ্যানযোগ্য।
তাই সতর্ক হোন। নিজের সময়ের প্রতিটি সেকেন্ডের হিসাব আল্লাহর কাছে দিতে হবে—এই অনুভূতিই হোক মোবাইল ব্যবহারের মূল চালিকাশক্তি।
▪️২. মোবাইল ফোন ব্যবহারে সামাজিক শিষ্টাচার রক্ষা:
মোবাইল ফোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে সামাজিক শিষ্টাচার রক্ষা করা একজন সভ্য ও দায়িত্বশীল মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
জনসম্মুখে মোবাইল ব্যবহারের সময় নিচের বিষয়গুলো আমাদের ব্যক্তিত্ব ও মার্জিত আচরণের প্রতিফলন ঘটায়:
১. পরিবার, বন্ধু-বান্ধব বা সহকর্মীদের সাথে আড্ডা দেওয়ার সময় বা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার মাঝে মোবাইলে ডুবে থাকা শিষ্টাচার হীনতা। এটি উপস্থিত ব্যক্তিদের বুঝিয়ে দেয় যে, আপনি তাদের চেয়ে আপনার ডিভাইসের স্ক্রিনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাই সামাজিক পরিবেশে থাকাকালীন মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের অত্যন্ত সচেতন ও সংযমী হওয়া প্রয়োজন।
২. পাবলিক প্লেসে কথা বলার সময় চিৎকার করে বা চেঁচিয়ে কথা বলা অত্যন্ত অশোভন। বিশেষ করে জনাকীর্ণ স্থানে বা গণপরিবহনে উচ্চস্বরে ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক আলাপ চালিয়ে যাওয়া অন্যদের জন্য বিরক্তির কারণ হয়।
৩. অনেকে রাগের মাথায় জনসম্মুক্ষে ফোনে গালাগালি বা কটু ভাষা ব্যবহার করেন যা একজন মানুষের ব্যক্তিত্ব ও রুচিকে সবার সামনে নিচু করে দেয়।
মনে রাখবেন, আপনার প্রতিটি আচরণই আপনার শিক্ষা ও রুচির পরিচয় বহন করে। প্রযুক্তির অতি-ব্যবহার যেন আপনার ভেতরের মানবিক সৌজন্যবোধকে বিলীন করে না দেয়।
৪. কোনো মাহফিল, মজলিস, সভা বা সেমিনারে উপস্থিত থাকা অবস্থায় কিংবা কারো সাথে আলাপচারিতার সময় মোবাইলে ডুবে থাকা কেবল প্রযুক্তির অপব্যবহার নয় বরং এটি রীতিমতো সৌজন্যবোধ পরিপন্থী এবং বেয়াদবি।
যখন আপনি কারো সাথে সামনাসামনি কথা বলছেন বা কোনো গুরুত্বপূর্ণ আলোচনায় বসে আছেন তখন মোবাইলে গেম খেলা, রিলস দেখা বা বারবার ভিডিও কল রিসিভ করা—এই প্রতিটি কাজই আপনার সামনে থাকা মানুষটিকে ছোট করার নামান্তর। আপনার এই আচরণ স্পষ্ট করে দেয় যে, ওই ব্যক্তি বা মজলিস আপনার কাছে মোবাইল ফোনের ভার্চুয়াল জগত থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ। অথচ ইসলামের শিক্ষা হলো, যে ব্যক্তি আপনার সাথে কথা বলছে বা যে মজলিসে আপনি উপস্থিত আছেন তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু দেওয়া।
প্রযুক্তির নেশায় পড়ে যেন আমরা আমাদের মানবিকতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার সম্পর্কগুলোকে নষ্ট না করি, সেদিকে বিশেষ খেয়াল রাখা একান্ত প্রয়োজন।
৫. মসজিদ, দ্বীনি মাহফিল বা হাসপাতালের মতো জায়গাগুলোর একটি নিজস্ব গাম্ভীর্য ও পবিত্রতা রয়েছে।
মসজিদ আল্লাহর ঘর, দ্বীনি আলোচনা জ্ঞান অর্জনের কেন্দ্র, আর হাসপাতাল যেখানে মানুষ শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণায় শান্তি খোঁজে—এই স্থানগুলোতে মোবাইল ফোনের যথেচ্ছ ব্যবহার কেবল অসৌজন্যমূলক নয় বরং চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা।
এসব সংবেদনশীল স্থানে মোবাইল ফোন সাইলেন্ট বা ভাইব্রেট মুডে না রাখা কেবল আপনার উদাসীনতাই প্রকাশ করে না বরং এটি অন্যের ইবাদত, মনোযোগ কিংবা বিশ্রামে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটায়।
তাই এই জায়গাগুলোতে প্রবেশের সাথে সাথেই ফোনের সাউন্ড বন্ধ করে দেওয়া উচিত।
৬. অন্যদের সাথে আলাপকালে অনুমতি ছাড়া লাউড স্পিকার ব্যবহার করা শিষ্টাচার বহির্ভূত এবং নৈতিকতার পরিপন্থী।
ফোনে কথা বলার সময় অপর পক্ষের অজান্তে তার একান্ত কথা অন্যদের শোনানো—এটি বিশ্বাস ভঙ্গ ও গিবতের শামিল।
৭. মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বা প্রাইভেসি রক্ষা করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। যদি না সেই কথোপকথনে এমন কিছু থাকে যা অন্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে তবে বিনা অনুমতিতে কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা কল রেকর্ড করা—কোনোটাই বৈধ নয়।
৮. রিংটোন ব্যবহারের ক্ষেত্রেও আমাদের রুচিবোধ ও সচেতনতার পরিচয় দেওয়া প্রয়োজন। অনেকেই শখ করে রিংটোন হিসেবে উদ্ভট শব্দ, উচ্চস্বরে গান-বাজনা বা অসংলগ্ন মিউজিক ব্যবহার করেন, যা জনসম্মুখে বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করে এবং অন্যের বিরক্তির কারণ হয়।
আবার অনেকেই না বুঝে রিংটোন হিসেবে কুরআন তিলাওয়াত ব্যবহার করেন, যা কোনোভাবেই সমীচীন নয়। এটি আল্লাহর কালামের প্রতি এক ধরণের অবমাননা ও অপব্যবহার। ফোনের রিংটোনে কুরআন তেলাওয়াত যখন কোনো অপবিত্র স্থানে বা বিব্রতকর মুহূর্তে বেজে ওঠে তখন তা কুরআনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করে।
🏮তাই একজন সচেতন ও মার্জিত মানুষ হিসেবে আমাদের উচিত:
ক. কারো অনুমতি ছাড়া তার কথোপকথন লাউড স্পিকারে দেওয়া বা রেকর্ড করা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকা।
খ. রিংটোনের ক্ষেত্রে সব সময় সাধারণ ও স্বাভাবিক টোন ব্যবহার করা, যা কারো বিরক্তির কারণ হবে না।
গ. কুরআন তেলাওয়াত বা দ্বীনি কোনো বিষয়কে রিংটোন হিসেবে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকা।
▪️৩. ফোন মারফত যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইসলামি আদব মেনে চলা:
কারো সাথে যোগাযোগ করার ক্ষেত্রে ইসলামি আদব মেনে চলা কর্তব্য। যেমন:
ক. কথোপকথন শুরুর আগে সালাম বিনিময় করা।
খ. কারো বিশ্রামের সময় বা অসময়ে কল না দেওয়া।
গ. কেউ কল রিসিভ না করলে বারবার কল করে বিরক্ত না করা। এক্ষেত্রে সম্ভব হলে একটি মেসেজ দিয়ে রাখা উত্তম।
ঘ. অন্যের অনুমতি ছাড়া তার ফোন ব্যবহার করা বা কারো ব্যক্তিগত তথ্য অন্যের কাছে শেয়ার করা না করা।
▪️৪. সময়ের অপচয় রোধ:
ইসলামের দৃষ্টিতে সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া এক অতি মূল্যবান আমানত।
এই সময়কে কেবল বিনোদন বা সোশ্যাল মিডিয়ার অন্তহীন স্ক্রলিংয়ে অপচয় করা মানে আল্লাহ প্রদত্ত আমানতের খেয়ানত।
মনে রাখা আবশ্যক যে, আখেরাতের কাঠগড়ায় আল্লাহ তায়ালার সামনে এই অপচয় কৃত প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে।
তাই সোশ্যাল মিডিয়া বা ডিজিটাল প্রযুক্তির পেছনে অকারণে সময় না দিয়ে, সেই সময়টুকু যদি কুরআন তেলাওয়াত, ইলম অর্জন, সৃজনশীল কাজ কিংবা সমাজ ও পরিবারের কল্যাণে ব্যয় করা হয় তবেই আমানতের সদ্ব্যবহার হয় এবং দুনিয়া আখেরাতের সাফল্যের পথে এগিয়ে যাওয়া যায়।
প্রবাদে আছে, "সময় একটি ধারালো তলোয়ারের মতো; তুমি যদি একে না কাটো তবে এটি তোমাকে কেটে ফেলবে।"
তাই সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম গতির পেছনে না ছুটে নিজের জীবনের উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে প্রতিটি মুহূর্তকে গঠনমূলক কাজে ব্যবহার করাই হলো প্রকৃত ইমানদারের কাজ।
🔸সহজ কথায়, মোবাইল ফোনকে আপনি আপনার জীবনের উন্নতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন, নাকি অধঃপতনের দিকে ছুটে চলবেন—এই সিদ্ধান্ত আপনার হাতে। এর দ্বারা আপনি আপনার আমলনামাকে সমৃদ্ধ করবেন নাকি কলুষিত করবেন তাও আপনার সিদ্ধান্ত।
কল্যাণকর কাজে এই মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে বিজ্ঞানের এই মূল্যবান অবদানটি হবে আমাদের জন্য একটি বিশাল নেয়ামত। আর ভুল কাজে ব্যবহার করা হয় তাহলে তা হবে আমাদের জন্য ধ্বংস ও বিপর্যয়ের কারণ।
আল্লাহ আমাদেরকে এই মোবাইল ফোনকে সব ধরনের হারাম কাজে ব্যবহার থেকে হেফাজত করুন এবং তা দ্বীন ও দুনিয়ার উপকারী কাজে ব্যবহার করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
- আব্দুল্লাহিল হাদি আব্দুল জলীল মাদানি
No comments:
Post a Comment