Saturday, 9 August 2014

ছুমামাহর প্রতি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর উত্তম আচরণের অনুপম নিদর্শন


আবু  হুরায়রা  (রা:)  হ’তে  বর্ণিত  তিনি  বলেন,  একবার  রাসূল  (সাঃ) নাজদের দিকে কিছু অশ্বারোহী (সৈন্য) পাঠালেন। তারা বনী হানীফা গোত্রের জনৈক ব্যক্তিকে ধরে আনল। তার নাম ছুমামাহ বিন উছাল।সে ইয়ামামাবাসীদের সরদার। তারা তাকে মসজিদে নববীর একটি খুঁটির সাথে বেঁধে রাখল।

Friday, 8 August 2014

ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর। কারণ,তুমি তো সালাত আদায় করনি।

সহিহ আত্ তিরমিজি ::  সালাত অধ্যায়
অধ্যায় ২ :: হাদিস ৩০২
আলী ইবন হুজর () .......... রিফাআ ইবন রাফি রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণনা যে, একদিন রাসূল মসজিদে বসা ছিলেন। আমরাও তাঁর সঙ্গে বসা ছিলাম। এমন সময় বেদুঈনের মত দেখতে এক ব্যক্তি আসল। সে হালকাভাবে সালাত আদায় করল এবং তা শেষ করে রাসূল -কে এসে সালাম জানাল। রাসূল তাকে ওয়া আলাইকা জানিয়ে বললেন : ফিরে, আবার সালাত আদায় কর। কারণ, তুমি তো সালাত আদায় করনি। লোকটি ফিরে গেল। সালাত আদায় করে আবার এসে সালাম জানাল। রাসূল তাকে ওয়া আলাইকা জানালেন এবং বললেন : ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর। তুমি তো সালাত আদায় করনি। এইরূপ দুই বা তিনবার ঘটল। প্রত্যেকবারই লোকটি রাসূল -এর কাছে  এসে সালাম জানাচ্ছিল আর তিনি তাকে ওয়া আলাইকা জানিয়ে বলেছিলেন : ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর। কারণ,তুমি তো সালাত আদায় করনি।
 উপস্থিত লোকেরা বিষয়টিকে খুবই ভীষণ মনে করল। কেউ হালকা সালাত পড়লে তার সালাতই হবে না- এই বিষয়টি তাদের জন্য খুবই মারাত্মক লাগল। যা হোক, শেষে লোকটি বলল : আমাকে শিখিয়ে দিন, আমাকে দেখিয়ে দিন। আমি তো একজন মানুষ। অনেক সময় ঠিকও করি, ভুলও করি।
 রাসূল বললেন : হ্যাঁ, শোন, সালাতের  জন্য যখন দাঁড়াবে এর আগে আল্লাহর নির্দেশমত উযূ করে নিবে। এরপর আযান দিবে, ইকামতও দিবে। পরে কুরআনের কিছু যদি মুখস্থ থাকে তবে তা পড়বে। তা না থাকলে আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করবে। অতঃপর রুকূ করবে এবং খুব ধীর স্থিরভাবে রুকূ করবে, পরে সোজা হয়ে দাঁড়াবে, পরে সিজদা করবে এবং তাতে ই’তিদাল বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে। পরে ধীর স্থিরভাবে উঠে বসবে। পরে উঠে দাঁড়াবে। এইরূপ করতে পারলে তবে তোমার সালাত পূর্ণ হবে। এতে যদি কিছু ক্রটি হয় তবে তোমার সালাতও ততটুকু ক্রটিপূর্ণ হবে।
 রিফাআ বলেন : ‘‘ এতে যতটুকু ক্রটি হবে সালাতও ততটুকু ক্রটিপূর্ন হবে’’-এই কথা উপস্থিত লোকদের নিকট প্রথম কথার তুলনায় অনেকটা সহজ মনে হল। কারণ, এই ক্ষেত্রে তো আগের মত পুরো সালাত বাতিল বলে গণ্য হবে না।

قَالَ وَفِي الْبَاب عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَعَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ رِفَاعَةَ بْنِ رَافِعٍ حَدِيثٌ حَسَنٌ وَقَدْ رُوِيَ عَنْ رِفَاعَةَ هَذَا الْحَدِيثُ مِنْ غَيْرِ وَجْهٍ
এই বিষয়ে আবূ হুরায়রা এবং আম্মার ইবন ইয়াসর রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে।
ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী রহ.  () বলেন: রিফআ ইব্নে রাফি রাদিয়াল্লাহু আনহ বর্ণিত হদীসটি হাসান।
রিফাআ রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে একাধিক সূত্রে এই হাদীসটি বর্ণিত আছে।

Jami at-Tirmidhi :: What Has Been Related About The Description Of The Salat
Part 2 :: Hadith 302
Rifa'ah bin Tafi narrated:

"One day Allah's Messenger was sitting in the Masjid" Rifa'ah said: "And we were with him. Then what appeared to be a Bedouin man entered to pray, but he performed his Salat in a very brief manner. He then got up and greeted the prophet with Salam. The Prophet said (returning the greeting): 'And upon you. Go back and perform Salat, for indeed you have no prayed.' So he returned to perform Salat then came and greeted the Prophet with Salam. So he (the Prophet) said (returning the greeting): 'And upon you. Go back and perform Salat, for indeed you have not prayed.' [He did that] two or three times, each time coming to the Prophet, greeted the Prophet with Salam and the Prophet saying: 'And upon you. Go back and perform Salat, for indeed you have not prayed.' - until the people got scared and became very worried that one whose prayer was so brief had not actually prayed. Then in the end the man said: 'Then show me, and teach me, for I am a human who has suffered and is mistaken.' So he said: 'Alright. When you stand for Salat then perform Wudu as Allah ordered you. Then say the Tashahhud, and the Iqamah as well. If you know any Quran then recite it, if not then praise Allah, mention His greatness, and the Tahlil. Then bow such that you are at rest in your bowing, then stand completely, then prostrate completely, then sit such that you are at rest while sitting them stand. When you have done that, then you have completed your Salat, and if you leave out something, then you have made your Salat deficient.' And this was easier on them than the first matter, because if some of this was deficient, It would only reduce the reward of his Salat, it would not have gone entirely. "

ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর। কারণ,তুমি তো সালাত আদায় করনি।

সহিহ আত্ তিরমিজি ::  সালাত অধ্যায়
অধ্যায় ২ :: হাদিস ৩০২
আলী ইবন হুজর () .......... রিফাআ ইবন রাফি রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে বর্ণনা যে, একদিন রাসূল মসজিদে বসা ছিলেন। আমরাও তাঁর সঙ্গে বসা ছিলাম। এমন সময় বেদুঈনের মত দেখতে এক ব্যক্তি আসল। সে হালকাভাবে সালাত আদায় করল এবং তা শেষ করে রাসূল -কে এসে সালাম জানাল। রাসূল তাকে ওয়া আলাইকা জানিয়ে বললেন : ফিরে, আবার সালাত আদায় কর। কারণ, তুমি তো সালাত আদায় করনি। লোকটি ফিরে গেল। সালাত আদায় করে আবার এসে সালাম জানাল। রাসূল তাকে ওয়া আলাইকা জানালেন এবং বললেন : ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর। তুমি তো সালাত আদায় করনি। এইরূপ দুই বা তিনবার ঘটল। প্রত্যেকবারই লোকটি রাসূল -এর কাছে  এসে সালাম জানাচ্ছিল আর তিনি তাকে ওয়া আলাইকা জানিয়ে বলেছিলেন : ফিরে যাও, আবার সালাত আদায় কর। কারণ,তুমি তো সালাত আদায় করনি।
 উপস্থিত লোকেরা বিষয়টিকে খুবই ভীষণ মনে করল। কেউ হালকা সালাত পড়লে তার সালাতই হবে না- এই বিষয়টি তাদের জন্য খুবই মারাত্মক লাগল। যা হোক, শেষে লোকটি বলল : আমাকে শিখিয়ে দিন, আমাকে দেখিয়ে দিন। আমি তো একজন মানুষ। অনেক সময় ঠিকও করি, ভুলও করি।
 রাসূল বললেন : হ্যাঁ, শোন, সালাতের  জন্য যখন দাঁড়াবে এর আগে আল্লাহর নির্দেশমত উযূ করে নিবে। এরপর আযান দিবে, ইকামতও দিবে। পরে কুরআনের কিছু যদি মুখস্থ থাকে তবে তা পড়বে। তা না থাকলে আলহামদু লিল্লাহ, আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পাঠ করবে। অতঃপর রুকূ করবে এবং খুব ধীর স্থিরভাবে রুকূ করবে, পরে সোজা হয়ে দাঁড়াবে, পরে সিজদা করবে এবং তাতে ই’তিদাল বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করবে। পরে ধীর স্থিরভাবে উঠে বসবে। পরে উঠে দাঁড়াবে। এইরূপ করতে পারলে তবে তোমার সালাত পূর্ণ হবে। এতে যদি কিছু ক্রটি হয় তবে তোমার সালাতও ততটুকু ক্রটিপূর্ণ হবে।
 রিফাআ বলেন : ‘‘ এতে যতটুকু ক্রটি হবে সালাতও ততটুকু ক্রটিপূর্ন হবে’’-এই কথা উপস্থিত লোকদের নিকট প্রথম কথার তুলনায় অনেকটা সহজ মনে হল। কারণ, এই ক্ষেত্রে তো আগের মত পুরো সালাত বাতিল বলে গণ্য হবে না।

قَالَ وَفِي الْبَاب عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ وَعَمَّارِ بْنِ يَاسِرٍ قَالَ أَبُو عِيسَى حَدِيثُ رِفَاعَةَ بْنِ رَافِعٍ حَدِيثٌ حَسَنٌ وَقَدْ رُوِيَ عَنْ رِفَاعَةَ هَذَا الْحَدِيثُ مِنْ غَيْرِ وَجْهٍ
এই বিষয়ে আবূ হুরায়রা এবং আম্মার ইবন ইয়াসর রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকেও হাদীস বর্ণিত আছে।
ইমাম আবূ ঈসা তিরমিযী রহ.  () বলেন: রিফআ ইব্নে রাফি রাদিয়াল্লাহু আনহ বর্ণিত হদীসটি হাসান।
রিফাআ রাদিয়াল্লাহু আনহ থেকে একাধিক সূত্রে এই হাদীসটি বর্ণিত আছে।

Jami at-Tirmidhi :: What Has Been Related About The Description Of The Salat
Part 2 :: Hadith 302
Rifa'ah bin Tafi narrated:

"One day Allah's Messenger was sitting in the Masjid" Rifa'ah said: "And we were with him. Then what appeared to be a Bedouin man entered to pray, but he performed his Salat in a very brief manner. He then got up and greeted the prophet with Salam. The Prophet said (returning the greeting): 'And upon you. Go back and perform Salat, for indeed you have no prayed.' So he returned to perform Salat then came and greeted the Prophet with Salam. So he (the Prophet) said (returning the greeting): 'And upon you. Go back and perform Salat, for indeed you have not prayed.' [He did that] two or three times, each time coming to the Prophet, greeted the Prophet with Salam and the Prophet saying: 'And upon you. Go back and perform Salat, for indeed you have not prayed.' - until the people got scared and became very worried that one whose prayer was so brief had not actually prayed. Then in the end the man said: 'Then show me, and teach me, for I am a human who has suffered and is mistaken.' So he said: 'Alright. When you stand for Salat then perform Wudu as Allah ordered you. Then say the Tashahhud, and the Iqamah as well. If you know any Quran then recite it, if not then praise Allah, mention His greatness, and the Tahlil. Then bow such that you are at rest in your bowing, then stand completely, then prostrate completely, then sit such that you are at rest while sitting them stand. When you have done that, then you have completed your Salat, and if you leave out something, then you have made your Salat deficient.' And this was easier on them than the first matter, because if some of this was deficient, It would only reduce the reward of his Salat, it would not have gone entirely. "

মুহাম্মাদ (সাঃ)-ই একমাত্র শাফা‘আঁতকারী

 রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-



হযরত আনাস (রা:) হ’তে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ(সাঃ) এরশাদ করেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুমিনগণকে (হাশরের ময়দানে স্ব স্ব অপরাধের কারণে) বন্দী রাখা হবে। তাতে তারা অত্যন্ত চিন্তিত ও অস্থির হয়ে পড়বে এবং বলবে, ‘যদি আমরা আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্‌ তা‘আলার নিকট কারো মাধ্যমে সুপারিশ কামনা করি, যিনি আমাদের বর্তমান অবস্থা থেকে স্বস্তি দিবেন ।’সেই লক্ষ্যে তারা আদম (আঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বলবে, ‘আপনি মানবজাতির পিতা আদম, আপনাকে আল্লাহ্‌ নিজ হাতে সৃষ্টি করেছেন, জান্নাতে বসবাস করিয়েছেন, ফেরেশতা মন্ডলীকে দিয়ে আপনাকে সিজদা করিয়েছিলেন এবং তিনিই যাবতীয় বস্তুর নাম আপনাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন।আপনি আমাদের জন্য আপনার রবের নিকট সুপারিশ করুন, যেন তিনি আমাদেরকে এই কষ্টদায়ক স্থান হ’তে মুক্ত করে প্রশান্তি দান করেন ।’তখন  আদম  (আঃ)  বলবেন,  ‘আমি  তোমাদের  এই  কাজের মোটেই উপযুক্ত নই’।
নবী করীম (সাঃ) বলেন, তখন তিনি গাছ হ’তে ফল খাওয়ার অপরাধের কথা স্মরণ করবেন, যা হ’তে তাঁকে নিষেধ করা হয়েছিল। [আদম (আঃ) বলবেন] ‘বরং  তোমরা  মানবজাতির  জন্য  আল্লাহ্‌  তা‘আলার  প্রেরিত  সর্বপ্রথম নবী নূহ (আঃ)-এর নিকট যাও’।
তারা নূহ (আঃ)-এর কাছে গেলে  তিনি  তাদেরকে  বলবেন,  ‘আমি  তোমাদের  এ  কাজের  জন্য একেবারেই যোগ্য নই ।’ সাথে সাথে তিনি তাঁর ঐ অপরাধের কথা স্মরণ করবেন, যা অজ্ঞতাবশত: নিজের (অবাধ্য) ছেলেকে পানিতে  না ডুবানোর জন্য আল্লাহ্‌ কাছে প্রার্থনা করেছিলেন। (তিনি বলবেন) ‘বরং তোমরা আল্লাহ্‌ খলীল হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকটে যাও’।
রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেন, এবার তারা হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর নিকটে যাবে। তখন তিনি বলবেন , ‘আমি তোমাদের এ কাজের জন্য কিছুই করার ক্ষমতা রাখি না ।’ সাথে সাথে তাঁর তিনটি মিথ্যা উক্তির কথা স্মরণ করবেন এবং বলবেন, ‘বরং তোমরা মূসা (আঃ)-এর কাছে যাও। তিনি আল্লাহ্‌র এমন এক  বান্দা,  যাকে  আল্লাহ্‌  তাওরাত  দান  করেছেন,  তার  সাথে বাক্যালাপ করেছেন এবং গোপন কথাবার্তার মাধ্যমে তাঁকে নৈকট্য দান করেছেন’।
রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, তখন তারা সকলে হযরত মূসা (আঃ) এর নিকটে আসলে তিনি বলবেন, ‘আমি তোমাদের জন্য সুপারিশের ক্ষেত্রে অপারগ।’তখন তিনি সেই প্রাণনাশের অপরাধের কথা স্মরণ করবেন, যা তাঁর হাতে সংঘটিত হয়েছিল এবং বলবেন, ‘বরং তোমরা আল্লাহ্‌র বান্দা ও তাঁর মনোনীত রাসূল, তাঁর কালেমা ও রূহ হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে যাও।’নবী করীম (সাঃ) বলেন, তখন তারা সবাই হযরত ঈসা (আঃ)-এর কাছে গেলে তিনি বলবেন, ‘আমি তোমাদের এ কাজের উপযুক্ত নই।বরং তোমরা মুহাম্মাদ (সাঃ)-এর কাছে যাও।তিনি আল্লাহ্‌ তা‘আলার এমন এক  বান্দা,  যার  আগের  ও  পরের  সমস্ত  গোনাহ  আল্লাহ্‌  ক্ষমা  করে দিয়েছেন।

আবূ নাজীহ (রা:)-এর ইসলাম গ্রহণ



রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার
আবূ নাজীহ আমর ইবনু আবাসাহ আস-সুলামী (রা:) বলেন, জাহেলী যুগ আমি ধারণা করতাম যে, লোকেরা পথভ্রষ্টতার উপর রয়েছে এবং এরা কোন ধর্মেই নেই। আর ওরা প্রতিমা পূজা করছে। অতঃপর আমি এক ব্যক্তির ব্যাপারে শুনলাম যে, তিনি মক্কায় অনেক আশ্চর্য খবর বলছেন। সুতরাং আমি আমার সওয়ারীর উপর বসে তাঁর কাছে এসে দেখলাম যে, তিনি আল্লাহ্‌র রাসূল (সাঃ)।
তিনি গোপনে (ইসলাম প্রচার করছেন), আর তাঁর সম্প্রদায় (মুশরিকরা) তাঁর প্রতি দুর্ব্যবহার করছে। সুতরাং আমি বিচক্ষণতার সাথে কাজ করলাম। আমি মক্কায় তাঁর কাছে পরামর্শ করলাম। অতঃপর আমি তাঁকে বললাম, আপনি কে?

লোক দেখানো আমলের ভয়াবহ পরিণতি



রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

সংকলন ও প্রকাশনায় : কুরআনের আলো টিম
আবু হুরায়রা (রা:) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম যে ব্যক্তির বিচার করা হবে, সে হবে একজন (ধর্মযুদ্ধে শাহাদাত বরণকারী) শহীদ। তাকে আল্লাহ্‌র নিকট উপস্থিত করা হবে। অতঃপর আল্লাহ্‌ পাক তাকে (দুনিয়াতে প্রদত্ত) নেয়ামতসমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন। আর সেও তা স্মরণ করবে। এরপর আল্লাহ্‌ তাআলা তাকে জিজ্ঞেস করবেন, দুনিয়াতে তুমি কি আমল করেছ? উত্তরে সে বলবে, আমি তোমার সন্তুষ্টির জন্য (কাফেরদের সাথে) লড়াই করেছি। এমনকি শেষ পর্যন্ত শহীদ হয়েছি। তখন আল্লাহ্‌ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ, বরং তোমাকে যেন বীর-বাহাদুর বলা হয়, সেজন্য তুমি লড়াই করেছ। আর (তোমার অভিপ্রায়  অনুযায়ী)  তোমাকে  দুনিয়াতে তা  বলাও  হয়েছে। অতঃপর তার ব্যাপারে আদেশ দেওয়া হবে। তখন তাকে উপুড় করে টেনে-হিঁচড়ে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

মসজিদের আদব



রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখক : আখতারুজ্জামান মুহাম্মদ সুলাইমান

238
ইসলামে মসজিদ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অন্যান্য ধর্মের উপাসনাগৃহগুলোর মত মসজিদ নিছকই কোন উপাসনাগৃহ নয়। তাত্ত্বিক এবং ব্যাবহারিক ও ঐতিহাসিকভাবে তা এর থেকে ভিন্ন কিছু, নিজস্ব বৈশিষ্ট্য-সমৃদ্ধ। মসজিদ ব্যক্তি মুসলমানের উপাসনার পবিত্র স্থান। কিন্তু মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ নানা সামাজিক ভূমিকাও পালন করেছে। মসজিদ ছিল মুসলমানদের প্রধান শিক্ষালয়। সামাজিক আদালত। এগুলো নিছক কোন প্রতীকী ব্যাপার নয়। যে জাতির উপাসনাগৃহ হয় তার শিক্ষালয় ও আদালত, জীবনের সর্বক্ষেত্রে ধর্মপালন সে জাতির জন্য অনেক সহজ ও অর্থপূর্ণ হয়ে উঠে। অন্যান্য ধর্মে তার উপাসনা ক্ষেত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করে বিশেষ একটি ধর্মশ্রেণী। এই ধর্মগুলোর ইতিহাসে, এর ফলে, বিভিন্ন ধরনের আধ্যাত্মিক ও সামাজিক বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। এর একটি বিমূর্ত উদাহরণ খৃষ্টধর্মের চার্চ ব্যবস্থা। কিন্তু ইসলামে এই ধরনের নিয়ন্ত্রণের কোনো ধারণা ও ইতিহাস নেই। খুবই অর্থপূর্ণভাবে ইসলাম মনে করে মসজিদ পবিত্রমত ঘর। যে কোনো মুসলমান এই ঘরের নির্মাণ করে, তা আবাদ করে বিশেষ সওয়াব হাসিল করতে পারে। মসজিদ নির্মাণ ও আবাদের ব্যাপারে ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে। এবং ইসলাম মনে করে বিশাল সুরম্য স্থাপত্য নির্মাণ নয়, সালাত আদায় ও জিকিরের মাধ্যমে মসজিদকে জীবন্ত রাখাই মূলত মসজিদ নির্মাণ বা আবাদ করা। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য, মুসলিম সমাজে মসজিদ আর এই গুরুত্ব বহন করছে না। মসজিদ তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব হারিয়েছে। এর প্রধান কারণ ইসলামে মসজিদের অবস্থান কী? মুসলিম সমাজে মসজিদ কী ভূমিকা পালন করবে, মসজিদের আদাব বিধানাবলী — এই সম্পর্কে সঠিক ধারণা ও জ্ঞানের অভাব। এখানে মূলত সংক্ষেপে এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
মসজিদের অবস্থান
ইসলামের ভাবনায় মসজিদের বিশেষ ও অপরিসীম গুরুত্ব রয়েছে। এই গুরুত্ব নানা কারণ ও পেক্ষাপটকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়েছে। নিম্নে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হল —
এক.মসজিদ আল্লাহর ঘর, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন -
ما اجتمع قوم في بيت من بيوت الله…. (رواه مسلم : 4867)
কোন সম্প্রদায় যখন আল্লাহর ঘরে একত্রিত হয় (মুসলিম:হাদীস নং ৪৮৬৭) আল্লাহ তাআ’লা আরো বলেন,
وأن المساجد لله فلا تدعوا مع الله أحداً. (الجن:18)
এবং মসজিদ মূলত আল্লাহর। সুতরাং আল্লাহর সাথে তোমরা অন্য কাউকে ডেক না। [জ্বিন : ১৮]
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে মসজিদের সম্মান ও পবিত্রতাকে শীর্ষাবস্থান দেয়ার উদ্দেশেই সম্মানসূচক ভাষায় মসজিদকে আল্লাহর ঘর বলে ডাকা হয়েছে।
দুই. মসজিদ পৃথিবীতে সর্বোত্তম জায়গা এবং আল্লাহ তা‌আলার সবচেয়ে প্রিয় স্থান। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أحب البلاد إلى الله مساجدها وأبغض البلاد إلى الله أسواقها (رواه مسلم :1076)
আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম জায়গা মসজিদ, আর সবনিকৃষ্ট জায়গা। [ মুসলিম: হাদীস নং ১০৭৬]
তিন. মসজিদ ফরয সালাত আদায়ের স্থান, যা ইসলামের দ্বিতীয় ভিত্তি।
চার. মুসলিম সমাজের সদস্যরা প্রতিদিন পাঁচবার মসজিদে সমবেত হয় এবং পরস্পরের সাথে পরিচিত হয়। এভাবে সমাজের অন্যসব সদস্যদের সাথে একটি পুত-হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলায় মসজিদ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
পাচ. ইসলামে মসজিদের যে বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব, তার অন্যতম প্রমাণ মদিনায় হিজরতের পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বিষয়টির প্রতি সর্বপ্রথম মনোযোগ আরোপ করেন, তা ছিল মুসলমানদের জন্য একটি মসজিদ নির্মাণ করা। আর এভাবেই স্থাপিত হয়েছিল মদীনার প্রথম মসজিদ।
মসজিদ নির্মাণের ফযীলত
ইসলাম মুসলমানদেরকে ব্যাপকভাবে মসজিদ নির্মাণে উৎসাহিত করেছে, তার জন্য বিশেষ ছাওয়াব ঘোষণা করেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন- যে আল্লার সন্তুষ্টির উদ্দেশে মসজিদ তৈরি করলো আল্লাহ তা‌আলা তার জন্য জান্নাতে মসজিদের মত একটি ঘর তৈরি করে দিবেন। [তিরমিযী :হাদীস নং ২৯২]
সঠিক নিয়তে মসজিদ নির্মাণ করলে জান্নাতে যাওয়া যাবে- হাদীসটি প্রকারান্তরে এই সুসংবাদই বহন করছে। তবে ইসলামের ভাবনায় বস্তুগতভাবে মসজিদ নির্মাণ ও আবাদের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে অর্থগতভাবে তা অবাদ করা। আর মসজিদের সেই প্রকৃত নির্মাণকর্ম হল সালাত, যিকির ইত্যাদির মাধ্যমে মসজিদ আবাদ রাখা। মসজিদের এই প্রকৃত আবাদকারীর জন্য ইসলামে অনেক পুরস্কারের কথা এসেছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন (যে সকাল বিকাল মসজিদে যায়, প্রত্যেকবার যাতায়াতের বিনিময়ে জান্নাতে তার জন্য এক একটি ঠিকানা তৈরি করা হয়।)
পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন - তারাই তো আল্লাহর মসজিদ আবাদ করে, যারা ঈমান আনে, আল্লাহ ও আখেরাতে এবং সালাত কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ব্যতীত অন্য কাউকেও ভয় করে না। অতএব আশা করা যায়, তারা হবে সৎপথ প্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত। [ সূরা তাওবা: ১৮]
মসজিদের বিধানাবলী :
মসজিদের অনেক আদাব ও বিধান রয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল।
১. কারুকার্য বাদ দিয়ে বিল্ডিং সুন্দর বানানো, কেননা কারুকার্য করা একটি বিদ্‌আত কাজ। এতে নামাজীর মনোযোগ নষ্ট হয় এবং মসজিদ নির্মাণ নিয়ে সমাজে অহংকারমূলক প্রতিযোগিতার প্রবণতা ছড়িয়ে পড়ে। ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আমাকে মসজিদ সাজাতে নির্দেশ দেয়া হয়নি। ইবনে আব্বাস আরো বলেন, তারা অবশ্যই মসজিদসমূহ সাজাবে, যেমন ইহুদী ও খৃষ্টানরা করেছে।
ইমাম বোখারী রা. বলেন, উমার রা. মসজিদ বানাতে নির্দেশ দিলেন এবং বলেলেন, আমি মানুষকে বৃষ্টি থেকে হিফাজত করছি। সাবধান! লাল ও হলুদ রং করবে না। মানুষ ধোঁকায় পড়ে যাবে। আনাস রা. বলেন, মসজিদ বানানোর ব্যাপারে মানুষ প্রতিযোগিতা করবে, কিন্তু খুব কম লোকই মসজিদ আবাদ করবে।
২.কবরস্থানে মসজিদ তৈরি করা কিংবা মসজিদে কবর বানানো হারাম। কেননা কবরের তাযীম-সম্মান এমনকি ইবাদত শিরককর্মে নিপতিত হওয়ার মাধ্যম বনে যায়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, আল্লাহ তাআ’লার অভিশাপ ইহুদি ও খৃষ্টানদের উপর তারা তাদের নবীদের কবরকে মসজিদে পরিণত করেছে। [ বুখারী ও মুসলিম ]
জুন্দুব রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মৃত্যুর পূর্বে পাঁচটি অসিয়ত শুনেছেন, তন্মধ্যে একটি হল কবরকে মসজিদে রূপান্তরিত করা বিষয়ে হুঁশিয়ারি। বর্ণনায় এসেছে -
وإن من كان قبلكم كانوا يتخذون قبور أنبيائهم و صالحيهم مساجد ، ألا فلا تتخذوا القبور مساجد ، فإني أنهاكم عن ذلك  رواه مسلم
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন তোমাদের পূর্ববর্তীরা নবী ও সৎ লোকদের কবরকে মসজিদ বানাতো। সাবধান! তোমরা কবরকে মসজিদ বানিও না। আমি তোমাদেরকে এ থেকে নিষেধ করছি। কবরস্থানে জানাজার সালাত ব্যতীত অন্য কোন সালাত বৈধ নয়। [ মুসলিম]
৩. মসজিদ সর্বদা পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। মসজিদ অপবিত্র করা বা কষ্টদায়ক জিনিস সেখানে রাখা হারাম। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন - মসজিদে থুতু ফেলা অন্যায়, তার প্রতিকার হলো মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া। [ নাসায়ী : হাদীস নং ৭১৫]
যেখানে মাটি দিয়ে ঢেকে দেয়া সম্ভব নয়, সেখান থেকে দূর করে ফেলা। কেননা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাহি ওয়াসাল্লাম এ-রূপই করেতন ।
৪.মসজিদে ধীরে-সুস্থে ও শান্তভাবে যাওয়া। তাড়াতাড়ি বা দৌড়িয়ে না যাওয়া। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন,
যখন তোমরা সালাতে আসবে অবশ্যই ধীরস্থিরতা বজায় রাখবে । যে-টুকু পাবে আদায় করবে। আর যে-টুকু পাবেনা তা পূর্ণ করবে।   [বুখারী : হাদীস নং ৫৯৯]
৫.মসজিদে প্রবেশ করতে ডান পা দিয়ে প্রবেশ করবে। বের হবে বাম পা দিয়ে। আনাস রা. বলেন : সন্নত হল যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, ডান পা দিয়ে প্রবেশ করবে। আর যখন বের হবে বাম পা দিয়ে বের হবে।
প্রবেশের এবং বের হবার দোয়া পড়বে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন:
إذا دخل أحدكم المسجد فليقل اللهم افتح لي أبواب رحمتك وإذا خرج فليقل اللهم إني أسألك من فضلك. رواه مسلم : 1165
৬. মসজিদে আগে যাওয়া এবং প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের প্রতি আগ্রহী থাকা- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি উদ্বুদ্ধ করে বলেছেন : যদি মানুষ জানতে পারত, আযান এবং প্রথম কাতারে সালাত আদায়ের মধ্যে কি ফজিলত, আর তা লটারি ব্যতীত অর্জন করা সম্ভব না হত, তবে তার জন্য লোকেরা অবশ্যই লটারি করত। আর যদি জানতে পারত মসজিদে আগে আসার মধ্যে কি ফযীলত, তাহলে তার জন্য প্রতিযোগিতা করে আসত।        [বুখারী : হাদীস নং ৬১৫] আর যিনি মসজিদে আগে আসবেন, কোনো কারণ ছাড়া তার প্রথম কাতার বাদ দেয়া উচিত নয়। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ রা. বলেন,
যে ব্যক্তি আগে আসল এবং প্রথম কাতার বাদ দিয়ে বসল, সে শরীয়তের বিধান লঙ্ঘন করল।
সালাতে দেরি করে আসার দ্বারা বড় কল্যাণ থেকে নিজেকে বঞ্চিত করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন :তোমরা আগে এসো এবং আমার একতেদা করো। আর তোমাদের পরে যারা আসবে তারা তোমাদের পিছনে দাঁড়াবে। যেসব মানুষেরা দেরি করতে থাকবে আল্লাহ্ তাদেরকে পিছিয়ে দিবেন।  [মুসলিম : হাদীস নং ৬৬২]
সালাত আদায়ের উদ্দেশে মসজিদে আগে আসার উপকারিতা অনেক — জামাআত প্রথম থেকে পাওয়া, কুরআন তিলাওয়াত ও নফল সালাত আদায়ের সুযোগ। ফেরেশতাদের দোয়া লাভ; কেননা ফেরেশতাগণ এরূপ ব্যক্তির জন্য ক্ষমার দোয়া করতে থাকেন। সালাতের অপেক্ষায় থেকে সালাতের ছাওয়াব অর্জন। কারণ সালাতের অপেক্ষায় বসে থাকা যেন মূল সালাতেই নিমগ্ন থাকা।
৭. মসজিদে প্রবেশকারী দুই রাকাআত তাহিয়্যাতুল মাসজিদ আদায় ব্যতীত বসবে না।আবু কাতাদাহ আনসারী রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : তোমাদের মধ্যে কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে, দুই রাকাত সালাত আদায় না করে সে-যেন না বসে।     [মুসলিম : হাদীস নং ১০৯৭]
ইমাম জুমুআর খুৎবা দেয়া অবস্থায় মসজিদে প্রবেশ করলে সংক্ষেপে দুই রাকাত সালাত আদায় করবে। যাবের রা. রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণনা করেন, তোমাদের মধ্যে কেউ যখন মসজিদে প্রবেশ করবে আর ইমাম খুৎবাবস্থায় থাকবেন, তাহলেও যেন দুই রাকাআত সালাত সংক্ষেপে আদায় করে নেয়।
মসজিদে উচ্চস্বরে কথা বলা, সালাতরত ব্যক্তি বা কুরআন পাঠককে বিরক্ত করা মাকরূহ। চাই তা সাধারণ কথা বলার কারণে হোক বা উচ্চস্বরে তিলাওয়াত করার কারণে হোক। পার্শ্ববর্তীজনকে বরং কষ্ট দেয়াই অপরাধ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,
إن المصلى يناجي ربه فلينظر بما يناجيه ولا يجهر بعضكم على بعض بالقرآن . (رواه أحمد : 5096)
সালাত আদাকারী তার প্রভুর সাথে গোপনে কথা বলে। তাই, সে কী বলছে তার প্রতি খেয়াল রাখা উচিত । তোমরা কোরআন তেলওয়াতের মাধ্যমে একে অন্যের উপর উচ্চ শব্দ করোনা।
৮. মুক্তাদী সর্বদা ইমামের অনুসরণ করবে। কোনো কার্য ইমামের আগে অথবা একেবারে সাথে সাথে আদায় করবে না। আবার অনেক বিলম্বেও আদায় করবে না।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন : ইমাম বানানো হয়েছে তার অনুসরণের জন্য। অতঃপর তোমরা তার সাথে বিরোধ করো না। সে যখন আল্লাহু আকবার বলে তোমরাও আল্লাহু আকবার বলো। সে যখন রুকু করে, তোমরাও রুকুতে যাও । সে যখন سمع الله لمن حمده বলে, তোমরা اللهم ربنا و لك الحمد বলো। সে যখন সেজদা করে, তোমরাও তখন সেজদা করো। যখন বসে সালাত আদায় করে, তোমরাও সকলে বসে সালাত আদায় কর) [ বুখারী : হাদীস নং ৩৬৫) ইমামের পূর্বে কোন কাজ করা হারাম হওয়া সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
أما يخشى الذي يرفع رأسه قبل الإمام أن يحول الله رأسه رأس حمار أو صورته صورة حمار. رواه مسلم : 647
সে ব্যক্তি তার মাথা ইমামের পূর্বে উঠিয়ে ফেলে তার কি এ-ভয় নেই যে আল্লাহ তাআ’লা তার মাথাকে গাধার মাথা বানিয়ে দিবেন কিংবা তার আকৃতিকে গাধার আকৃতি বানিয়ে দিবেন।    [মুসলিম : হাদীস নং ৬৪৭] 

কাযী শুরাইহ-এর ন্যায়বিচার



রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

সংকলনে: আহমাদ আব্দুল্লাহ নাজীব        ওয়েব সম্পাদনাঃ মোঃ মাহমুদ ইবনে গাফফার
54
কাযী শুরাইহ বিন হারেছ আল-কিন্দী ইসলামের ইতিহাসে ন্যায়পরায়ণতা, বুদ্ধিমত্তা ও অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী এক অনন্যসাধারণ বিচারপতি ছিলেন। তিনি একাধারে ওমর, ওছমান, আলী এবং মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর শাসনামলে বিচারপতি পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ৬০ বছর যাবৎ বিচারকার্য পরিচালনার পর ৭৮ হিজরী সনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার নিরপেক্ষ বিচারের দীপ্তিমান ইতিহাস সর্বকালেই মানবজাতিকে প্রেরণা জুগিয়ে থাকে। নিম্নে তার দু’টি ঘটনা বিবৃত হ’ল-

[১] ইসলামের ২য় খলীফা ওমর (রাঃ) একদা এক ব্যক্তির নিকট থেকে ভালভাবে দেখেশুনে একটি ঘোড়া ক্রয় করলেন। অতঃপর ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে স্বীয় গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লেন। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পর ঘোড়াটি অসুস্থ হয়ে পড়ল এবং খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলতে লাগল।
ওমর (রাঃ) কালবিলম্ব না করে সরাসরি বিক্রেতার নিকটে ফিরে এলেন এবং তাকে বললেন, তুমি তোমার ঘোড়া ফিরিয়ে নাও, এটা ত্রুটিযুক্ত।
বিক্রেতা বলল, হে আমীরুল মুমিনীন! আমি ঘোড়াটি ফেরত নিব না, কেননা আপনি তা সুস্থ ও সবল অবস্থাতেই আমার নিকট থেকে ক্রয় করেছেন।
ওমর (রাঃ) বললেন, ঠিক আছে, তাহ’লে তোমার মাঝে ও আমার মাঝে একজন বিচারক নির্ধারণ করা হোক।
বিক্রেতা বললেন, ঠিক আছে, কাযী শুরাইহ আমাদের মাঝে ফায়ছালা করবেন।
ঘটনার বর্ণনাকারী শা‘বী বলেন, তারা উভয়েই শুরাইহের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হ’লেন এবং তার নিকটে পৌঁছে তাকে প্রকৃত ঘটনা বিবৃত করলেন। কাযী শুরাইহ ঘোড়ার মালিকের অভিযোগ শ্রবণ করে ওমর (রাঃ)-কে বললেন, আপনি কি ঘোড়াটিকে সবল ও সুস্থ অবস্থায় কিনেছিলেন? ওমর (রাঃ) বললেন, জি হ্যাঁ। বুদ্ধিমত্তা ও ন্যায়পরায়ণতার মূর্ত প্রতীক কাযী শুরাইহ ঘোষণা করলেন, হে আমীরুল মুমিনীন! আপনি যা ক্রয় করেছেন তা গ্রহণ করে সন্তুষ্ট হৌন অথবা যে অবস্থায় ঘোড়াটিকে গ্রহণ করেছিলেন সে অবস্থায় ফেরত প্রদান করুন। হতচকিত খলীফা মুগ্ধ দৃষ্টিতে কাযী শুরাইহের দিকে তাকিয়ে বললেন, হ্যাঁ! এটাই তো ন্যায়বিচার। হে বিচারপতি! আপনি কুফায় গমন করুন। আমি আপনাকে কুফার প্রধান বিচারপতি হিসাবে নিয়োগ দান করলাম।   (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়াহ ৯/২৫)


[২] ৪র্থ খলীফা আলী (রাঃ) একদিন বাজারে গিয়ে দেখেন, জনৈক খৃষ্টান লোক একটা লোহার বর্ম বিক্রি করছে।আলী (রাঃ) তৎক্ষণাৎ বর্মটি চিনে ফেললেন এবং বললেন, এ বর্ম তো আমার। চল, আদালতে তোমার ও আমার মধ্যে ফায়ছালা হবে। সেসময় ঐ আদালতের বিচারক ছিলেন কাযী শুরাইহ। তিনি যখন আমীরুল মুমিনীনকে আসতে দেখলেন, তখন তাঁর বসার স্থান থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং আলী (রাঃ)-কে নিজ স্থানে বসিয়ে তিনি তাঁর পাশে বসলেন।
আলী (রাঃ) বিচারপতি শুরাইহকে বললেন, এই ব্যক্তির সাথে আমার বিরোধ মিটিয়ে দিন। শুরাইহ বললেন, আমীরুল মুমিনীন! আপনার বক্তব্য কি? আলী বললেন, এই বর্মটি আমার। অনেক দিন হ’ল এটি হারিয়ে গেছে। আমি তা বিক্রয় করিনি, দানও করিনি।
শুরাইহ বললেন, ওহে খৃষ্টান! আমীরুল মুমিনীন যা বলছেন, সে ব্যাপারে তুমি কী বলতে চাও? সে বলল, আমি আমীরুল মুমিনীনকে মিথ্যাবাদিতার অভিযোগে অভিযুক্ত করছি না, তবে বর্মটি আমারই। শুরাইহ বললেন, বর্মটিতো এই ব্যক্তির দখলে রয়েছে। কোন প্রমাণ ছাড়া তার কাছ থেকে সেটা নেয়া যাবে বলে আমি মনে করি না। আপনার কাছে কোন প্রমাণ আছে কি?
আলী (রাঃ) হেসে ফেললেন এবং বললেন, শুরাইহ ঠিকই বলেছেন। আমার নিকট তো কোন প্রমাণ নেই। নিরুপায় শুরাইহ খৃষ্টানের পক্ষেই রায় দিলেন এবং সে বর্মটি গ্রহণ করে রওয়ানা হ’ল। কিন্তু কিছু দূর গিয়ে সে আবার ফিরে এল এবং বলল, আমি সাক্ষী দিচ্ছি যে, এটাই নবীদের বিধান ও শিক্ষা। আমীরুল মুমিনীন নিজের দাবী বিচারকের সামনে পেশ করেছেন, আর বিচারক তার বিপক্ষে রায় দিচ্ছেন। আল্লাহ্‌র কসম, হে আমীরুল মুমিনীন! এটা আপনারই বর্ম। আমি এটা আপনার কাছে বিক্রয় করেছিলাম। পরে তা আপনার মেটে রঙের উটটির উপর থেকে ছিটকে পড়ে গেলে আমি ওটা তুলে নেই। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ্‌ ছাড়া কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাঃ) আল্লাহর রাসূল।
আলী (রাঃ) বললেন, তুমি যখন মুসলমান হয়ে গেলে, তখন এ বর্ম এখন থেকে তোমার। অতঃপর আলী (রাঃ) তাকে ভাল দেখে একটা ঘোড়াও উপহার দিলেন এবং তাতে চড়িয়ে তাকে বিদায় দিলেন।
ইমাম শা‘বী বলেন, আমি পরবর্তীকালে এই নওমুসলমানকে নাহরাওয়ানের যুদ্ধে খারেজীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে দেখেছি। অপর বর্ণনায় শা‘বী বলেন, আলী (রাঃ) এছাড়া তার জন্য দু’হাযার দিরহাম ভাতাও নির্ধারণ করে দেন। অবশেষে এই ব্যক্তি ছিফফীনের যুদ্ধে আলী (রাঃ)-এর পক্ষে লড়াই করে শহীদ হন।    (বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা ১০/১৩৬ হা/২০২৫২, ১০/১৩৬; আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ ৮/৫)


শিক্ষা:

[1] ন্যায়বিচার মানবতাকে সমুন্নত করে।
[2] আল্লাহর আইনের সামনে রাজা-প্রজা সকলে সমান।
[3] ক্ষমাশীল আচরণ দিয়ে মানব হৃদয় জয় করা যায়।
[4] বিচারপতিকে বিচক্ষণ, মহৎ ও সৎসাহসী হ’তে হয়।
[5] ইসলামী খেলাফতে মুসলিম-অমুসলিম সকলের নাগরিক অধিকার সমান।

আজ বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে এলাম।

পুত্রসন্তান

রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

ফারজানা তান্নী 
আজ বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে দিয়ে এলাম।
মনটা একটু খারাপ লাগছে বটে! কিন্তু ভালোও লাগছে এই ভেবে যে একটা কাজ ভালোভাবে শেষ করতে পারলাম। বাবার প্রতি দায়িত্বও শেষ হলো। সংসারটা এবার নতুন করে গুছিয়ে নেব। বাবার ঘরটা গেস্টরুম বানাতে হবে। বাসায় একটা গেস্টরুম ছিল না বলে লুনার কত অভিযোগ—বাসায় গেস্ট এলে ওর নাকি মানসম্মান চলে যায়। ঠিকই তো বলেছে, গেস্টরুম একটা প্রয়োজন বৈকি! বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানোর বুদ্ধিটাও তার। আমারও যে মত ছিল না, তা নয়। বাবারও বোধ হয় এটাই ইচ্ছা ছিল। কারণ, তিনি আমাদের মতামতের কোনো বিরোধিতা করেননি। তা ছাড়া মায়ের মৃত্যুর পর বাবা খুবই নিঃসঙ্গ ছিলেন। আমি ও লুনা—দুজনই চাকরিজীবী, অফিসে যাই। বাবাকে কে সময় দেবে? ওখানে গিয়ে বাবা নিশ্চয়ই ভালো থাকবেন। সমবয়সী অনেককে পাবেন সঙ্গী হিসেবে। নাহ্, কাজটা ভালোই করেছি। আমার সব স্বপ্ন আমার পরিবারকে ঘিরে। লুনাকে ভালোবেসে বিয়ে করেছি। আমাদের দুজনের সংসারে অনাবিল আনন্দ বয়ে এনেছে আমাদের সোনার টুকরো ছেলে। তাকে পেয়ে আমার জীবনটা সত্যিই অন্য রকম হয়ে গেল। আমার সব মনোযোগ এখন স্ত্রী-পুত্রের দিকে। বাবা-মাকে দেখার সময় কই?
যেদিন মা মারা গেলেন, সেদিন একটু অপরাধবোধ মনে জেগেছিল। মনে হয়েছিল, আমার অবহেলার জন্যই কি মা চলে গেলেন? মা স্ট্রোক করেছিলেন। হয়তো ভেতরে ভেতরে আরও অসুখ দানা বেঁধেছিল, কিন্তু মুখ ফুটে কখনো কাউকে কিছু বলেননি তিনি। মাকে দেখতে তো সুস্থই দেখাত, তাই কখনো তাঁকে ডাক্তারের কাছে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করিনি।
বাবার বিষয়-সম্পত্তি তেমন ছিল না। তবে আমাদের একটা ছিমছাম একতলা বাড়ি ছিল। ছোটবেলা থেকে সেখানে বড় হয়েছি বলেই হয়তো বাড়িটা ভালোই মনে হতো। কিন্তু লুনা আধুনিক মেয়ে, ওর বাড়িটা পছন্দ হতো না মোটেই। বলত, পুরোনো, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। পরে ভেবে দেখলাম, কথাটা তো ও ভুল বলেনি! আমি তখন সবেমাত্র চাকরিতে ঢুকেছি। অন্যখানে বাসা নিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার মতো সামর্থ্য আমার হয়ে ওঠেনি। তাই লুনার পরামর্শে বাবাকে বোঝালাম, এই বাড়িটা জমিসহ বিক্রি করে দিলেই মোটামুটি হালফ্যাশনের একটা ফ্ল্যাট কিনেও কিছু টাকা ব্যাংকে রাখা যাবে। আমার বাবা এই প্রস্তাবে রাজি হননি। শেষে আমি রাগ করে লুনাকে নিয়ে আলাদা হয়ে যাওয়ার হুমকি দিলাম, যদিও জানি, এ আমার সামর্থ্যের বাইরে। লুনা তখন পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ সময় ওর বাড়তি কিছু যত্নআত্তি প্রয়োজন। এ অবস্থায় আমার সাহায্যে এগিয়ে এলেন মা। তিনি বাবাকে বুঝিয়ে রাজি করালেন। অবশেষে বাবা রাজিও হলেন, কিন্তু আমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলতেন না আর। সেই থেকে বাবা-মায়ের সঙ্গে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে গেল আমার।
নতুন ফ্ল্যাটটা বাবা-মা আমার নামে দিতে চাইলেন, কিন্তু আমার অনুরোধে বাবা ফ্ল্যাটটা তাঁর নাতির নামে উইল করে দেন। আমার সন্তানের ভবিষ্যৎ ভেবে এই কাজটি করেছিলাম। যেদিন নতুন ফ্ল্যাটে আমরা শিফট করলাম, সেদিন লুনার আনন্দ যেন বাঁধ মানছিল না। আমারও ভালো লাগছিল ওর হাসিমুখ দেখে। আমাদের ছেলের বয়স তখন চার বছর, ওকেও একটা আলাদা ঘর দেওয়া হলো। ছেলের ঘরটি ছবির মতো করে সাজাল লুনা। শুধু ছেলের ঘরই নয়, পুরো বাসাটাই সুন্দর করে সাজাল সে। ফ্ল্যাট কেনার পর যে টাকা বেঁচে ছিল, এর অনেকটাই ব্যয় করা হলো ঘর সাজানোর কাজে। শুধু বদলাল না বাবা-মায়ের ঘরটি—সেই আগেকার খাট, ঘুণে ধরা চেয়ার-টেবিল, আলমারি—ঠিক আগের বাড়ির ঘরটির মতো। এই ঘরটি সাজাতে দেননি মা। তিনি বলেছিলেন, থাকুক কিছু স্মৃতি। আমি কিছু মনে করিনি, কিন্তু লুনার মনে খেদ ছিল খুব। মা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন সেই কবে, বাবাকেও আজ বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এলাম, সেই সঙ্গে বাধামুক্ত হলো লুনার ঘর সাজানোর পথটা।

পরিশিষ্ট

এতক্ষণ নিজের লেখা ডায়েরির কয়েকটি পাতা পড়ছিলেন আবীর চৌধুরী। তাঁর চোখের কোণে পানি। এখন তাঁর বয়স পঁচাত্তর। পাঁচ বছর আগে লুনা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। আর তাঁর আদরের ছেলে আনন্দ চৌধুরী আজ সকালে তাঁকে রেখে গেল বৃদ্ধাশ্রমে।

সূরা আসর আমাদের যা শেখায়


রহমান রহীম আল্লাহ্‌ তায়ালার নামে-

লেখকঃ আব্দুল্লাহ শহীদ আব্দুর রহমান
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কুরআন নাযিল করেছেন মানুষের জন্য উপদেশ ও জীবন বিধান হিসাবে। এ লক্ষ্যেই তিনি গুরুত্বারোপ করেছেন কুরআন নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার প্রতি :
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآَنَ أَمْ عَلَى قُلُوبٍ أَقْفَالُهَا
‘তবে কি তারা কুরআন নিয়ে গভীর চিন্তা-ভাবনা করে না? নাকি তাদের অন্তরসমূহে তালা রয়েছে?’ (মুহাম্মাদ : ২৪)
কুরআন নিয়ে যতই চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করা হবে অন্তরে কুরআনের আবেদন ও কুরআনের প্রতি ভক্তি ততই বৃদ্ধি পাবে। মানুষের স্বভাব চরিত্রে, আচার-আচরণে এর প্রভাব পড়বে। তাই তো আমরা দেখি উম্মুল মুমিনিন আয়েশা রা. কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি উত্তর দেন:
كان خلقه القرآن
‘তাঁর চরিত্র ছিল আল কুরআন।’ (মুসলিম)
কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কুরআনকে নিজের জীবনের পাথেয় হিসেবে নিয়েছিলেন। এতে চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণা করেছেন এবং নিজ জীবনে তা পূর্ণাঙ্গরূপেবাস্তবায়ন করেছেন। আমরা আজ কুরআন পাঠ করি কিন্তু তা আমাদের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলে না। আমাদের জীবনাচারে পরিবর্তন সূচিত করে না। কারণ আমরা কুরআনের মর্ম নিয়ে কোনো চিন্তা-ভাবনা করি না। আলী রা. বলেছেন, ‘যে কুরআন পাঠে চিন্তা-ভাবনা নেই, সে পাঠে কোনো কল্যাণ নেই।’ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন, ‘আজ তোমরা সূরা ফাতেহা থেকে নিয়ে শেষ পর্যস্ত এমনভাবে কুরআন খতম করো যে, একটি হরফও বাদ পড়ে না। কিন্তু বাস্তব কথা হল, সে অনুযায়ী কর্ম সম্পাদন বাদ পড়ে যায়।’
আমরা সূরা আল আসর পাঠ করি।  তা  মুখস্থও করেছি । জীবনে কতবার যে পাঠ করেছি তার হিসেব তো নিজের কাছেও নেই; কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি ছোট এই সূরাটির মধ্যে আল্লাহ তাআলা কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখেছেন। কত চমৎকার হেদায়েত রেখেছেন ক্ষুদে এ সূরাটির মধ্যে। ইহকালীন ও পরকালীন মুক্তির স্পষ্ট সনদ রেখেছেন তিনি মাত্র তিন আয়াত বিশিষ্ট এ সূরার মধ্যে। সাহাবায়ে কেরামের অনেকের সম্পর্কে বর্ণিত আছে যে, তারা যখন একজন অপর জনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাত করতেন তখন সূরা আল আসর পাঠ করে শুনাতেন। (তাবরানি, হায়সামি ফি মাজমাআয যাওয়ায়েদ)
ইমাম শাফেয়ী রহ. বলেন, ‘আল্লাহ তাআলা যদি কুরআনে অন্য কোনো সূরা নাযিল না করে শুধু সূরা আল আসর নাযিল করতেন তাহলে এটা মানুষের হেদায়াতের জন্য যথেষ্ট হত।’(মিফতাহুস সাআদাহ : ইমাম শাফেয়ি)
যদি কেউ এ সূরায় গভীরভাবে দৃষ্টি দেয় তাহলে সে তাতে একটি উন্নত, সুন্দর, শান্তিময়, পরিপূর্ণ এবং সবার জন্য কল্যাণকর সমাজের চিত্র দেখতে পাবে। (আদওয়াউল বায়ান : ৯/৫০৭)
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন এ সূরাটি শুরু করেছেন ‘ওয়াল আসর’ শব্দ দিয়ে। ইরশাদ হয়েছে-
وَالْعَصْرِ ﴿1﴾
‘আসরের শপথ।’ (১)

‘আসর’ বলতে কি বুঝানো হয়েছে?

‘আসর’ শব্দের দুটো অর্থ : এক. যুগ বা সময়। দুই. আসরের নামাজের সময়, যার আগমন হয় জোহরের নামাজের সময় শেষ হওয়ার পর এবং শেষ হয় সূর্যাস্তের মধ্য দিয়ে। আল্লাহ তাআলা কোনটির শপথ করেছেন? সময়ের শপথ না আসরের ওয়াক্তের শপথ?
সর্বাধিক গ্রহণযোগ্য মত হল তিনি ‘আসর’ বলতে এখানে সমস্ত সময়ের শপথ করেছেন। করেছেন যুগের শপথ। আর যুগের গর্ভেই এক জাতির উত্থান ঘটে,  অন্য জাতির ঘটে পতন। রাত্রি আসে। যায় দিন। পরিবর্তিত হয় পরিবেশ ও মানব সমাজ। এমন সব পরিবর্তন আসে যা মানুষ কল্পনা করতে পারে না। কখনো অনাকাঙ্ক্ষিত কখনো বা প্রত্যাশার চেয়ে বেশি পরিবর্তন আসে এ সময়ের ব্যবধানেই। তাই এ যুগ বা সময় বড় বিস্ময়কর। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানব, দানব, জীব-জন্তুসহ তাবৎ সৃষ্টিকুলের জন্য। এটা বুঝানোর জন্যই আল্লাহ তাআলা সময়ের শপথ করেছেন। (আত তিবইয়ান ফি আকসামিল বায়ান : ইবনুল কায়্যিম আল জাওযি)
কোনো বস্তু বা বিষয়ের শপথ করলে তার অস্বাভাবিক গুরুত্ব বুঝায়। সময় এমনই এক বিস্ময়ের আধার যে, আমরা জানি না অতীতকালে এটা কি কারণে হয়েছে। আমরা জানি না ভবিষ্যতে কি ঘটতে যাচ্ছে। এমনকি আমাদের নিজেদের জীবন, নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র সম্পর্কে আমরা বলতে পারি না যে আগামী কালকের পরিবশেটা ঠিক আজকের মত থাকবে কি থাকবে না। দেখা যায় মানুষ নিজ সম্পর্কে একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। আগামীকাল এটা সে বাস্তবায়ন করবে। অর্জন করবে এটা সেটা অনেক কিছু। সে দৃঢ় প্রত্যয়ী থাকে এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে। সব উপকরণ থাকে হাতের নাগালে। সব মাধ্যম ও ফলাফল থাকে আপন নখদর্পনে। কোনো কিছুরই অভাব নেই। তবুও এ ‘সময়’ নামক বস্তুটির ব্যবধানে এমন কিছু ঘটে যায় যা তার সব কিছুকে তছনছ করে দেয়। সে ভাবতেই পারে না- কেন এমন হল। অনেক বড় বড় হিসাব সে মিলিয়েছে কিন্তু এর হিসাব সে মেলাতে পারছে না। এটাই হল ‘সময়’। আল্লাহ তাআলা এর প্রতি মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যই বলেছেন, ‘ওয়াল আসর’ – শপথ সময়ের।
এ থেকে আমরা জীবনের জন্য সময়ের গুরুত্ব অনুধাবন করতে পারি। আমাদের মনে রাখতে হবে আল্লাহ হলেন মহান। তিনি মহান বস্তু ব্যতীত অন্য কোনো কিছুর শপথ করেন না।
তাফসিরবিদ ইকরামাসহ অনেকে বলেছেন, ‘আসর’ বলতে এখানে আসরের নামাজের সময়ের শপথ করা হয়েছে। কেননা আসর নামাজের সময়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। প্রখ্যাত তাফসিরবিদ ইবনে জারির আত তাবারী রহ. বলেছেন, ‘সঠিক কথা হল এখানে ‘আসর’ বলতে আল্লাহ তাআলা ‘সময়’ কে বুঝিয়েছেন। যুগের অপর নাম সময়। সকাল, বিকাল, দুপুর, রাত, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী, সহস্রাব্দ ইত্যাদি সব কিছুই বুঝায় এ ‘আসর’ বা ‘সময়’ নামক শব্দ। (জামেউল বায়ান : ১৫/২৮৯)
যদি এ সূরাটির প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টি দেয়া হয় তাহলে দেখা যাবে যে, সময়টাকে সকল যুগে টেনে নেয়া হয়েছে। মানুষকে সময়ের মধ্যে আবদ্ধ করা হয়েছে। সময় ছাড়া মানুষের জীবন যেমন সচল নয়, তেমনি সময় ব্যতীত তাদের কোনো অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতও নেই।

দ্বিতীয় আয়াত :

إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ ﴿2﴾
‘অবশ্যই মানুষ ক্ষতিতে নিপতিত।’
যদিও এখানে ইনসান বা মানুষ শব্দটি এক বচনে ব্যবহার করা হয়েছে কিন্তু তার পূর্বে জাতিবাচক আলিফ লাম ব্যবহার করে পুরো মানব জাতিকে বুঝানো হয়েছে। অর্থাৎ পুরো মানবগোষ্ঠি ক্ষতিগ্রস্ত। তারা সকলে ধ্বংসের দিকে ধাবিত হচ্ছে। তবে যাদের মধ্যে চারটি গুণ আছে তারা ব্যতীত। এ চারটি গুণের অধিকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত নয়। তারা লাভবান সর্বদা। লাভবান ইহকাল ও পরকালে। পরবর্তী আয়াতে এ চারটি গুণের কথাই বর্ণিত হয়েছে।

তৃতীয় আয়াত :

إِلَّا الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ ﴿3﴾
‘তবে তারা ছাড়া যারা ঈমান এনেছে, সৎকাজ করেছে, পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’
চারটি গুণ যাদের মধ্যে থাকবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
এক. ঈমান
দুই. সৎকাজ বা আমালে সালেহ
তিন. অন্যকে সত্যের পথে আহবান
চার. অন্যকে ধৈর্যের উপদেশ দান
একজন মুসলিম শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে না। নিজের সুখে সন্তুষ্ট থাকে না। যেমন সে নিজের দুঃখেই শুধু ব্যথিত হয় না। অন্যের কথা চিন্তা করতে হয় তাকে। অন্যের কল্যাণে কাজ করতে হয়। অন্যের দুখে দুখী ও অন্যের সুখে সুখী হওয়া তার কর্তব্য। এজন্য এ চারটি গুণের প্রথম দুটো গুণ নিজের কল্যাণের জন্য আর পরের গুণ দুটো হল অন্যের কল্যাণের জন্য। প্রথম গুণ দুটো দ্বারা একজন মুসলিম নিজেকে পরিপূর্ণ করে, আর অপর দুইগুণ দ্বারা অন্যকে পরিপূর্ণ করার প্রয়াস পায়।
প্রথম গুণটি হল ঈমান। এটা একটা ব্যাপকভিত্তিক আদর্শের নাম। প্রখ্যাত তাফসিরবিদ মুজাহিদ রহ. বলেছেন, ঈমান হল, আল্লাহকে এক বলে বিশ্বাস করা, তাঁর একত্ববাদকে সর্বক্ষেত্রে গ্রহণ করা। তাঁর পক্ষ থেকে যা কিছু এসেছে সবগুলোকে মেনে নেয়া এবং সর্বক্ষেত্রেই তার কাছে জওয়াব দিতে হবে এ আদর্শ ধারণ করা। (তাফসিরে তাবারি)
ঈমানের পর নেক আমল বা সৎকর্মের স্থান। সৎকর্ম কম বেশি সকল মানুষই করে। তবে ঈমান নামক আদর্শ তারা সকলে বহন করে না। ফলে তাদের আমল বা কর্মগুলো দিয়ে লাভবান হওয়ার পরিবর্তে তারা ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে থাকে। সৎকর্মশীল মানুষগুলো যদি ঈমান নামের আদর্শকে গ্রহণ করে তাহলে এ সৎকর্ম দ্বারা তারা দুনিয়াতে যেমন লাভবান হবে আখেরাতেও তারা অনন্তকাল ধরে এ লাভ ভোগ করবে। আর যদি সৎকর্মের সঙ্গে ঈমান নামের আদর্শ না থাকে, তাহলে সৎকর্ম দিয়ে দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী জীবনে কিছুটা লাভবান হলেও আখেরাতের স্থায়ী জীবনে এটা তাদের কোনো কল্যাণে আসবে না। এ জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীন প্রথমে ঈমানের কথা বলেছেন।
সৎকর্ম হল, যা কিছু ইসলাম করতে বলেছে সেগুলো পালন করা আর যা কিছু নিষেধ করেছে সেগুলো থেকে বিরত থাকা। হতে পারে তা ফরজ, ওয়াজেব, সুন্নাত, মুস্তাহাব বা নফল। আর বর্জনীয় বিষয়গুলো বর্জন করে চলা। হতে পারে তা হারাম, মাকরূহ।
যখন মানুষ ঈমান স্থাপন করল, তারপর সৎকর্ম করল, তখন সে নিজেকে পরিপূর্ণ করে নিল। নিজেকে লাভ, সফলতা ও কল্যাণের দিকে পরিচালিত করল। কিন্তু ঈমানদার হিসাবে তার দায়িত্ব কি শেষ হয়ে গেল? সে কি অন্য মানুষ সম্পর্কে বে-খবর থাকবে? কিভাবে সে এত স্বার্থপর হবে? অন্য সকলকে কি সে তার যাপিত কল্যাণকর, সফল জীবনের প্রতি আহবান করবে না? কেনই বা করবে না? সে তো মুসলিম। তাদের আভির্ভাব ঘটানো হয়েছে তো বিশ্ব মানবের কল্যাণের জন্য। আর এ জন্যই তো মুসলিমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। আল্লাহ তাআলা তো বলেই দিয়েছেন  :
كُنْتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَتُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ
‘তোমরা হলে সর্বোত্তম জাতি, যাদেরকে মানুষের জন্য বের করা হয়েছে। তোমরা ভাল কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে, আর আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।’ (আলে ইমরান : ১১০)
অতএব নিজেকে ঠিক করার পর তার দায়িত্ব হবে অন্যকে কল্যাণের পথে আহবান করা। তাই ঈমান ও সৎকর্ম নামক গুণ দুটো উল্লেখ করার পর আল্লাহ তাআলা আরো দুটো গুণের কথা বললেন :
وَتَوَاصَوْا بِالْحَقِّ وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ
‘আর তারা পরস্পরকে সত্যের উপদেশ দিয়েছে এবং পরস্পরকে ধৈর্যের উপদেশ দিয়েছে।’

সত্যের দিকে মানুষকে আহবান করা, এ আহবান করতে গিয়ে ও আহবানে সাড়া দিতে গিয়ে যে সকল বিপদ-মুসিবত, অত্যাচার-নির্যাতন আসবে তাতে ধৈর্য ধারনের জন্য একে অন্যকে উপদেশ দেয়া কর্তব্য। প্রশ্ন হতে পারে সত্যের মধ্যেই তো ধৈর্য আছে। ধৈর্য তো হক বা সত্যের একটি। তাহলে এটা আলাদাভাবে উল্লেখ না করলে কি হত না? কোনো বিষয়ের গুরুত্ব বুঝাতে সাধারণভাবে তা উল্লেখ করা হলেও আবার বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়ে থাকে। পরিভাষায় এটাকে বলা হয় : ذكر الخاص بعد العام
কোনো বিষয় অর্জন করা সহজ হতে পারে কিন্তু সেটি ধরে রাখা ও তার ওপর অটল থাকা ততটা সহজ নাও হতে পারে। আর এ জন্যই প্রয়োজন ধৈর্য ও সবরের।

সূরা থেকে অর্জিত শিক্ষা  মাসায়েলসমূহ :

১- এ সূরার মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, চারটি বিষয় অর্জন করা আমাদের জন্য জরুরি :
এক. ইলম বা জ্ঞান অর্জন। ইলম ব্যতীত ঈমান স্থাপন সম্ভব নয়। ঈমানের জন্য কমপক্ষে তিনটি বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। (ক) আল্লাহ তাআলাকে জানতে হবে। (খ) তাঁর রাসূলকে জানতে হবে। (গ) তাঁর প্রেরিত দীন-ধর্মকে জানতে হবে। এগুলো জানার পরই তার ওপর ঈমান আনা সম্ভব। ইরশাদ হয়েছে:
فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
‘অতএব জেনে নাও যে, নিঃসন্দেহে আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই এবং তুমি ক্ষমা চাও তোমার ও মুমিন নারী-পুরুষদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য।’ (মুহাম্মাদ : ১৯)
আমরা দেখলাম, এ আয়াতে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর প্রতি ঈমান আনার পূর্বে জানতে বলেছেন অর্থাৎ ইলম অর্জন করতে বলেছেন। তারপর ইস্তেগফার তথা আমল করতে বলেছেন।
দুই. ইলম অনুযায়ী কাজ করা। তিনটি বিষয় -আল্লাহ, রাসূল ও দীন সম্পর্কে ইলম অর্জন করে আল্লাহর প্রতি ঈমান স্থাপন করার পর সেই ইলম বা জ্ঞান অনুযায়ী আমল করতে হবে।
তিন. অন্যকে এই ইলম ও আমলের দিকে আহবান করতে হবে বা দীনে ইসলামের দিকে দাওয়াত দিতে হবে।
চার. ধৈর্য ধারন করা। ইলম, ঈমান, আমল ও দাওয়াত দিতে গিয়ে যে সকল বিপদ-মুসীবত, দুঃখ কষ্টের সম্মুখীন হতে হয়,  তাতে ধৈর্য ধারণ করতে হবে ও অন্যকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দিতে হবে। এছাড়া সকল প্রকার বিপদ মুসিবতে, দুর্যোগ-দুর্বিপাকে ধৈর্য ধারণ করতে হবে ও অন্যকে ধৈর্য ধারণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
২- আল্লাহ তাআলা ‘আল আসর’ তথা সময়, হায়াত, যুগের শপথ করেছেন। এ শপথের মাধ্যমে তিনি আমাদেরকে সময় ও জীবনের গুরুত্ব বুঝিয়েছেন। মানুষের আয়ু কত মূল্যবান তা অনুধাবন করতে বলেছেন। তেমনি ‘আল আসর’ এর কসম করে যা বলেছেন সেটারও গুরুত্ব বুঝিয়েছেন তিনি। আর তা হল; মানুষ ক্ষতিতে নিপতিত। মানুষ ধ্বংসের দিকে ধাবিত। তাই ক্ষতির পথ ছেড়ে তাকে লাভ ও কল্যাণের পথে আসতে হবে। যারা ক্ষতিগস্ত হচ্ছে তারা কিন্তু সময়টাকে বর্ণিত কাজগুলোতে লাগাচ্ছে না বলেই তারা ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।
৩- আল্লাহ তাআলা যুগের শপথ করেছেন। যুগে যুগে যা কিছু ঘটেছে সেগুলো ইতিহাস। তাতে রয়েছে মানুষের জন্য শিক্ষা ও নসিহত। যুগে যুগে অত্যাচারী শক্তিধর জাতির পতন ঘটেছে। নির্যাতিত দুর্বল জাতির উত্থান হয়েছে। এসবই মহান আল্লাহর একত্ববাদ ও তাঁর সর্বময় ক্ষমতার প্রমাণ।
৪- মানুষ দুনিয়াতে আয়ু পার করে বার্ধক্যে উপনীত হয় বটে কিন্তু সে লাভবান হয় না। তবে যারা ঈমান এনেছে, সৎকর্ম করেছে, মানুষকে সত্যের পথে আহবান করেছে, ধৈর্য ধারণ করেছে তারা এর ব্যতিক্রম। তারা বৃদ্ধ অক্ষম হয়ে গেলেও তাদের নামে সৎকর্ম যোগ হতে থাকে। যেমন আবু মুসা আশাআরী রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে একাধিকবার বলতে শুনেছি-
إذا كان العبد يعمل عملا صالحا فشغله عنه مرض أو سفر كتب له كصالح ما كان يعمل وهو صحيح مقيم.
‘কোন মানুষ যখন সৎকর্ম করতে থাকে, পরে তাকে রোগ-ব্যধি পেয়ে বসে অথবা সফর অবস্থায় থাকে, তখন তার কর্ম বিবরণীতে সে আমলগুলো লেখা হতে থাকে, যেগুলো সে সুস্থ ও গৃহে থাকাবস্থায় করে আসছিল।’ (বুখারি, জিহাদ অধ্যায়)
৫- মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত কয়েকভাবে হতে পারে : প্রথম. কুফরি করার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :
وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
‘আর অবশ্যই তোমার কাছে এবং তোমার পূর্ববর্তীদের কাছে ওহি পাঠানো হয়েছে যে, তুমি শির্ক করলে তোমার কর্ম নিষ্ফল হবেই। আর অবশ্যই তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (যুমার : ৬৫)
দ্বিতীয়. মুমিন অবস্থায় সৎকর্ম কম হয়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَنْ خَفَّتْ مَوَازِينُهُ فَأُولَئِكَ الَّذِينَ خَسِرُوا أَنْفُسَهُمْ
‘আর যাদের পাল্লা হালকা হবে তারাই নিজদের ক্ষতি করল।’ (মুমিনূন : ১০৩)
তৃতীয়. সত্য তথা ইসলাম গ্রহণ না করে অন্য আদর্শ গ্রহণ করে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :
وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِينًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآَخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
‘আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো দীন চায় তবে তার কাছ থেকে তা কখনো গ্রহণ করা হবে না এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (আলে ইমরান : ৮৫)
চতুর্থ. ধৈর্য ধারণ না করে হতাশ হয়ে পড়ার মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেন :
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَعْبُدُ اللَّهَ عَلَى حَرْفٍ فَإِنْ أَصَابَهُ خَيْرٌ اطْمَأَنَّ بِهِ وَإِنْ أَصَابَتْهُ فِتْنَةٌ انْقَلَبَ عَلَى وَجْهِهِ خَسِرَ الدُّنْيَا وَالْآَخِرَةَ ذَلِكَ هُوَ الْخُسْرَانُ الْمُبِينُ
‘মানুষের মধ্যে কতক এমন রয়েছে, যারা দ্বিধার সঙ্গে আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার কোনো কল্যাণ হয় তবে সে তাতে প্রশান্ত হয়। আর যদি তার কোনো বিপর্যয় ঘটে, তাহলে সে তার আসল চেহারায় ফিরে যায়। সে দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি হল সুস্পষ্ট ক্ষতি।’ (হজ : ১১)
৬- ঈমানের আভিধানিক অর্থ, সত্যায়ন করা, স্বীকার করা, মেনে নেয়া।
পারিভাষিক অর্থ, হাদিসে জিবরিলে বর্ণিত ঈমানের যে ছয়টি ভিত্তি আছে তার
সবগুলোর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা। একটু বিস্তারিতভাবে বলতে গেলে বলা যায়, ঈমান হল : অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করা, মুখ দিয়ে স্বীকার করা আর অঙ্গ-প্রতঙ্গ দিয়ে তা বাস্তবায়ন করা। তাই শুধু বিশ্বাস দিয়ে কাজ হবে না, যদি না সে বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করা হয়।
৭- আমর বিল মারুফ ওয়ান নাহি আনিল মুনকার অর্থাৎ অন্যকে সৎকাজের আদেশ ও অন্যায় থেকে নিষেধ করার গুরুত্ব অনুধাবন করা যেতে পারে। সত্যের পথে মানুষকে আসার উপদেশ দেয়া মানে সৎকাজের আদেশ করা। এর জন্য প্রয়োজন হবে ধৈর্যের। যেমন আল্লাহ রাব্বুল আলামীন লুকমান হাকিমের উপদেশ উল্লেখ করেছেন। সেখানেও এ বিষয়টি দেখা যায়। লুকমান তার ছেলেকে বলেছিলেন :
يَا بُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ
‘হে আমার প্রিয় বৎস, সালাত কায়েম কর, সৎকাজের আদেশ দাও, অসৎ কাজে নিষেধ কর এবং তোমার ওপর যে বিপদ আসে তাতে ধৈর্য ধর। নিশ্চয় এগুলো অন্যতম দৃঢ় সংকল্পের কাজ।‘ (লুকমান : ১৭)
৮- আমালে সালেহ বা সৎকর্মের মধ্যে হুকুকুল্লাহ (আল্লাহর অধিকার) ও হুকুকুল ইবাদ (মানুষের অধিকার) দুটোই অন্তর্ভুক্ত। একটিকে বাদ দিয়ে অন্যটির গুরুত্ব দেয়ায় কাজ হবে না। তাওহিদে বিশ্বাস, ঈমানে কামেল, ইবাদত-বন্দেগি, ফরজ-ওয়াজিব ও সুন্নাত-মুস্তাহাব আমলগুলো যেমন সৎকর্ম তেমনি পিতা-মাতা, স্বামী-স্ত্রী, আত্নীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী, সহকর্মী-সহযাত্রীদের সঙ্গে সদাচারণ, তাদের অধিকার সংরক্ষণ করাও সৎকর্মের  অন্তর্ভুক্ত। দেখুন কুরআনের বহু স্থানে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজের অধিকার বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের অধিকার সংরক্ষণের কথাও বলেছেন :
وَاعْبُدُوا اللَّهَ وَلَا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَبِذِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينِ وَالْجَارِ ذِي الْقُرْبَى وَالْجَارِ الْجُنُبِ وَالصَّاحِبِ بِالْجَنْبِ وَابْنِ السَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتْ أَيْمَانُكُمْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ مَنْ كَانَ مُخْتَالًا فَخُورًا
‘তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সঙ্গে কোনো কিছুকে শরিক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সঙ্গে, নিকট আত্মীয়ের সঙ্গে, ইয়াতিম, মিসকিন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শবর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সঙ্গে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।’ (নিসা : ৩৬)
৯- সবর বা ধৈর্য তিন প্রকার : (ক) আল্লাহর আনুগত্যে ধৈর্য ধারণ করা। তাঁর আদেশ নির্দেশগুলো মানতে গিয়ে অধৈর্য না হওয়া। এটাকে বলা হয় : الصبر على طاعة الله
(খ) আল্লাহর অবাধ্য না হওয়ার ব্যাপারে  ধৈর্য ধারণ করা। আল্লাহ তাআলা যা কিছু হারাম করেছেন সেগুলোর ধারে কাছে না গিয়ে ধৈর্য অবলম্বন করা। এটাকে বলা হয় : الصبر عن معصية الله
(গ) উপস্থিত বিপদ-মুসিবতে ধৈর্য ধারণ করা। এটাকে বলা হয় : الصبر على أقدار الله
১০- সূরা আল বালাদেও অন্যকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়ার নির্দেশ এসেছে, সেখানে এর সঙ্গে আরও একটি বিষয় যুক্ত করা হয়েছে। যেমন :
ثُمَّ كَانَ مِنَ الَّذِينَ آَمَنُوا وَتَوَاصَوْا بِالصَّبْرِ وَتَوَاصَوْا بِالْمَرْحَمَةِ ﴿17﴾ أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْمَيْمَنَةِ ﴿18﴾
‘অতঃপর সে তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, যারা ঈমান এনেছে এবং পরস্পরকে উপদেশ দেয় ধৈর্য ধারণের, আর পরস্পরকে উপদেশ দেয় দয়া-অনুগ্রহের। তারাই সৌভাগ্যবান।’
এ আয়াতে মুমিনদের গুণাবলি উল্লেখ করতে গিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, তারা ধৈর্য ধারণ আর পরস্পরকে দয়া-অনুগ্রহ করার উপদেশ দেয়।
তারা ডানদিকের দল। তাই একজন মুমিন যেমন নিজে ধৈর্য ধারণ করে ও অন্যকে ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়, তেমনি সে নিজে দয়া অনুগ্রহ করে ও অন্যকে দয়া অনুগ্রহ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
আল্লাহ আমাদেরকে সূরা আল আসরের শিক্ষাসমূহ বাস্তবায়নের জন্য তাউফিক দান করুন।

Download AsPDF

Print Friendly and PDFPrint Friendly and PDFPrint Friendly and PDF
Related Posts Plugin for WordPress, Blogger...