Monday, 26 January 2015

প্রশ্নঃ মৃতের বাড়ীতে কুরআন খানী অনুষ্ঠান করার বিধান কি?



উত্তরঃ নিঃসন্দেহে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে কোরানখানী মাহফিল করা একটি বিদআত। কেননা ইহা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বা তাঁর ছাহাবায়ে কেরামের যুগে প্রচলিত ছিল না। কুরআন দ্বারা দুঃখ-চিন্তা হালকা হয়- যদি কোন ব্যক্তি উহা নীচু স্বরে তেলাওয়াত করে থাকে। জোরে চিৎকার করে বা মাইক্রোফোনের মাধ্যমে পাঠ করলে এরূপ হয় না। কেননা উচ্চস্বরে পাঠ করলে সমস্ত মানুষ তা শুনে থাকে এমনকি খেলা-ধুলায় লিপ্ত লোকদের কানেও তা পৌঁছে কিন্তু তারা তার প্রতি গুরুত্বারোপ করে না।এমনকি আপনি দেখবেন যারা গান-বাদ্য শুনে তাদের কাছেও ঐ কুরআনের আওয়াজ পৌঁছে। তারা গানও শুনছে কুরআনও শুনছে। ফলে তারা যেন এই কুরআনকে ঠাট্টা ও তাচ্ছিল্যের বিষয়ে পরিণত করেছে। কুরআনের অবমাননা করছে।

আর শোক-সমবেদনা জানাতে ও আগত লোকদের স্বাগত জানানোর জন্য মৃতের পরিবারের নিকট সমবেত হওয়া একটি বিদআত। অনুরূপভাবে মৃতের বাড়ীতে ভোজের আয়োজন করাও একটি বিদআত। কেননা বিষয়টি নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)এর যুগে পরিচিত ছিল না। তবে চলতে ফিরতে, মসজিদে বাজারে মৃতের পরিবারকে শোক জানানোতে কোন অসুবিধা নেই। মৃতের পরিবারের পক্ষ থেকে তার বাড়িতে সমবেত লোকদের জন্য খাদ্য প্রস্তুত করাকে ছাহাবায়ে কেরাম নিষিদ্ধ নিয়াহা বা ‘মৃতের জন্য বিলাপ’ এর অন্তর্ভূক্ত বলেছেন। আর মৃতের জন্য বিলাপ করা কাবীরা গুনাহ। কেননা নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিলাপকারীনী ও বিলাপ শ্রবণকারীনীকে লা‘নত করেছেন। তিনি বলেন,

কুরআন তিলাওয়াত বা অন্যান্য ইবাদাতের সাওয়াব কি মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছে?



প্রথম ফতোয়া

প্রশ্ন : সূরা ইখলাস পাঠ করে কেউ যদি মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, তাহলে মৃত ব্যক্তি কি উপকৃত হবে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কি করতেন, কবরবাসীর জন্য তিনি কি তিলাওয়াত করতেন, না শুধু দোয়া করতেন?

উত্তর :
প্রথমত : কেউ যদি কুরআন তিলাওয়াত করে মৃত ব্যক্তিকে ঈসালে সাওয়াব করে, আলেমদের বিশুদ্ধ মতানুযায়ী এ সাওয়াব মৃত ব্যক্তির নিকট পৌঁছায় না, কারণ এটা মৃত ব্যক্তির আমল নয়। আল্লাহ তাআলা বলেছেন :
﴿وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَى﴾
{আর এই যে, মানুষ যা চেষ্টা করে, তাই সে পায়।} {সূরা নাজম: ৩৯}
এ তিলাওয়াত জীবিত ব্যক্তির চেষ্টা বা আমল, এর সাওয়াব সে নিজেই পাবে, অন্য কাউকে সে ঈসালে সাওয়াব করার অধিকার রাখে না। এ সংক্রান্ত সৌদি আরবের “ইলমি গবেষণা ও ফতোয়ার স্থায়ী ওলামা পরিষদ” এর একটি বিস্তারিত ফতোয়া রয়েছে, নিচে তা উল্লেখ করা হলো :

প্রশ্ন : কবর জিয়ারতের সময় সূরা ফাতেহা পাঠ করা, অথবা কুরআনের কোন অংশ পাঠ করা কি বৈধ, আর এর দ্বারা সে কি উপকৃত হবে ?

উত্তর :
বিশুদ্ধ হাদিস থেকে প্রমাণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করতেন এবং কিছু বাক্য দ্বারা তিনি কবরবাসীদের জন্য দু‘আ করতেন, যা তিনি সাহাবাদের শিখিয়েছেন, তারাও তার থেকে শিখে নিয়েছে। যেমন :
‏السلام عليكم اهل الديار من المؤمنين والمسلمين، وانا ان شاء الله بكم لاحقون، نسال الله لنا ولكم العافية‏
হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলমানগণ, তোমাদের উপর সালাম, ইনশাআল্লাহ অতিসত্বর আমরা তোমাদের সাথে মিলিত হবো, আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য ও তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি।” [ইবনে মাজাহ : ১৫৩৬]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবর যিয়ারত করার সময় কুরআন বা তার কোন আয়াত তিলাওয়াত করেছেন এমন প্রমাণিত নয়, অথচ তিনি খুব কবর যিয়ারত করতেন। যদি তা বৈধ হত বা মৃতরা তার দ্বারা উপকৃত হত, তাহলে অবশ্যই তিনি তা করতেন এবং সাহাবাদের নির্দেশ দিতেন। বরং নবুওয়তের দায়িত্ব আদায়, উম্মতের প্রতি দয়া ও সাওয়াবের বিবেচনায় এটা তার কর্তব্য ছিল। কারণ, তার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন :

Sunday, 25 January 2015

মা-বাবার মৃত্যুর পর তাদের জন্য করণীয় আমলসূমহ


إن الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:
মা-বাবা ছোট শব্দ, কিন্তু এ দুটি শব্দের সাথে কত যে আদর, স্নেহ, ভালবাসা রয়েছে তা পৃথিবীর কোন মাপযন্ত্র দিয়ে নির্ণয় করা যাবে না। মা-বাবা কত না কষ্ট করেছেন, না খেয়ে থেকেছেন, অনেক সময় ভাল পোষাকও পরিধান করতে পারেন নি, কত না সময় বসে থাকতেন সন্তানের অপেক্ষায়। সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছেন, তারাই বুঝেন মা বাবা কত বড় সম্পদ। যেদিন থেকে মা বাবা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন সেদিন থেকে মনে হয় কী যেন হারিয়ে গেল,তখন বুক কেঁপে উঠে, চোখ থেকে বৃষ্টির মত পানি ঝরে, কী শান্তনাই বা তাদেরকে দেয়া যায়!  সেই মা বাবা যাদের চলে গিয়েছে তারা কি মা-বাবার জন্য কিছুই করবে না?। এত কষ্ট করে আমাদের কে যে মা-বাবা লালন পালন করেছেন তাদের জন্য আমাদের কি কিছুই করার নেই? অবশ্যই আছে। আলোচ্য প্রবন্ধে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে মৃত মা-বাবা জন্য কী ধরনের আমল করা যাবে এবং যে আমলের সওয়াব তাদের নিকট পৌছবে তা উল্লেখ করা হলো: 

১. বেশী বেশী দু‘আ করা  
মা-বাবা দুনিয়া থেকে চলে যাওয়ার পর সন্তান মা-বাবার জন্য বেশী বেশী দু‘আ করবে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে দু‘আ করার নির্দেশ দিয়েছেন এবং কী দু‘আ করবো তাও শিক্ষা দিয়েছেন । আল-কুরআনে এসেছে,
﴿ رَبِّ ٱرۡحَمۡهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرٗا ٢٤ ﴾ [الاسراء: ٢٤]  
‘‘হে আমার রব, তাদের উভয়ের প্রতি রহম কর, যেমন তারা আমাকে শৈশবকালে লালন-পালন করেছেন’’ [সূরা বানী ইসরাঈলঃ ২৪] 
﴿رَبَّنَا ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ يَوۡمَ يَقُومُ ٱلۡحِسَابُ ٤١﴾ [ابراهيم: ٤١]  
‘‘হে আমাদের রব, রোজ কিয়ামতে আমাকে, আমার পিতা-মাতা ও সকল মুমিনকে ক্ষমা করে দিন’’ [সুরা ইবরাহীম ঃ৪১]। এছাড়া আলস্নাহ রাববুল আলামীন পিতা-মাতার জন্য দূ‘আ করার বিশেষ নিয়ম শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেনঃ
﴿ رَّبِّ ٱغۡفِرۡ لِي وَلِوَٰلِدَيَّ وَلِمَن دَخَلَ بَيۡتِيَ مُؤۡمِنٗا وَلِلۡمُؤۡمِنِينَ وَٱلۡمُؤۡمِنَٰتِۖ وَلَا تَزِدِ ٱلظَّٰلِمِينَ إِلَّا تَبَارَۢا ٢٨ ﴾ [نوح: ٢٨]  
‘হে আমার রব! আমাকে, আমার পিতা-মাতাকে, যে আমার ঘরে ঈমানদার হয়ে প্রবেশ করবে তাকে এবং মুমিন নারী-পুরুষকে ক্ষমা করুন এবং ধ্বংস ছাড়া আপনি যালিমদের আর কিছুই বাড়িয়ে দেবেন না ’[সূরা নুহ: ২৮] । 

বিভিন্ন প্রকারের “খতম” এর বিদ’আত



আমাদের সমাজে বিভিন্ন প্রকারের ‘খতম’ প্রচলিত আছে। এধরনের “খতমের” নিয়ম, ফজীলত ইত্যাদির বিবরণ ‘মকসুদুল মোমিনীন’‘নাফেউল খালায়েক’ ইত্যাদি বিভিন্ন বইয়ে পাওয়া যায়। সাধারণত, দুটি কারণে ‘খতম’ পাঠ করা হয়:

(১) বিভিন্ন বিপদাপদ কাটানো বা জাগতিক ফল লাভ;

(২) মৃতের জন্য সাওয়াব পাঠানো।

উভয় প্রকারের খতমই ‘বানোয়াট’ ও ভিত্তিহীন। এ সকল খতমের জন্য পঠিত বাক্যগুলি অধিকাংশই খুবই ভাল বাক্য। এগুলি কুরআনের আয়াত বা সুন্নাহ সম্মত দোয়া ও যিকর। কিন্তু এগুলি এক লক্ষ বা সোয়া লক্ষ বার পাঠের কোনো নির্ধারিত ফযীলত, গুরুত্ব বা নির্দেশনা কিছুই কোনো সহীহ বা যয়ীফ হাদীসে বলা হয় নি। এ সকল ‘খতম’ সবই বানোয়াট। উপরন্তু এগুলিকে কেন্দ্র করে কিছু হাদীসও বানানো হয়েছে। ‘বিসমিল্লাহ’ খতম, দোয়া ইউনুস খতম, কালেমা খতম ইত্যাদি সবই এ পর্যায়ের। বলা হয় ‘সোয়া লাখ বার ‘বিসমিল্লাহ’ পড়লে অমুক ফল লাভ করা যায়’ বা ‘সোয়া লাখ বার দোয়া ইউনূস পাঠ করলে অমুক ফল পাওয়া যায়’ ইত্যাদি। এগুলি সবই ‘বুজুর্গ’দের অভিজ্ঞতার আলোকে বানানো এবং কোনোটিই হাদীস নয়।

তাসমিয়া বা (বিসমিলাহ), তাহলীল বা (লা ইলাহা ইলালাহ) ও দোয়া ইউনুস- এর ফযীলত ও সাওয়াবের বিষয়ে সহীহ হাদীস রয়েছে। তবে এগুলি ১ লক্ষ, সোয়া লক্ষ ইত্যাদি নির্ধারিত সংখ্যায় পাঠ করার বিষয়ে কোনো হাদীস বর্ণিত হয় নি। “খতমে খাজেগানের” মধ্যে পঠিত কিছু দোয়া সুন্নাহ সম্মত ও কিছু দোয়া বানানো। তবে পদ্ধিতিটি পুরোটাই বানানো।

প্রচলিত বিভিন্ন খতম: তাৎপর্য ও পর্যালোচনা (২য় পর্ব)


  
১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

খতম শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ

      খতম’ শব্দটি মূলত আরবী ‘ ختم   শব্দের বাংলা ব্যবহার। যার মূল অর্থ হচ্ছে : কোনো বস্তুতে মোহর লাগানো বা তাকে সিলযুক্ত করা। কর্ম যুগে শব্দটির অর্থ হয়কাজটি শেষ করা। এভাবে বিভিন্ন শব্দযোগে তার বিভিন্ন অর্থ হয় যেমনমাটি দ্বারা মুখ বন্ধ করাএড়িয়ে যাওয়াহৃদয়ে মোহর এঁটে দেওয়া তথা অবুঝ করে দেওয়াকোনো বস্তুর শেষে পৌঁছা ইত্যাদি। কিতাব বা কুরআন শব্দযোগে তার অর্থ হয়: সম্পূর্ণটুকু পড়ে শেষ করা।[30]    
      কুরআনে শব্দটি ক্রিয়ামুলে শুধুমাত্র হৃদয়ে মোহর এঁটে দেওয়ার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন :
﴿ خَتَمَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمۡ وَعَلَىٰ سَمۡعِهِمۡۖ وَعَلَىٰٓ أَبۡصَٰرِهِمۡ غِشَٰوَةٞۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ٧ ﴾ [البقرة: ٧]
‘‘আল্লাহ তাদের হৃদয়ে ও কানে মোহর এঁটে দিয়েছেনআর তাদের চোখের উপর রয়েছে আবরণ রয়েছে’’[31]
      তবে বিভিন্ন হাদীসে ختم’ শেষ করা অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যেমন আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পড়াসুরাটি শেষ পর্যন্ত পড়া ইত্যাদি শব্দ হাদীসে ব্যবহার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পড়া বলতে যেমন পুরোটা পড়া বুঝায়তেমনি যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত পৌছলেও এ শব্দ ব্যবহার হয়। এ ক্ষেত্রে পুরো সূরা পড়া উদ্দেশ্য নয়। যেমনইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসেতিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘুম থেকে উঠে মিসওয়াক ও ওযু করার পর সূরা আলে ইমরানের ১৯০ নং আয়াত থেকে পড়তে শুনেনঅতঃপর ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন :

প্রচলিত বিভিন্ন খতম: তাৎপর্য ও পর্যালোচনা (২য় পর্ব)


  
১ম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

খতম শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ

      খতম’ শব্দটি মূলত আরবী ‘ ختم   শব্দের বাংলা ব্যবহার। যার মূল অর্থ হচ্ছে : কোনো বস্তুতে মোহর লাগানো বা তাকে সিলযুক্ত করা। কর্ম যুগে শব্দটির অর্থ হয়কাজটি শেষ করা। এভাবে বিভিন্ন শব্দযোগে তার বিভিন্ন অর্থ হয় যেমনমাটি দ্বারা মুখ বন্ধ করাএড়িয়ে যাওয়াহৃদয়ে মোহর এঁটে দেওয়া তথা অবুঝ করে দেওয়াকোনো বস্তুর শেষে পৌঁছা ইত্যাদি। কিতাব বা কুরআন শব্দযোগে তার অর্থ হয়: সম্পূর্ণটুকু পড়ে শেষ করা।[30]    
      কুরআনে শব্দটি ক্রিয়ামুলে শুধুমাত্র হৃদয়ে মোহর এঁটে দেওয়ার অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। যেমন :
﴿ خَتَمَ ٱللَّهُ عَلَىٰ قُلُوبِهِمۡ وَعَلَىٰ سَمۡعِهِمۡۖ وَعَلَىٰٓ أَبۡصَٰرِهِمۡ غِشَٰوَةٞۖ وَلَهُمۡ عَذَابٌ عَظِيمٞ ٧ ﴾ [البقرة: ٧]
‘‘আল্লাহ তাদের হৃদয়ে ও কানে মোহর এঁটে দিয়েছেনআর তাদের চোখের উপর রয়েছে আবরণ রয়েছে’’[31]
      তবে বিভিন্ন হাদীসে ختم’ শেষ করা অর্থে ব্যবহার হয়েছে। যেমন আয়াতটি শেষ পর্যন্ত পড়াসুরাটি শেষ পর্যন্ত পড়া ইত্যাদি শব্দ হাদীসে ব্যবহার হয়েছে। শেষ পর্যন্ত পড়া বলতে যেমন পুরোটা পড়া বুঝায়তেমনি যে কোনো জায়গা থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত পৌছলেও এ শব্দ ব্যবহার হয়। এ ক্ষেত্রে পুরো সূরা পড়া উদ্দেশ্য নয়। যেমনইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত হাদীসেতিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘুম থেকে উঠে মিসওয়াক ও ওযু করার পর সূরা আলে ইমরানের ১৯০ নং আয়াত থেকে পড়তে শুনেনঅতঃপর ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন :

প্রচলিত বিভিন্ন খতম: তাৎপর্য ও পর্যালোচনা (১ম পর্ব)



সূচিপত্র

বিষয়                                           
ভূমিকা                                                  
সুন্নাতের পরিচয় ও গুরুত্ব                                 
সুন্নাতের পরিচয়                                          
সুন্নাতের উপর অবিচল থাকার গুরুত্ব
বিদআতের পরিচয় ও পরিণাম:
বিদআতের সংজ্ঞা                                         
বিদআতের পরিণাম                                       
খতম শব্দের অর্থ ও প্রয়োগ                               
খতমে কুরআন                                           
খতমে ইউনুস                                           
খতমে বুখারী                                            
খতমে না-রী                                             
খতমে ইয়াসিন                                           
খতমে শিফা                                             
খতমে তাহলিল                                           
খতমে তাসমিয়াহ                                         
খতমে খাজেগান                                         
খতমে জালালী                                           
খতমে দুরুদে মাহি                               
ইখলাস দ্বারা কুরআন খতম                      
অভিজ্ঞতা বনাম ধর্মীয় বিশ্বাস                      
পরিশেষ                                         
গ্রন্থপঞ্জি তালিকা
                            

প্রচলিত বিভিন্ন খতম: তাৎপর্য ও পর্যালোচনা

ভূমিকা
      সমস্ত প্রশংসা মহান রাব্বুল আলামিনেরযিনি আমাদেরকে তাঁর শ্রেষ্ঠ মাখলুক হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল মুহাম্মদ rএর উম্মত বানিয়েছেন। দিয়েছেন সর্বশ্রেষ্ঠ চিরস্থায়ী কিতাব আল-কুরআন। এ দুইয়ের মাধ্যমে আমাদেরকে সর্বদা ও সর্বত্র কার্যকর বিধানের ধারক বাহক বানিয়েছেন। আমাদের উপর মহান আল্লাহর এসব নেয়ামত অপরিসীম। এক নবীর পর যখন আরেক নবী নতুন দীন নিয়ে আসেনএক কিতাবের পর যখন আরেক কিতাব নতুন কিছু বিধান নিয়ে অবতীর্ন হয়তখন স্বভাবত উম্মতের মধ্যেই দুই শ্রেণি হয়ে যেতে দেখে যায়। এক শ্রেণি নতুন নবীর উপর ঈমান আনেনফলে তারা মুমিনই থাকেন। আরেক শ্রেণি নতুন নবীকে মিথ্যুক আখ্যায়িত করে বেঈমান বা কাফের হয়ে যায়। আল্লাহর কৃপায় সর্বশেষ নবীর উম্মত হওয়ার সৌভাগ্যে আমরা এমন পরীক্ষামুক্ত। না নতুন নবী আসবেননা কোনো নতুন বিধান আসবে। নতুন কোনো দীন বা পদ্ধতির অনুসরণ করব কি করব না এই ঝামেলায় আমাদেরকে কখনো পড়তে হয় না। যে নবীর মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর দীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন সেই নবীর উম্মত হতে পারা কতই বড় সোভাগ্যের কথা তা পূর্বের উম্মতের ইতিহাস নিয়ে একটু চিন্তা করলেই বুঝে আসবে। তাই আল্লাহ আমাদেরকে এই বড় নেয়ামত প্রদানের জন্য আবারো তাঁর শুকরিয়া আদায় করছি।

প্রশ্ন: আমি শুনেছি ‘গণতন্ত্র’ ইসলাম থেকে নেয়া হয়েছে। এ কথাটা কি ঠিক? গণতন্ত্রের পক্ষে প্রচারণা করার হুকুম কি?


উত্তর:
 আলহামদুলিল্লাহ।
 এক:
ডেমোক্রেসি (গণতন্ত্র) আরবী শব্দ নয়। এটি গ্রিক ভাষার শব্দ। দুটি শব্দের সমন্বয়ে শব্দটি গঠিত: Demos অর্থ- সাধারণ মানুষ বা জনগণ। আর দ্বিতীয় শব্দটি হচ্ছে-KRATIA অর্থ- শাসন। অতএব, ডেমোক্রেসি শব্দের অর্থ হচ্ছে- সাধারণ মানুষের শাসন অথবা জনগণের শাসন।
 দুই:
গণতন্ত্র ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক একটি তন্ত্র। এই তন্ত্রে আইন প্রণয়নের ক্ষমতা জনগণের হাতে অথবা তাদের নিযুক্ত প্রতিনিধি (পার্লামেন্ট সদস্য) এর হাতে অর্পণ করা হয়। তাই এ তন্ত্রের মাধ্যমে গায়রুল্লাহর শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়; বরং জনগণ ও জনপ্রতিনিধির শাসন প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ তন্ত্রে জনপ্রতিনিধিদের সকলে একমত হওয়ার দরকার নেই। বরং অধিকাংশ সদস্য একমত হওয়ার মাধ্যমে এমন সব আইন জারী করা যায় জনগণ যেসব আইন মেনে চলতে বাধ্য; এমনকি সে আইন যদি মানব প্রকৃতি, ধর্ম, বিবেক ইত্যাদির সাথে সাংঘর্ষিক হয় তবুও। উদাহরণতঃ এই তন্ত্রের অধীনে গর্ভপাত করা, সমকামিতা, সুদি মুনাফার বিধান ইত্যাদি জারী করা হয়েছে। ইসলামি শাসনকে বাতিল করা হয়েছে। ব্যভিচার ও মদ্যপানকে বৈধ করা হয়েছে। বরং এই তন্ত্রের মাধ্যমে ইসলাম ও ইসলামপন্থীদেরকে প্রতিহত করা হয়। অথচ আল্লাহ তাআলা তাঁর কিতাবে জানিয়েছেন, হুকুম বা শাসনের মালিক একমাত্র তিনি এবং তিনিই হচ্ছেন- উত্তম হুকুমদাতা বা শাসক। পক্ষান্তরে অন্যকে তাঁর শাসনে অংশীদার করা থেকে নিষেধ করেছেন এবং জানিয়েছেন তাঁর চেয়ে উত্তম বিধানদাতা কেউ নেই। আল্লাহ তাআলা বলেন (ভাবানুবাদ): “অতএব, হুকুম দেওয়ার অধিকার সুউচ্চ ও সুমহান আল্লাহর জন্য” [সূরা গাফের, আয়াত: ১২] আল্লাহ তাআলা আরও বলেন (ভাবানুবাদ): “আল্লাহ ছাড়া কারো বিধান দেওয়ার অধিকার নেই। তিনি আদেশ দিয়েছেন যে, তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত করো না। এটাই সরল পথ। কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না।”।[সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৪০] আল্লাহ তাআলা আরও বলেন: “আল্লাহ কি

Friday, 23 January 2015

সালাম ও তার বিধি-বিধান





ভূমিকা


الحمد لله رب العالمين وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله  وعلى آله وأصحابه أجمعين، 
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য যিনি সমগ্র সৃষ্টিকুলের রব্ব। আর আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো হক্ক ইলাহ নেই তিনি একক তাঁর কোনো শরীক নেই এবং আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রাসূল। সালাত ও সালাম নাযিল হোক তার উপর তার পরিবার-পরিজন ও সকল সাহাবীর উপর। 

হে পাঠক ভাইয়েরা! ‘আসসালামু আলাইকুম ওরাহ মাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ আল্লাহ তোমাদের দয়া করুক! 

তোমরা অবশ্যই একটি কথা মনে রাখবে, মুসলিমদের মধ্যে সালামের প্রচার-প্রসার ইসলামের একটি মহান ঐতিহ্য ও বিশেষ সৌন্দর্য। আর সালাম পরস্পর সালাম বিনিময় করা একজন মুসলিমের উপর অপর মুসলিমের অধিকার ও দায়িত্ব। এ ছাড়াও সালাম বিনিময় করা ঈমানের জন্য আবশ্যকীয় বিষয়-মুসলিমদের মধ্যে পরস্পর মহব্বত ও ভালোবাসা- যা একজন মুসলিমকে জান্নাতে নিয়ে যায়, তা সৃষ্টির কারণ হয়। যেমন- আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু’ হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন,   
«لا تدخلوا الجنة حتى تؤمنوا، ولا تؤمنوا حتى تحابوا، ألا أدلكم على شيء إذا فعلتموه تحاببتم؟ أفشوا السلام بينكم» رواه مسلم
“তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে না, আর আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি জিনিস বাতলায়ে দেব যা করলে তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো বাসবে? এ কথার উত্তরে তিনি বলেন, তোমারা বেশি বেশি করে সালামকে প্রসার কর”। [বর্ণনায় মুসলিম] 

‘আস-সালাম’ আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ হতে একটি অন্যতম নাম এবং এটি জান্নাতের নামসমূহ হতে একটি জান্নাতের নাম। জান্নাতিরা জান্নাতে পরস্পরকে সালাম দ্বারা সম্বোধন করবেন এবং তাদের পরস্পরের শুভেচ্ছা বিনিময় হবে ‘সালাম’। মনে রাখবে, তুমি যখন একজন মুসলিম ভাইকে (السلام عليكم ورحمة الله وبركاته) বললে, এ কথার অর্থ হল, তুমি তোমার একজন মুসলিম ভাইয়ের জন্য শান্তি, সমৃদ্ধি, রহমত ও বরকতের জন্য দো‘আ করলে এবং তার জন্য যাবতীয় কল্যাণ কামনা করলে। সালামের আদান-প্রদান দ্বারা মুসলিমদের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় ও শক্তিশালী হয় এবং পারস্পরিক মহব্বত বৃদ্ধি পায়। তাদের মধ্য হতে পারস্পরিক হিংসা বিদ্বেষ ও দুশমনি দূর হয়। সালামের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে মিল-মহব্বত ও ভালোবাসার বীজ বপন করা হয়। সালাম ব্যাপক করা দ্বারা একজন মুসলিম বিনয়ী হয়; তার মধ্যে কোন প্রকার অহংকার থাকে না। সে কারো উপর বড়াই করে না। যে ব্যক্তি সালাম দেয়, সে ছোট বড়, ধনী দরিদ্র, সম্মানী অসম্মানী, চেনা অচেনা সবাইকে সালাম দেয়।

Thursday, 22 January 2015

প্রশ্নঃ ‘আয়াতুল কুরসি’ এবং ‘আল্লাহর কুরসী’ বলতে কি বোঝায়? আয়াতুল কুরসীর ফযীলত কি?


উত্তরঃ সুরা বাক্বারাহর ২৫৫ নাম্বার আয়াতকে ‘আয়াতুল কুরসী’ বলা হয়। কুরসী অর্থ হচ্ছে আল্লাহ্‌ তাআ’লার পা রাখার জায়গা। আয়াতুল কুরসীতে তাওহীদ, ইখলাস, আল্লাহর ইসমে আযম, আল্লাহর ক্ষমতা ও সিফাত, ‘আল্লাহর কুরসির’ মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় বর্ণিত হয়েছে। এইজন্যে এই আয়াতটি হচ্ছে ক্বুরানুল কারীমের শ্রেষ্ঠ আয়াত এবং সহীহ হাদিসে এই আয়াতটি বিভিন্ন সময়ে পাঠ করার অনেক ফযীলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। অনেকে মনে করেন, আয়াতুল কুরসী হচ্ছে সুরা বাক্বারাহর ২৫৫ ও ২৫৬ নাম্বার, এই দুইটা আয়াত। এটা ভুল! সুরা বাক্বারাহর শুধুমাত্র ২৫৫ নাম্বার আয়াতটিকেই আয়াতুল কুরসি বলা হয়, ২৫৬ নাম্বার আয়াত আয়াতুল কুরসির অন্তর্ভুক্ত নয়।
আয়াতুল কুরসী নিয়মিত পড়লে তাবীজ-কবজ, যাদু, চোখের নজর, জিনের আসর বা ক্ষতি ও অন্যান্য বিপদ আপদ থেকে সুরক্ষা করে। প্রত্যেক ফরয নামাযের পরে একবার করে আয়াতুল কুরসি পড়লে মৃত্যুর পরে রয়েছে জান্নাত। শয়তানের প্রভাব এবং ভূত-প্রেত থেকে বাঁচার জন্য আয়াতুল কুরসি পাঠ করা পরীক্ষিত একটি আমল।
আয়াতুল কুরসী হচ্ছে ক্বুরানুল কারীমের শ্রেষ্ঠ বা সবচাইতে মর্যাদাবান আয়াতঃ
আবু জর জুনদুব ইবনে জানাদাহ (রাঃ) নবী করিমকে (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আপনার প্রতি সবচেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন কোন আয়াতটি নাজিল হয়েছে? রাসূল (সাঃ) বললেন, “আয়াতুল কুরসি”।
নাসায়ি, আহমাদ।
প্রত্যেক ফরয সালাত শেষে আয়াতুল কুরসী পাঠ করার ফযীলতঃ
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয সালাতের পর ‘আয়াতুল কুরসী পাঠ করে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখতে পারবেনা”।
নাসায়ী, ইবনু হিব্বান, হাদীস সহীহ, ইমাম ইবনে হিব্বান ও শায়খ আলবানী।
ঘুমানোর পূর্বে আয়াতুল কুরসী পাঠ করার ফযীলতঃ
ক. সকাল পর্যন্ত তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন হেফাজতকারী (ফেরেশতা) তাকে নিরাপত্তা দেবে।
খ. শয়তান তার কাছে আসতে পারবেনা।

Wednesday, 21 January 2015

প্রশ্ন: বিয়ের রুকন ও শর্ত কি কি?


উত্তর:
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য। 
ইসলামে বিয়ের রুকন বা খুঁটি তিনটি: 
এক:
বিয়ে সংঘটিত হওয়ার ক্ষেত্রে সমূহ প্রতিবন্ধকতা হতে বর-কনে উভয়ে মুক্ত হওয়া। যেমন- বর-কনে পরস্পর মোহরেম হওয়া; ঔরশগত কারণে হোক অথবা দুগ্ধপানের কারণে হোক। বর কাফের কিন্তু কনে মুসলিম হওয়া, ইত্যাদি। 
দুই:
ইজাব বা প্রস্তাবনা: এটি মেয়ের অভিভাবক বা তার প্রতিনিধির পক্ষ থেকে পেশকৃত প্রস্তাবনামূলক বাক্য। যেমন- বরকে লক্ষ্য করে বলা যেতে পারে আমি অমুককে তোমার কাছে বিয়ে দিলাম অথবা এ ধরনের অন্য কোন কথা। 
তিন:
কবুল বা গ্রহণ: এটি বর বা বরের প্রতিনিধির পক্ষ থেকে সম্মতিসূচক বাক্য। যেমন- বর বলতে পারেন আমি গ্রহণ করলাম  অথবা এ ধরনের অন্য কোন কথা। 
বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্তগুলো নিম্নরূপ: 
(১) ইশারা করে দেখিয়ে দেয়া কিংবা নামোল্লেখ করে সনাক্ত করা অথবা গুণাবলী উল্লেখ অথবা অন্য কোন মাধ্যমে বর-কনে উভয়কে সুনির্দিষ্ট করে নেয়া।

অহংকার থেকে মুক্তির উপায়




প্রশ্ন: কিভাবে একজন মানুষ অহংকার থেকে মুক্তি পেতে পারে?
উত্তর:
আলহামদুলিল্লাহ।
এক:
অহংকার একটি খারাপ গুণ। এটি ইবলিস ও দুনিয়ায় তার সৈনিকদের বৈশিষ্ট্য; আল্লাহ যাদের অন্তর আলোহীন করে দিয়েছেন।
সর্বপ্রথম আল্লাহ ও তাঁর সৃষ্টির উপর যে অহংকার করেছিল সে হচ্ছে— লানতপ্রাপ্ত ইবলিস। যখন আল্লাহ তাকে নির্দেশ দিলেন— আদমকে সেজদা কর; তখন সে অসম্মতি জানিয়ে বলল: “আমি তার চেয়ে উত্তম। আমাকে বানিয়েছেন আগুন দিয়ে; তাকে বানিয়েছেন মাটি দিয়ে।” আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করলাম, এরপর আকার-অবয়ব তৈরি করেছি। অতঃপর আমি ফেরেশতাদেরকে বললাম— আদমকে সেজদা কর; তখন সবাই সেজদা করল। কিন্তু ইবলিস সেজদাকারীদের মধ্যে ছিল না। আল্লাহ বললেন: আমি যখন তোকে সেজদা করার আদেশ দিলাম তখন কিসে তোকে সেজদা করতে বাধা দিল? সে বলল: আমি তার চেয়ে উত্তম। আমাকে বানিয়েছেন আগুন দিয়ে; তাকে বানিয়েছেন মাটি দিয়ে।” [সূরা আরাফ, আয়াত: ১১-১২]
তাই অহংকার ইবলিসি চরিত্র। যে ব্যক্তি অহংকার করতে চায় সে জেনে রাখুক সে শয়তানের চরিত্র গ্রহণ করেছে। সে সম্মানিত ফেরেশতাদের চরিত্র গ্রহণ করেনি, যারা আল্লাহর আনুগত্য করে সেজদায় লুটিয়ে পড়েছিল।
অহংকার অহংকারীর জান্নাত থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ, ইজ্জতের মালিক আল্লাহকে সরাসরি দেখতে না পাওয়ার কারণ। দলিল হচ্ছে এ দুইটি হাদিস:

Tuesday, 20 January 2015

ফরয নামাযের পর হাত তুলে মুনাজাত প্রসঙ্গে



নামাযী যখন নামায পড়ে তখন সে আল্লাহর নিকট মুনাজাত করে। আল্লাহর সাথে নিরালায় যেন কানে কানে কথা বলে। (মুঅত্তা, মুসনাদে আহ্‌মদ ২/৩৬, ৪/ ৩৪৪)

নামাযের মাঝেই আব্দ (দাস) মাবুদের (প্রভুর) ধ্যনে ধ্যানমগ্ন থাকে। যেন সে তাকে দেখতে পায়। যতক্ষণ সে নামাযে থাকে ততক্ষণ সে আল্লাহর সাথে কথা বলে। তিনি তার প্রতি মুখ ফিরান এবং সালাম না ফিরা পর্যন্ত তিনি মুখ ফিরিয়ে নেন না। (বাইহাকী, সহীহুল জামে’১৬১৪ নং)

পরক্ষণে যখনই সে সালাম ফিরে দেয় তখনই সে মুনাজাতের অবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, দূর হয়ে যায় নৈকট্যের বিশেষ যোগসূত্র। বান্দা সরে আসে সেই মহান বিশ্বাধিপতির খাস দরবার থেকে। সুতরাং তার নিকট কিছু চাওয়া তো সেই সময়ে অধিক শোভনীয় যে সময়ে ভিখারী বান্দা তাঁর ধ্যনে তার নিকটে ও তাঁর খাস দরবারে থাকে। অতএব সেই নৈকট্যের ধ্যান ভঙ্গ করে এবং মহানবী (সাঃ) এর নির্দেশিত মুনাজাত থেকে বেরিয়ে এসে পুনরায় মুনাজাত সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত নয়।

অবশ্য সহীহ হাদীসে বর্ণিত যে, 
একদা সাহাবাগণ আল্লাহর রসূল (সাঃ) কে কোন্‌ সময় দুআ অধিকরুপে কবুল হয় - সে বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেছিলেন, “গভীর রাতের শেষাংশে এবং সকল ফরয নামাযের পশ্চাতে।” (তিরমিযী, সুনান ৩৪৯৯, নাসাঈ, সুনান আমালুল ইয়াউমি অল্লাইলাহ্‌ ১০৮নং, মিশকাত ৯৬৮ নং) হাদীসটি অনেকের নিকট দুর্বল হলেও আসলে তা হাসান। (তিরমিযী, সুনান২৭৮২নং)

সুতরাং এটাই হ্‌চ্ছে ফরয নামাযের পর মুনাজাত করার প্রায় সহীহ ও সব চেয়ে বড় দলীল, যদিও এতে হাত তুলে দুআর কথা নেই। এইখান হতেই ধোকা খেয়ে মুনাজাত-প্রেমীরা উদ্ভাবন করেছেন যে, ‘ফরয নামাযের পর দুআ কবুল হয়। আর হাত তুলে দুআ করলে আল্লাহ খালি হাতে ফিরিয়ে দেন না। তাছাড়া নামাযের পর লোক ও জামাআত বেশী থাকে। আর জামাআতী দুআ বেশী কবুল হয়।’ ইত্যাদি।

পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর মুনাজাত



আমাদের দেশে বলতে গেলে ভারতীয় উপমহাদেশে পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের পর দুআ-মুনাজাতের প্রচলন দেখা যায়। এ বিষয় এখন কিছু আলোচনা করার ইচ্ছা করছি।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত শেষে দুআ কবুল হওয়ার কথা বহু সহীহ হাদীস থেকে প্রমাণিত। তাহলে এ নিয়ে বিতর্ক কেন? আসলে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর দুআ নিয়ে বিতর্ক নয়, বিতর্ক হল এর পদ্ধতি নিয়ে। যে পদ্ধতিতে দুআ করা হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বা তাঁর সাহাবায়ে কেরাম এভাবে দুআ করেছিলেন কি-না? তাই আমি এখানে আলোচনা করব সে দুআ-মুনাজাত নিয়ে যার মধ্যে নিম্নোক্ত সবকটি শর্ত বিদ্যমান :

এক. পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের পর দুআ করা।

দুই. যে দুআ-মুনাজাত জামাআতের সঙ্গে করা হয়।

তিন. প্রতিদিন প্রতি ফরজ সালাত শেষে দুআ-মুনাজাত করা।
এ শর্তাবলী বিশিষ্ট দুআ-মুনাজাত কতটুকু সুন্নাত সম্মত সেটাই এ অধ্যায়ের মূল আলোচ্য বিষয়।

পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ সালাত আদায়ের পর প্রচলিত মুনাজাত করা না করার ব্যাপারে আমাদের দেশের লোকদের সাধারণত তিন ভাগে বিভক্ত দেখা যায়।

এক. যারা ছালাম ফিরানোর পর বসে বসে কিছুক্ষণ যিকর-আযকার আদায় করেন, যা সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

দুই. যারা ছালাম ফিরানোর পর যিকির-আযকার না করে তাড়াতাড়ি দাঁড়িয়ে যান সুন্নাত নামায আদায়ের জন্য।

তিন. যারা ছালাম ফিরানোর পর সর্বদা ইমাম সাহেবের সঙ্গে একত্রে মুনাজাত করেন। এবং মুনাজাত শেষ হওয়ার পর সুন্নাত নামায আদায় করেন।
আর এ তিন ধরনের লোকদেরই এ সকল আমলের সমর্থনে কোনো না কোনো দলীল প্রমাণ রয়েছে। হোক তা শুদ্ধ বা অশুদ্ধ। স্পষ্ট বা অস্পষ্ট।

ফরয সালাতের পরে সম্মিলিত মুনাজাত: একটি প্রচলিত বিদ'আত



আমাদের সমাজে যতগুলি বিদ’আত প্রচলিত আছে, তার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে ফরয সালাতের পর সম্মিলিত মুনাজাত। এই সম্মিলিত মুনাজাতের দলীল নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে পাওয়া যায় না । কোন কোন বিদ’আত বছরে একবার করা হয় , কোন কোনটি হয়ত মাসে একবার , কোন কোনটি হয়তো সপ্তাহে একবার । কিন্তু সম্মিলিত মুনাজাত এমন এক বিদ’আত যা প্রতিদিন পাঁচবাব করা হয় । সুতরাং এর থেকে দুরে থাকতে হবে ।
হাদীসে বর্ণিত ফরয সালাতের পর পঠিতব্য দুআ ও যিকিরগুলো এককী পড়তে হবে, দলবদ্ধভাবে নয় । কারণ, হাদীসে এ ক্ষেত্রে পঠিতব্য দুআগুলো প্রায়ই সবই এক বচনের শব্দে এসেছে । দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ভারত বর্ষের প্রায় সকল মুসলিম জনগণ (আলিম ও সাধারণ) নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক সালাতের পর পঠিতব্য দুআর তালিকাটি আংশিক বা পুরোপুরি বাদ দিয়ে নিজেরাই বিভিন্ন দুআ নির্বাচন ও সংযুক্ত করেছে। এর সাথে আরো যোগ করেছে দলবদ্ধ ও সম্মিলিত রুপ । ফলে সালাতের পরে দুআর নামে সম্মিলিত মুনাজাতের মাধ্যমে অনেকগুলো সুন্নাত উৎখাত হয়েছে । প্রথমতঃ যে সুন্নাতটি উঠেছে সেটা হল, ফরয সালাতের পর যে নির্দিষ্ট কিছু দুআ ও যিকির রয়েছে এটার জ্ঞানই অধিকাংশ লোকের নেই । যার জন্য ওগুলো কন্ঠস্থ করার সুযোগ তাদের হয়নি । ঐ সকল দুআ ও যিকির সম্বলিত হাদীসগুলো পড়ার কিম্বা ইমাম সাহেবের মাধ্যমে শোনার অবকাশ হয়নি বা নেই । এখন আমি যে সকল স্থানে হাত তুলে দোয়া করা যায় তা সহীহ হাদীসের মাধ্যমে তুলে ধরবোঃ

যে সকল স্থানে হাত তুলে দোয়া করা যায়

(১) বৃষ্টি প্রার্থনার জন্যঃ
আনাস ইবনু মালিক (রাঃ) হ’তে বর্ণিত তিনি বলেন , নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় এক বছর দুর্ভিক্ষ দেখা দিল । সে সময় একদিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুৎবা প্রদানকালে জনৈক বেদুঈন উঠে দাঁড়াল এবং আরয করল , হে আল্লাহর রাসূল ! বৃষ্টি না হওয়ার কারণে সম্পদ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে , পরিবার পরিজন অনাহারে মরছে । আপনি আমাদের জন্য দোয়া করুন । অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় হস্তদয় উত্তোলন পূর্বক দোয়া করলেন । সে সময় আকাশে কোন মেঘ ছিল না । (রাবী বলেন) আল্লাহর কসম করে বলছি, তিনি হাত না নামাতেই পাহাড়ের মত মেঘের খন্ড এসে একত্র হয়ে গেল এবং তার মিম্বার থেকে নামার সাথে সাথেই ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল । এভাবে দিনের পর দিন ক্রমাগত পরবর্তি জুম’আ পর্যন্ত হ’তে থাকল । অতঃপর পরবর্তি জুম’আর দিনে সে বেদুঈন অথবা অন্য কেউ দাঁড়িয়ে বলল, হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অতি বৃষ্টিতে আমাদের বাড়ীঘর ভেঙ্গে পড়ে যাচ্ছে, ফসল ডুবে যাচ্ছে । অতএব আপনি আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য দোয়া করুন । তখন তিনি দু’হাত তুললেন এবং বললেন, ‘হে আল্লাহ ! আমাদের পার্শ্ববর্তি এলাকায় বৃষ্টি দাও , আমাদের এখানে নয় । এ সময় তিনি স্বীয় আঙ্গুলী দ্বারা মেঘের দিকে ইশারা করছিলেন । ফলে সেখান থেকে মেঘ কেটে যাচ্ছিল । ( বুখারী , প্রথম খন্ড , পৃঃ ১২৭ , হা/৯৩৩ জুম’আর সালাত’ অধ্যায়)
একই বিষয় সম্পর্কিত আরও হাদীস দেখুন – বুখারী প্রথম খন্ড , পৃঃ ১৪০ , হা/১০২৯ ‘ইস্তিস্কা’ অধ্যায় ।

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...