Sunday, 30 May 2021

যাদের দিকে আল্লাহ তাকাবেন না, তাদের পবিত্র করে জান্নাতেও নিবেন না।


আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস্ সালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ। আম্মাবাদঃ

এমন কিছু মানুষ রয়েছে যারা কিয়ামত দিবসে দয়াময় আল্লাহর সুদৃষ্টি থেকে বঞ্ছিত থাকবে, তিনি তাদের দিকে তাকাবেন না আর না তাদের প্রতি সুনজর দিবেন। তাদের সংখ্যা অনেক। [আল্লাহর কাছে দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে এই বঞ্ছিতের অনিষ্ট থেকে হেফাযতে রাখেন, এর কারণ থেকে দূরে রাখেন এবং সেই বঞ্ছিত সম্প্রদায় থেকেও দূরে রাখেন।]
১-যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার ও শপথকে সামান্য বিনিময়ে বিক্রয় করেঃ আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ “নিশ্চয় যারা আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার এবং নিজেদের শপথকে তুচ্ছ মূল্যে বিক্রয় করে, এরা আখেরাতের কোন অংশই পাবে না এবং আল্লাহ কিয়ামতের দিন তাদের সঙ্গে কথা বলবেন না, তাদের প্রতি দৃষ্টিপাত করবেন না এবং তাদের পবিত্র করবেন না, বস্তুতঃ তাদের জন্য আছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” [আল্ ইমরান/৭৭] এই আয়াতে মিথ্যা কসম করা হারাম এর প্রমাণ রয়েছে, যা মানুষ সামান্য পর্থিব লাভের জন্যে করে থাকে। উলামাগণ এই কসম কে আল্ ইয়ামীন আল্ গামূস বা ডুবানোর কসম আখ্যা দিয়েছেন কারণ; তা এই কসমকারীকে পাপে ডুবায় অতঃপর জাহান্নামে। [আল্লাহই আশ্রয়দাতা]
২- গিঁটের নিচে বস্ত্র পরিধানকারী।
৩-মিথ্যা কসম দিয়ে পণ্য বিক্রয়কারী।
৪- কারো উপকার করে তাকে উপকারের খোটা দাতা।
আবু হুরাইরা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ “ তিন প্রকার এমন লোক রয়েছে, যাদের সাথে আল্লাহ কথা বলবেন না আর না কেয়ামতের দিন তাদের দিকে দেখবেন আর না তাদের পবিত্র করবেন বরং তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি”। আমি (আবু হুরাইরা) বললামঃ আল্লাহর রাসূল! তারা কারা? ওরা তো ক্ষতিগ্রস্ত! তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ “গিঁটের নিচে কাপড় পরিধানকারী, ব্যবসার সামগ্রী মিথ্যা কসম দিয়ে বিক্রয়কারী এবং কাউকে কিছু দান করার পর তার খোটা দাতা”। [মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, নং২৯৪]
গিঁটের নিচে ঝুলিয়ে কাপড় পরিধানকারী হচ্ছে, সেই ব্যক্তি যে তার লুঙ্গি ও কাপড় এত ঝুলিয়ে পরে যে তার দুই গিঁটের নিচে চলে যায়। যদি সে অহংকার স্বরূপ এমন করে, তাহলে তার জন্য উপরোক্ত শাস্তির ঘোষণা কারণ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “আল্লাহ তার দিকে তাকাবেন না যে, তার লুঙ্গি অহংকার স্বরূপ ঝুলিয়ে পরে”। [বুখারী, নং৫৭৮৩/ মুসলিম] আর যে অহংকার স্বরূপ নয় বরং এমনি ঝুলিয়ে পরে, তাহলে তার জন্য নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর এই বাণী প্রযোজ্যঃ “লুঙ্গির যতটা গিঁটের নিচে থাকবে, ততটা জাহান্নামে যাবে”। [বুখারী,নং৫৭৮৭ ] এই ভাবে হাদীসগুলির মাঝে সমন্বয় সাধন হবে। আল্লাহই বেশী জানেন।
পর্দার উদ্দেশ্যে মহিলাদের এক গজ ঝুলিয়ে পরা বৈধ কিন্তু এর বেশী করবে না।
আর মিথ্যা শপথ করে সামগ্রী বিক্রয়কারী হচ্ছে, এমন ব্যক্তি যে মহান আল্লাহকে তুচ্ছকারী। তাই সে (আল্লাহার কসম দিয়ে) মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে লোকদের নিকট পণ্য বিক্রি করে।
আর খোটাদাতা হচ্ছে, যে দান করার পর খোটা দেয়।
৫- যে মুসাফিরকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি থেকে বাধা দেয়।
৬-যে পার্থিব লাভের আশায় কোন মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানের হাতে বায়আত (অঙ্গীকার) করে।
আবু হুরাইরা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তিন প্রকারের লোকের সাথে মহান আল্লাহ কিয়ামত দিবসে কথা বলবেন না, না তাদের দিকে তাকাবেন আর না তাদের পবিত্র করবেন; বরং তাদের জন্য রয়েছে শক্ত আযাব। ঐ ব্যক্তি যার নিকট র্নিজন প্রান্তরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি থাকা সত্ত্বেও মুসাফিরকে তা ব্যবহার করা থেকে নিষেধ করে। আল্লাহ তাকে বলবেনঃ আজ আমি তোমাকে আমার অতিরিক্ত (রহমত) থেকে বঞ্ছিত করবো, যেমন তুমি তোমার বিনা পরিশ্রমে অর্জিত অতিরিক্ত পানি থেকে বঞ্ছিত কেরেছ এবং সেই ব্যক্তি যে আসরের পর কোন ব্যক্তিকে তার সামগ্রী বিক্রয় করে। আল্লাহর কসম খেয়ে বলে আমি এটা এই এই দামে ক্রয় করেছি। ক্রেতা তার কথা সত্য মনে করে তার কাছ থেকে পণ্য খরিদ করে অথচ সে সত্য নয়। আর সেই ব্যক্তি যে কোন মুসলিম ইমামের (রাষ্ট্রপরিচালকের) হাতে কেবল পার্থিব উদ্দেশ্যেই বাইআত (অঙ্গীকার) করলো; সে যা চায় যদি তাকে তা দেওয়া হয় তো অঙ্গীকার পূরণ করে, আর না দিলে ভঙ্গ করে। [বুখারী, নং ৭২১২/ মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, নং২৯৭]
মরুভূমীতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পানি থেকে মুসাফিরকে বাধাদানকারীকে আল্লাহ তার কৃত কর্ম অনুযায়ী বদলা দিবেন। তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা আছে তার তুলনায় আল্লাহর রহমত ও ফযলের প্রয়োজন অনেক বেশী। আর যে দুনিয়া পাবার আশায় ইমামের হাতে বাইআত করে, সে যেন এই অঙ্গীকারকে পার্থিব উদ্দেশ্যের সাথে সম্পৃক্ত করে দেয়। আর ইসলামের মূল বিধান শাষকের আনুগত্ব করা, তাকে সদুপদেশ দেওয়া, সাহায্য করা এবং ভাল কাজের আদেশ ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা, এসবের অবজ্ঞা করে। সে মুসলিম শাষক ও ইমামদের প্রতারনাকারী স্পষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত।
৭-বৃদ্ধ ব্যভিচারী।
৮-মিথ্যুক বাদশাহ।
৯-অহংকারী দরিদ্র।
আবু হুরাইরা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “ আল্লাহ তাআ’লা কেয়ামত দিবসে তিন শ্রেণীর লোকের সাথে কথা বলবেন না, আর না তাদের পবিত্র করবেন, না তাদের দিকে রহমতের দৃষ্টি দিবেন, তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তিঃ বৃদ্ধ যেনাকারী, মিথ্যুক রাজা এবং অহংকারী দরিদ্র”। [মুসলিম, ঈমান অধ্যায়, নং২৯৬]
বিশেষ করে এদের সম্পর্কে উক্ত শাস্তির কারণ বর্ণনায় কাযী ইয়ায বলেনঃ “তাদের প্রত্যেকে উক্ত পাপ থেকে দূরে থাকার পরেও তা করে। যদিও কোনো পাপীর পাপের অজুহাত গ্রহণীয় নয়, কিন্তু একথা বলা যেতে পারে যে, উক্ত পাপ করার ক্ষেত্রে তাদের অতীব প্রয়োজন ছিল না আর না তাদের সচরাচর স্বাভাবিক কোনো অন্য কারণ ছিল। তা সত্ত্বেও তাদের উক্ত পাপে লিপ্ত হওয়াটা যেন আল্লাহর অধিকারকে তুচ্ছ মনে করা, বিরোধিতা করা এবং অন্য কোন কারণ নয় বরং স্রেফ পাপ করার উদ্দেশ্যেই তা করা”।
১০- পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তান।
১১- নারী হয়ে পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বণকারীনি।
১২-দাইযূস।
আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলঅইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “ তিন প্রকার লোকের দিকে আল্লাহ তাআ’লা কিয়ামতের দিনে দৃষ্টিপাত করবেন নাঃ পিতা-মাতার অবাধ্য, পুরুষের সদৃশ অবলম্বনকারীনি মহিলা এবং দাইয়ূস। আর তিন প্রকার লোক জান্নাতে যাবে নাঃ পিতা-মাতার অবাধ্য, মদ পানে আসক্ত এবং অনুদানের পর খোটাদাতা” [মুসনাদ আহমদ, নং ৬১১/নাসাঈ]
পিতা-মাতার অবাধ্য সন্তানের বিষয়টি স্পষ্ট, কারণ আল্লাহ তাআ’লা পিতা-মাতার অধিকারকে মর্যাদা দিয়েছেন, তিনি নিজ অধিকারকে তাদের অধিকারের সাথে সংযুক্ত করেছেন এবং তাদের উভয়ের সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ করেছেন; যদিও তারা কাফের হয়। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “ পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতে আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাদের অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি”। [তিরমিযী, নং ১৯৬২, আলবানী সহীহ বলেছেন]
পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বণকারীনি বলতে সেই মহিলাকে বুঝায় যে, পোষাক-পরিধানে, চাল-চলনে, কাজে-কর্মে এবং কথার শুরে পুরূষের অনুকরণ করে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বণকারী পুরূষ এবং পুরুষের সাদৃশ্য অবলম্বণকারীনি মহিলাদের প্রতি অভিষাপ করেছেন”। [বুখারী]
আর দাইয়ূস হচ্ছে, যে নিজ পরিবারে অশ্লীলতা প্রশ্রয় দেয়, তাদের সম্ভ্রম রক্ষায় আত্মসম্মানী নয়, সে মানবিকতাহীন, অপুরুষত্ব, অসুস্থ মস্তিষ্ক এবং দুর্বল ঈমানের অধিকারী। তার তুলনা অনেকটা শুকরের মত, যে নিজ সম্ভ্রম রক্ষা করে না। তাই ঐ সকল লোককে সতর্ক থাকা উচিৎ যারা নিজ পরিবারে এবং তার দায়িত্বে থাকা লোকদের মাঝে অশ্লীলতা বা অশ্লীলতার উপকরণ প্রশ্রয় দেয়। যেমন বাড়িতে এমন টিভি চ্যানেল রাখা যা যৌনতা উষ্কে দেয় এবং অশ্লীলতা বৃদ্ধি করে।
১৩- যে তার স্ত্রীর পায়ুপথে সঙ্গম করেঃ
ইবনে আব্বাস (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “আল্লাহ তাআ’লা সেই ব্যক্তির দিকে দৃষ্টিপাত করবেন না যে, পুরুষের সাথে সঙ্গম করে কিংবা স্ত্রীর পায়ুপথে সঙ্গম করে”। [তিরিমিযী, নং১১৭৬ আলবানী সহীহ বলেছেন]
আবু হুরাইরা (রাযিঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ “সে অভিশপ্ত যে স্ত্রীর পায়ু পথে সঙ্গম করে”। [আহমদ, আবু দাউদ, নং ২১৬২/ আলবানী সহীহ বলেছেন]

সংকলনঃ দাওয়াহ অফিস, রাওদা, রিয়াদ।
অনুবাদঃ শায়খ আব্দুর রাকীব মাদানী হাফিযাহুলাহ।
লিসান্স, মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রভাষকঃ জামেয়াতুল ইসলামিয়া বুখারী কিষানগঞ্জ।

Monday, 3 May 2021

#লাইলাতুল্ #কদর’ এ কি কি #ইবাদত করবেন?



আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস্ স্বালাতু ওয়াস্ সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, আম্মা বাদঃ
অনেক দ্বীনী ভাই আছেন যারা সহীহ নিয়মে লাইলাতুল কদরে ইবাদত করতে ইচ্ছুক। তাই তারা প্রশ্ন করে থাকেন যে, লাইলাতুল কদরে আমরা কি কি ইবাদত করতে পারি? এই রকম ভাই এবং সকল মুসলিম ভাইদের জ্ঞাতার্থে সংক্ষিপ্তাকারে কিছু উল্লেখ করা হল। [ওয়ামা তাওফীকী ইল্লা বিল্লাহ]
প্রথমতঃ আল্লাহ তাআ’লা আমাদের বলে দিয়েছেন যে, এই রাত এক হাজার মাসের থেকেও উত্তম। অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদত এক হাজার মাসের থেকেও উত্তম। [আল্ মিসবাহ আল্ মুনীর/১৫২১]
তাই এই রাতটি ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করাই হবে আমাদের মূল উদ্দেশ্য।
দ্বিতীয়তঃ জানা দরকার যে ইবাদত কাকে বলে? ইবাদত হচ্ছে, প্রত্যেক এমন আন্তরিক ও বাহ্যিক কথা ও কাজ যা, আল্লাহ পছন্দ করেন এবং তাতে সন্তুষ্ট থাকেন। [মাজমুউ ফাতাওয়া,১০/১৪৯]
উক্ত সংজ্ঞার আলোকে বলা যেতে পারে যে ইবাদত বিশেষ এক-দুটি কাজে সীমাবদ্ধ নয়। তাই আমরা একাধিক ইবাদতের মাধ্যমে এই রাতটি অতিবাহিত করতে পারি। নিম্নে কিছু উৎকৃষ্ট ইবাদত উল্লেখ করা হলঃ
১- ফরয নামায সমূহ ঠিক সময়ে জামাআ’তের সাথে আদায় করা।
যেমন মাগরিব, ইশা এবং ফজরের নামায। তার সাথে সাথে সুন্নতে মুআক্কাদা, তাহিয়্যাতুল মসজিদ সহ অন্যান্য মাসনূন নামায আদায় করা।
২- কিয়ামে লাইলাতুল্ কদর করা।
অর্থাৎ রাতে তারবীহর নামায আদায় করা। নবী (সাঃ) বলেনঃ
“যে ব্যক্তি ঈমান ও নেকীর আশায় লাইলাতুল কদরে কিয়াম করবে (নামায পড়বে) তার বিগত গুনাহ ক্ষমা করা হবে”। [ফাতহুল বারী,৪/২৯৪]
এই নামায জামাআতের সাথে আদায় করা উত্তম। অন্যান্য রাতের তুলনায় এই রাতে ইমাম দীর্ঘ কিরাআতের মাধ্যমে নামায সম্পাদন করতে পারেন। ইশার পর প্রথম রাতে কিছু নামায পড়ে বাকী নামায শেষ রাতে পড়াতে পারেন। একা একা নামায আদায়কারী হলে সে তার ইচ্ছানুযায়ী দীর্ঘক্ষণ ধরে নামায পড়তে পারে।
৩- বেশী বেশী দুআ করা।
তন্মধ্যে সেই দুআটি বেশী বেশী পাঠ করা যা নবী (সাঃ) মা আয়েশা (রাযিঃ) কে শিখিয়েছিলেন।
মা আয়েশা নবী (সাঃ) কে জিজ্ঞাসা করেনঃ হে আল্লাহর রাসূল! যদি আমি লাইলাতুল কদর লাভ করি, তাহলে কি দুআ করবো? তিনি (সাঃ) বলেনঃ বলবে, (আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল্ আফওয়া ফা’ফু আন্নী”। [আহমদ,৬/১৮২] অর্থ, হে আল্লাহ! তুমি ক্ষমাশীল। ক্ষমা পছন্দ কর, তাই আমাকে ক্ষমা কর”।
এছাড়া বান্দা পছন্দ মত দুনিয়া ও আখেরাতের কল্যাণকর যাবতীয় দুআ করবে। সে গুলো প্রমাণিত আরবী ভাষায় দুআ হোক কিংবা নিজ ভাষায় হোক। এ ক্ষেত্রে ইবাদতকারী একটি সুন্দর সহীহ দুআ সংকলিত দুআর বইয়ের সাহায্য নিতে পারে। সালাফে সালেহীনদের অনেকে এই রাতে অন্যান্য ইবাদতের চেয়ে দুআ করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। কারণ এতে বান্দার মুক্ষাপেক্ষীতা, প্রয়োজনীয়তা ও বিনম্রতা প্রকাশ পায়, যা আল্লাহ পছন্দ করেন।
৪- যিকর আযকার ও তাসবীহ তাহলীল করা।
অবশ্য এগুলো দুআরই অংশ বিশেষ। কিন্তু বিশেষ করে সেই শব্দ ও বাক্য সমূহকে যিকর বলে, যার মাধ্যমে আল্লাহর প্রশংসা ও গুণগান করা হয়। যেমন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”, “আল্ হামদু ল্লিল্লাহ” “সুবহানাল্লাহ”, “আল্লাহুআকবার” “আস্তাগফিরুল্লাহ”, “লা হাওলা ওয়ালা কুউআতা ইল্লা বিল্লাহ”। ইত্যাদি।
৫- কুরআন তিলাওয়াত।
কুরআন পাঠ একটি বাচনিক ইবাদত, যা দীর্ঘ সময় ধরে করা যেতে পারে। যার এক একটি অক্ষর পাঠে রয়েছে এক একটি নেকী। নবী (সাঃ) বলেনঃ
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পড়বে, সে তার বিনিময়ে একটি নেকী পাবে… আমি একথা বলছি না যে, আলিফ,লাম ও মীম একটি অক্ষর; বরং আলিফ একটি অক্ষর লাম একটি অক্ষর এবং মীম একটি অক্ষর”। [তিরমিযী, তিনি বর্ণনাটিকে হাসান সহীহ বলেন]
এছাড়া কুরআন যদি কিয়ামত দিবসে আপনার সুপারিশকারী হয়, তাহলে কতই না সৌভাগ্যের বিষয়! নবী (সাঃ) বলেনঃ
“তোমরা কুরআন পড়; কারণ সে কিয়ামত দিবসে পাঠকারীর জন্য সুপারিশকারী হিসাবে আগমন করবে”। [মুসলিম]
৬- সাধ্যমত আল্লাহর রাস্তায় কিছু দান-সাদকা করা।
নবী (সাঃ) বলেনঃ
“সাদাকা পাপকে মুছে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়”। [সহীহুত তারগবি]
শবে কদরের একটি রাতে এই রকম ইবাদতের মাধ্যমে আপনি ৮৩ বছর ৪ মাসের সমান সওয়াব অর্জন করতে পারেন। ইবাদতের এই সুবর্ণ সুযোগ যেন হাত ছাড়া না হয়। আল্লাহ আমাদের তাওফীক দিন। আমীন!
উল্লেখ থাকে যে, ইবাদতের উদ্দেশ্যে বৈষয়িক কাজ-কর্মও ইবাদতে পরিণত হয়। যেমন রোযার উদ্দেশ্যে সাহরী খাওয়া, রাত জাগার জন্য প্রয়োজনীয় কাজ-কর্ম সেরে নেওয়া। তাই লাইলাতুল কদরে ইবাদতের উদ্দেশ্যে বান্দা যেসব দুনিয়াবী কাজ করে সেগুলোও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত।
আশা করি আপনাদের বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত কিছু আইডিয়া দিতে পেরেছি। ওয়ামা তাওফীক ইল্লা বিল্লাহ্


লেখকঃ শায়খ আব্দুর রাকীব মাদানী হাফিযাহুলাহ। লিসান্স, মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়
প্রভাষকঃ জামেয়াতুল ইসলামিয়া বুখারী কিষানগঞ্জ।

Tuesday, 13 April 2021

সিয়াম গাইড। লেখক: আব্দুর রাকীব মাদানী হাফিযাহুল্লাহ।

 #সিয়াম_কিয়াম_শুরু_করার_পূর্বে_লেখাটি_পড়ার_অনুরোধ_জানাচ্ছি

লেখক: আব্দুর রাকীব মাদানী হাফিযাহুল্লাহ।
عبد الرقيب المدني
আলহামদুলিল্লাহ, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিল্লাহ, আম্মাবাদ:
১- সিয়াম পালন একটি ফরয ইবাদত যা, প্রত্যেক সাবালক, সুস্থ ও মুকিম ( মুসাফির নয় এমন ব্যক্তি ) মুসলিমের প্রতি জরুরি । যেহেতু প্রত্যেক ইবাদত কবুলের প্রথম শর্তই হচ্ছে সে ইবাদতটি খাঁটি ভাবে আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্যে হওয়া তাই কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই সিয়াম ( রোযা) পালন করা আবশ্যক।
২ - সিয়ামের সময়সীমা হল, ফজর থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত। এই সময় যাবতীয় পানাহার, স্ত্রী সহবাস ও যৌন সঙ্গম থেকে বিরত থাকার নাম সাউম বা রোযা । আর বাকি অঙ্গ যেমন জিহব্বা, চোখ , কান, হাত-পা ইত্যাদিকে যাবতীয় মন্দ বলা, দেখা, শোনা এবং করা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে রোযাকে পূর্ণতা দান করা , রোযার সংরক্ষণ করা এবং সিয়াকে কলুষিত না করা।
৩- ফজর পূর্বে নিয়ত তথা সংকল্প করার মাধ্যমে সাউম শুরু হয়। এই সময় কিছু আহার করা ভাল, যাকে সাহুর (সাহরী) বলা হয়। এই আহার বরকতপূর্ণ এবং মুসলিম ও অমুসলিমের সিয়ামের মাঝে পার্থক্যকারী, যা খাওয়া সুন্নাত জরুরি নয় । তাই রোযা রাখার নিয়ত ছিল কিন্তু যে কোন কারণে সাহুর খেতে পারেনি তার সাউম শুদ্ধ।
৪- চোখের সামনে সূর্য ডুবে গেলে রোযা ভঙ্গ করা তথা ইফতার করার নিয়ম । সূর্য ডুবার সাথে সাথে তাড়াতাড়ি ইফতার করা অর্থাৎ কল্যাণে থাকা। [ মুত্তাফাকুন আলাইহ ] ডাগর খেজুর দ্বারা ইফতারি করা সুন্নাহ, তবে এর অবর্তমানে সাধারণ খেজুর দ্বারা আর তাও না থাকলে পানি দ্বারা ইফতার করার সুযোগ রয়েছে । [ আবু দাউদ তিরমিযী]

৫- স্ত্রী সহবাস, হারাম সহবাস, হস্তমৈথুন, জাগ্রতবস্থায় যৌন চাহিদার সাথে বীর্যপাত, ইচ্ছাকৃত পানাহার, পানাহারের স্থানে স্লাইন-ইঞ্জেকশন গ্রহণ, ইচ্ছাকৃত বমি করা, স্ব ইচ্ছায় অধিক রক্তদান এসব কারণে সিয়াম ভেঙ্গে যায়। [ মুলাখখাস আল ফিকহি ১৮২-৮৩] স্বপ্ন দোষ, অনিচ্ছা ও ভুলে পানাহার, অনিচ্ছায় বমি করা, অনিচ্ছায় রক্তক্ষরণ এবং সামান্য রক্তদানে সাউম নষ্ট হয় না।
৬- যার উপর সাউম জরুরি কিন্তু সে মুসাফির কিংবা অসুস্থ তাহলে তার জন্য সেই দিনগুলিতে রোযা ছাড়া বৈধ সে অন্য দিনে তা কাযা-পূরণ করে দিবে। [ বাকারাহ ১৮৪] মুসাফিরের সফরে যদি কষ্ট না হয় আর অসুস্থ ব্যক্তির অসুখ যদি হাল্কা হয় তাহলে তারা রোযা রাখবে কিন্তু সফর বা অসুস্থের কারণে রোযা রাখতে একটু কষ্ট হলেই রোযা কাযা করা ভাল। আর বেশী কষ্ট হলে রোযা কাজা করা জরুরি। [শারহুল মুমতি, ইবনু উসাইমীন ]
৭- রোযা পালনের সময় মহিলাদের মাসিক স্রাব শুরু হলে রোযা ছেড়ে দিবে, শেষ হলে আবার করবে এবং ছুটে যাওয়া রোযাগুলি রামাদান পরে ক্বাযা করবে কিন্তু নামাজ ক্বাযা করবে না । [বুখারি মুসলিম]
৮- গর্ভবতী ও স্তন্যদানকারিণী মহিলারা অসুস্থ ব্যক্তির মত। রোযা রাখলে যদি স্বয়ং তাদের সমস্যা হয় কিংবা তাদের সন্তানের ক্ষতি হয় তাহলে তারা পরে রোযা ক্বাযা করে দিবে। [শারহুল মুমতি]
৯- অধিক বার্ধক্য কিংবা চিরস্থায়ী অসুখ যা থেকে সুস্থতার আশা করা যায়না এমন অপারগতার কারণে সাউম পালনে অক্ষম ব্যক্তিরা প্রতি রোযার বদলে একজন মিসকিনকে খাদ্য দান করবে। [ফাতাওয়া ইবনু বাজ ৫/২৩৩] [ অর্ধ স্বা অর্থাৎ (সোয়া কেজি) কাঁচা বা রান্নাকৃত খাবার বা একজন মিসকিন যে পরিমাণ খায় ততখানি খাবার। ]
১০- সিয়াম পালনকারীদের উচিৎ হবে তারা যেন অবশ্যই ফরয কাজগুলি সঠিক সময়ে পালন করে এবং নফল ইবাদত বেশী বেশী করে। কুরআন তিলাওয়াত, যিকর - আযকার, দান- সাদাকা, দাওয়াত তাবলীগে অগ্রগামী হয়। হারাম কাজ বর্জন করে। গিবত-পরনিন্দা পরিহার করে। আনাস ( রাযীঃ ) হতে বর্ণিত, যে পরনিন্দা করতে থাকে সে সাউম পালন করে না। [ ইবনু আবি শাইবা ৮৮৯০]
বি: দ্র: বর্তমান মহামারীর কারণে বিশ্বের বরেণ্য উলামাগণ কুরআন ও হাদীসের আলোকে প্রায় ঐক্যমত পোষণ করেছেন যে এই সময় জুমআ, জামাআত এবং তারাবীহ এর নামায বাড়িতে আদায় করা বৈধ বরং জরুরি।
নিজের, অপরের, দেশ ও জাতির কল্যাণার্থে আমাদের এই সময় বাড়িতে নামায আদায় করে বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়া উচিৎ। ইনশা আল্লাহ্ আপনি আপনার সৎ নিয়তের কারণে জামাআতে সালাত আদায় করার সাওয়াব পেয়ে যাবেন।
অবশ্য যেখানে এই সমস্যা নেই বা অতি লঘু সমস্যা রয়েছে সেখানে আলেম উলামাদের পরামর্শ হিসাবে কাজ করতে হবে।
দুআর আশাবাদী, আব্দুর রাকীব বুখারী-মাদানী।
প্রাক্তন দাঈ, সৌদী আরব
প্রভাষক, জামেয়াতুল ইমাম আলবুখারী, কিশনগঞ্জ।

Sunday, 7 March 2021

সালাতের কাতার সোজা করার উদ্দেশ্যে ইমাম সাহেব কর্তৃক মুক্তাদিদের প্রতি নির্দেশ বাচক কতিপয় আরবি বাক্য ও সেগুলোর অর্থ:


▬▬▬▬▬ ◈◉◈▬▬▬▬▬
ইমাম সাহেব জামাআতে সালাতে দণ্ডায়মান হওয়ার সময় কাতার সোজা করা এবং কাতারের মাঝে ফাঁকা জায়গা পূরণ করত: সবাইকে সুশৃঙ্খল ভাবে দাঁড়ানোর উদ্দেশ্যে কতিপয় নির্দেশ বাচক বাক্য ব্যবহার করে থাকেন। (বিশেষত: আরবি ভাষী ইমামগণ)। নিন্মে সেগুলোর আরবি উচ্চারণ ও বাংলা অর্থ দেয়া হল:
▪ ইসতাউ (استووا) অর্থ: আপনারা সোজা হোন অর্থাৎ আপনারা সমান্তরাল ভাবে দণ্ডায়মান হোন।
▪তারাসসু (تراصوا) অর্থ: আপনারা একে অপরের সাথে লেগে লেগে সু শৃঙ্খলাবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে যান।
▪ সু্উঊ/সুব্বু সুফূফাকুম (سووا صفوفكم) অর্থ: আপনারা আপনাদের কাতারগুলো সোজা করে নিন।
▪ই’তিদালূ (اعتدلوا) অর্থ: আপনারা (কাতারের মধ্যে) সামঞ্জস্যতা আনুন।
▪সুদ্দুল খালাল (سدوا الخلل) অর্থ: খালি জায়গাগুলো পূরণ করুন।
▪সুদ্দুল ফুরাজ (سدوا الفرج) অর্থ: শূন্যস্থানগুলো পূর্ণ করুন। (দুটি বাক্যের অর্থ প্রায় কাছাকাছি)
▪হা-যূ বাইনাল মানাকিবি ওয়াল আকদাম ( حاذوا بين المناكب و الأقدام ) অর্থ: আপনারা কাঁধ ও পায়ের পাতা বরাবর (সারিবদ্ধ ভাবে) দণ্ডায়মান হোন।
●●●●●●●●●●
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল মাদানি
দাঈ, জুবাইল দওয়াহ সেন্টার

Wednesday, 23 December 2020

কুরআনের_আয়াত_সংখ্যা_কত?


আমার একজন ভক্ত বললেন, 'হুজুর! কুরআনের আয়াত-সংখ্যা কত?
আপনি আপনার তফসীর 'আহসানুল বায়ান’এর ভূমিকায় লিখেছেন, 'প্রসিদ্ধ মতানুসারে মোট আয়াত …
See More
Like
Comment
Share
, 'হুজুর! কুরআনের আয়াত-সংখ্যা কত?
আমার একজন ভক্ত বললেন, আপনি আপনার তফসীর 'আহসানুল বায়ান’এর ভূমিকায় লিখেছেন, 'প্রসিদ্ধ মতানুসারে মোট আয়াত ৬৬৬৬টি।’
কোন কোন শায়খ বলছেন, 'এটা মারাত্মক ভুল।’
তাহলে নির্ভুল সঠিক কোনটি?
আসলে ভাই দেখুন, কুরআনের আয়াত-সংখ্যা সঠিকভাবে কত, তা নবী ﷺ কর্তৃক প্রমাণিত নয়। সুতরাং এ মর্মে সাহাবা, তাবেঈন ও উলামাদের ইজতিহাদ কাজ করেছে এবং তার ফলে এর সংখ্যায় মতভেদ রয়ে গেছে। তাই কেউই কারো মতকে 'মারাত্মক ভুল’ অথবা 'নির্ভুল সঠিক’ বলতে পারবে না। যেহেতু এটা ইজতিহাদী ব্যাপার।
অনেকে বলেন, 'আরে মশাই কুরআনের কোন সূরায় কত আয়াত লেখাই তো আছে। সুতরাং গুনে যোগ ক’রে দেখে নিলেই তো হয়।’ তিনি ব্যাপারটাকে এতই সহজ মনে করেন। কিন্তু সে গণনাটাই যে সঠিক, তার কোন নিশ্চয়তা নেই---এ কথা তিনি জানেন না।
সূরা ফাতিহার ব্যাপারটাই দেখুন না, ৭টি আয়াতের কোনটি প্রথম এবং কীভাবে ৭টি আয়াত হয়, তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে।
কেন এ মতবিরোধ?
আয়াতের শেষ অংশ কোনটি বা আয়াতটি কোথায় গিয়ে শেষ হয়েছে, সে ব্যাপারে মতভেদের কারণে।
আমরা জানি, বাক্য শেষ হলে পূর্ণচ্ছেদ বা দাঁড়ি ব্যবহার হয়। কিন্তু বাক্যটা আসলে কোথায় শেষ হল, তা নিয়ে মতভেদ থাকার ফলে আয়াত গণনায় মতভেদ স্বাভাবিক আকার ধারণ করেছে।
হাদীস-সংখ্যা নিয়েও অনেকে এই শ্রেণীর প্রশ্ন তুলে থাকেন। রেফারেন্সের সময়ে অনেক ক্ষেত্রে হাদীস-নম্বর মিল খায় না। যার ফলে অনেকে ভুল মনে করে থাকেন। অথচ হাদীস গণনাতেও ভুল হওয়া স্বাভাবিক। কেবল বুখারীর হাদীস-সংখ্যাটাই ধরুন, এক মুহাক্কিকের গণনা অন্য মুহাক্কিকের গণনার সাথে মিলে না। এক প্রকাশনীর ছাপা অন্য প্রকাশনীর ছাপার সংখ্যার সাথে মিল দেখতে পাওয়া যায় না। সেই কারণেই বুখারীর হাদীস-সংখ্যা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। কেউ গুনেছেন ৭৫৬৩, কেউ ৭১২৪ এবং আরো কমবেশি সংখ্যা গুনেছেন অনেকেই। আর এটা অস্বাভাবিক নয়। বিধায় কেউ অন্যেরটা জন্য বলতে পারবেন না যে, এটা 'মারাত্মক ভুল’।
কুরআনের মোট আয়াত-সংখ্যা কত, তা উক্তরূপ মতভেদের কারণেই কম-বেশি হয়েছে। কোনটাই নিশ্চিত সঠিক নয়।
এ ব্যাপারে সবাই একমত যে, কুরআনের আয়াত-সংখ্যা ৬০০০ এর কম নয়। কিন্তু তার উপরের সংখ্যা নিয়ে রয়ে গেছে মতভেদ। মূল কুরআনের মধ্যে নয়, বরং তার বাক্যাবলীর শেষাংশ নিয়ে মতভেদ হয়েছে।
সুতরাং কেউ গণনা করেছেন, ৬২০৪
কেউ গণনা করেছেন, ৬২১৪
কেউ গণনা করেছেন, ৬২১৯
কেউ গণনা করেছেন, ৬২২৫
কেউ গণনা করেছেন, ৬২৩৬
কেউ এর সাথে ১১২টি 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম’ কে যোগ ক’রে বলেছেন ৬৩৪৮ আয়াত।
অর্থাৎ, এখানে সূরা ফাতিহার শুরুর 'বিসমিল্লাহ’ কে তার প্রথম আয়াত গণনা করেছেন এবং যেহেতু সূরা তাওবার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ’ নেই, সেই হিসাব গণ্য করেছেন।
কুফীদের নিকট আয়াত-সংখ্যা ৬২৩৬ এবং অকুফীদের নিকট ৬৬৬৬টি।
যেহেতু মনে রাখা সহজ বলে চট ক’রে লোকে শেষেরটাই বলে থাকে। আর এ জন্যই আমি লিখেছি 'প্রসিদ্ধ মতে’, 'সঠিক মতে’ নয়।
তবে বলতে পারেন, সঊদী আরবের ছাপাটা যখন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে আছে, তখন সেটাই গ্রহণ করা উত্তম। অবশ্যই এ কথা মেনে নিতে কোন দোষ নেই।
বিনীত---------
আব্দুল হামীদ আল-ফাইযী আল-মাদানী

Sunday, 20 December 2020

যারা বিবাহ বন্ধনে উদ্যোগ নিচ্ছেন-

 যারা বিবাহ বন্ধনে উদ্যোগ নিচ্ছেন, তাঁদের এক আরব বেদুঈনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ উপদেশ মনে রাখা প্রয়োজন। তিনি তাঁর বিবাহযোগ্য পুত্রকে সম্বোধন ক’রে বলেছিলেন,

يا بني لا تنكح المنانه ولا الأنانه ولا الحنانه ولا الحداقه ولا البراقه ولا الشداقه ولا عشبه الدار ولا كية القفا
অর্থাৎ, বেটা! তুমি এই (৮ প্রকার) মেয়েকে তোমার স্ত্রীরূপে নির্বাচন করো না।
১। মান্নানাহ (উপকার বা অনুগ্রহ প্রচারকারিণী)
এমন মেয়ে, স্বামীর প্রতি সে বা তার বাপের বাড়ির লোক কোন উপকার বা অনুগ্রহ করলে কথায় কথায় খোঁটা মারে। স্বামীর পরিবারের বা বাইরের লোকের কাছে বলে বা গেয়ে বেড়ায়। 'এটা আমার বাপের ঘরের। এটা আমার ভাই দিয়েছিল বলেই তো? মা দিয়েছিল বলে ঠান্ডা পানি খেতে পাচ্ছ।’ ইত্যাদি
২। আন্নানাহ (কাতর)
এমন মেয়েকে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় 'আবছুদে’ বলে। মানে যে মেয়ে অল্প কিছুতে 'আঃ-উঃ, বাবারে-মারে’ করতে থাকে। সামান্য আঘাতে কাতর হয়ে যায়। সামান্য কষ্টে কাঁদতে লাগে (ছিঁছ-কাঁদুনে)। অধিকাংশ সময়ে অসুস্থ না থাকলেও অসুস্থতার ভান করে। কোনও কাজে ফাঁকি দেওয়ার জন্য মাথা-ব্যথা বা অন্য কোন অসুখের ওজর পেশ করে। আজ মাথা ধরেছে, কাল পেটে বাজছে পরশু আরো কিছু বলে অজুহাত তৈরি করে।
বাংলা প্রবাদে বলা হয়,
'জারে বউ জার-কাতুরে বর্ষায় বউয়ের হাজা,
কখনো দেখলাম না আমি বউ রইল তাজা।’
৩। হান্নানাহ (অন্যাসক্তা)
যে মেয়ের আসক্তি নিজের স্বামীর সাথে সীমাবদ্ধ থাকে না। তবে সে পরকীয়া করে না। আসলে সে বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা হওয়ার পর বিবাহিতা হয়। অতঃপর কথায় কথায় সে পূর্ব স্বামীর প্রতি আসক্তি প্রকাশ করে। যেন বর্তমান স্বামীর তুলনায় সেই ভালো ছিল, সে কথা বুঝাতে চায়। নগণ্য বঞ্চনায় অথবা সামান্য ত্রুটির ক্ষেত্রে সে তাকে স্মরণ করে। পূর্বের ভালোবাসা সে ভুলতে পারে না। যার ফলে তুলনা করতে গিয়ে সে বর্তমান স্বামীর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিতা হয়।
অথবা তার গর্ভজাত পূর্ব স্বামীর সন্তান থাকে এবং সে তাদের প্রতি সর্বদা নিজ মনকে ফেলে রাখে। এমনকি সুখের সময়েও সে তাদের দুঃখের কথা তুলে বর্তমান সুখের সময়কে নষ্ট ক’রে ফেলে।
অথবা সর্বদা নিজ পরিবারের প্রতি আসক্তি প্রকাশ ক’রে থাকে। ক্ষণে ক্ষণে বা ঘন ঘন মায়ের বাড়ি যেতে চায়। আর তার ফলে স্বামীর প্রতি কর্তব্যে অবহেলা ক’রে বসে।

Thursday, 8 October 2020

হাশরের ময়দানে পশু-পাখীদের অবস্থা এবং দশটি পশু-পাখীর জান্নাতে প্রবেশ

 হাশরের ময়দানে পশু-পাখীদের অবস্থা এবং দশটি পশু-পাখীর জান্নাতে প্রবেশ

▬▬▬✪✪✪▬▬▬
প্রশ্ন: পরকালে পশু-পাখীদেরকেও কি পুনরুত্থিত করা হবে? আর শোনা যায় যে, দশটি পশু বা প্রাণীও জান্নাতে যাবে। এ কথা কি সত্য?
উত্তর:
এ কথা সঠিক যে, হাশরের ময়দানে মানুষের পাশাপাশি সকল পশু-পাখি‌ ও জীব-জন্তুও পুনরুত্থিত হবে এবং দুনিয়াতে যে সব পশু-পাখী অন্য পশু-পাখীর উপর অন্যায়ভাবে আক্রমণ করেছিলো বা একে অপরের প্রতি জুলুম করেছিলো সে দিন মহান আল্লাহ তাদের থেকে কেসাস বা সমপরিমাণ প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যবস্থা করবেন। তারপর আল্লাহর হুকুমে সেগুলো পুনরায় মাটিতে মিশে যাবে। অর্থাৎ সেখানেই তাদের যবনিকা ঘটবে। এরপর তাদের জান্নাত বা জাহান্নামে যাওয়ার আর কোনও প্রশ্ন থাকবে না।
পক্ষান্তরে মানুষের পাপ-পুণ্য হিসাব-নিকাশ ও পারস্পারিক জুলুম-অবিচারের বিচারকার্য সম্পন্ন হওয়ার পর তাদেরকে চীর সুখের নীড় জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে অথবা মর্মন্তুদ শাস্তির স্থান জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।
কুরআন-হাদিস এবং সাহাবী ও মুসলিম মনিষীদের মতামতের আলোকে এটাই সঠিক কথা।
◈ আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَإِذَا الْوُحُوشُ حُشِرَتْ
“আর যখন বন্য পশুদেরকে (হাশরের মাঠে) সমবেত করা হবে।” (সূরা তাকবীর: ৫)
কাতাদা রহ. এ আয়াতের তাফসির প্রসঙ্গে বলেন,
هذه الخلائق موافية يوم القيامة، فيقضي الله فيها ما يشاء
"এ সকল সৃষ্টি জীবকে কিয়ামতের দিন মানুষের সাথে পুনরুত্থিত করার পর আল্লাহ তাআলা যেভাবে চান সেভাবে তাদের মাঝে বিচার-ফয়সালা করবেন।"
(তাফসিরে ইবনে কাসির) তবে এর ব্যাখ্যায় ভিন্ন মতও আছে।
◈ তিনি আরও বলেছেন,
وَمَا مِنْ دَابَّةٍ فِي الأَرْضِ وَلا طَائِرٍ يَطِيرُ بِجَنَاحَيْهِ إِلا أُمَمٌ أَمْثَالُكُمْ مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ ثُمَّ إِلَى رَبِّهِمْ يُحْشَرُونَ
“আর যত প্রকার প্রাণী পৃথিবীতে বিচরণশীল রয়েছে এবং যত প্রকার পাখী দু’ ডানাযোগে উড়ে বেড়ায় তারা সবাই তোমাদের মতই একেকটি শ্রেণী। আমি কোন কিছু লিখতে ছাড়ি নি। অতঃপর সবাইকে তাদের প্রতিপালকের কাছে সমবেত করা হবে। (সূরা আনআম: ৩৮)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. বলেন,
يحشر كل شيء حتى الذباب
“সব কিছুকেই সমবেত করা হবে; এমনকি একটি মাছিকেও।” (তাফসিরে ইবনে কাসির)
◈ আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
لَتُؤَدُّنَّ الْحُقُوقَ إِلَى أَهْلِهَا حَتَّى يُقَادَ لِلشَّاةِ الْجَلْحَاءِ مِنْ الشَّاةِ الْقَرْنَاءِ-صحيح مسلم- كتاب الْبِرِّ وَالصِّلَةِ وَالْآدَابِ- بَابُ تَحْرِيمِ الظُّلْمِ- حديث رقم 4807
"তোমরা অবশ্যই প্রত্যেক পাওনাদারের পাওনা পরিশোধ করে দিবে। (অন্যথায় কিয়ামতের দিন তা পরিশোধ করা হবে।) এমনকি একটি শিং বিশিষ্ট ছাগল যদি দুনিয়াতে কোনও শিং বিহীন ছাগলকে গুঁতা মেরে থাকে তাহলে তার থেকে শিং বিহীন ছাগলের জন্য প্রতিশোধ নেয়া হবে।" [সহিহ মুসলিম, অধ্যায়: সৎকর্ম, আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা ও শিষ্টাচার, অনুচ্ছেদ: জুলুম করা হারাম]
অন্য হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,
يقضي الله بين خلقه الجن والإنس والبهائم ، وإنه ليقيد يومئذ الجمَّاء من القرناء ، حتى إذا لم يبق تبعة عند واحدة لأخرى قال الله : كونوا ترابا ، فعند ذلك يقول الكافر : ((يا ليتني كنت تراباً)) - قال الشيخ الألباني : صحيح . انظر السلسلة الصحيحة.
‘আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন জিন, মানুষ ও চতুষ্পদ জন্তুর মাঝে বিচার-ফয়সালা করবেন। এমনকি দুনিয়ায় কোনও শিং বিশিষ্ট জন্তু কোনও শিং বিহীন জন্তুকে আঘাত করে থাকলে সে তার প্রতিশোধ নিবে। যখন একটি পশুরও অন্য পশুর প্রতি আর কোনও দাবী-দাওয়া ও অভিযোগ থাকবে না তখন আল্লাহ বলবেন, "তোমরা মাটি হয়ে যাও।”
এ সময় কাফিররা আক্ষেপ করে বলবে, يَا لَيْتَنِي كُنتُ تُرَابًا “হায় আফসোস! আমিও যদি মাটি হয়ে যেতাম।” (সূরা নাবা: ৪০)
[তাফসিরে তাবারি ২৪/৫৫, শাইখ আলবানি সিলসিলা সহিহা গ্রন্থে এ হাদিসটিকে সহিহ বলেছেন]
❑ দুনিয়ার কিছু পশু-পাখী কি জান্নাতে প্রবেশ করবে?
কিছু কিছু তাফসিরের কিতাবে দুনিয়ার বেশ কিছু জন্তু-জানোয়ারের জান্নাতে প্রবেশের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু এর পক্ষে হাদিসের কোন দলিল নাই। সুতরাং দলিল ছাড়া এ জাতীয় কথা গ্রহণযোগ্য নয়।
যেসব প্রাণী জান্নাতে প্রবেশ করবে বলা হয় সেগুলো হল:
১) আসহাবে কাহফ এর কুকুর
২) সালেহ আলাইহিস সালাম এর ঊটনী।
৩) ইবরাহিম আলাইহিস সালাম এর গরুর বাছুর।
৪) ইসমাইল আলাইহিস সালাম এর দুম্বা।
৫) ইউনুস আলাইহিস সালাম এর তিমি মাছ।
৬) উযাইর আলাইহিস সালাম এর গাধা।
৭) সুলাইমান আলাইহিস সালাম এর পিপীলিকা।
৮) রাণী বিলকিস এর হুদহুদ পাখি।
৯) বনী ইসরাইল এর গাভী (যে গাভীর কথা সূরা বাকারায় আলোচিত হয়েছে)
১০) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর খচ্চর।
(তাফসিরে রূহুল বয়ান)
কিন্তু মুহাক্কিক আলেমদের মতে, এ সব প্রাণী জান্নাতে যাওয়ার পক্ষে কোনও হাদিস বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত হয় নি। তাছাড়া পূর্বোল্লিখিত হাদিসের আলোকে আমরা জেনেছি যে, হাশরের ময়দানে সকল পশুপাখিকে পুনরুত্থানের পর তাদের মাঝে বিচারকার্য সংঘটিত হবে। তারপর আল্লাহর হুকুমে তারা আবার মাটিতে মিশে যাবে। উক্ত হাদিসেও এই দশটি প্রাণীর জান্নাতে প্রবেশের কথা বলা হয় নি।
সুতরাং দলিল ছাড়া এসব পশুপাখি জান্নাতে প্রবেশ করবে এমন কথা বলার সুযোগ নাই। আল্লাহু আলাম।
▬▬▬✪✪✪▬▬▬
উত্তর প্রদানে:
আব্দুল্লাহিল হাদী বিন আব্দুল জলীল
দাঈ, জুবাইল দাওয়াহ সেন্টার, সৌদি আরব

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...